মে ০৬, ২০১৭ ১৬:৫৮ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছো ভালো ও সুস্থ আছো। আজকের আসরের শুরুতেই থাকবে বাংলাদেশের খ্যাতিমান লেখক ও শিশু-সাহিত্যিক ড. আশরাফ সিদ্দিকীর লেখা একটা লোককাহিনী। এরপর থাকবে ঢাকার এক নতুন বন্ধুর গানসহ সাক্ষাৎকার।

জাদুর রুমাল

অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক দেশে ছিল এক দীনহীন- গরীব মানুষ। সে এত গরীব ছিল যে, তার স্ত্রী-পুত্রসহ প্রায়ই তাকে অনাহারে থাকতে হতো। তাদের না ছিল পরার মতো কাপড়-চোপড়, না ছিল থাকার মতো ঘর-দরজা।

গরীব লোকটিকে তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা সব সময়ই গালমন্দ করত। বলত: 'অমুকের বাবা অমুক কাজ করে এত এত টাকা পায় আর তুমি শুধু বাড়িতে বসে বসে সময় কাটাও। তোমার কারণে আমরা এক বেলা পেট পুরে খেতে পর্যন্ত পাই না।'

স্ত্রী ও সন্তানদের এসব কথা শুনতে শুনতে গরীব লোকটি জীবনের প্রতি ঘৃণা ধরে গেল। সে সিদ্ধান্ত নিল, জঙ্গলে চলে যাবে। স্ত্রী-সন্তানদের কথা শোনার চেয়ে বনের জীবজন্তু যদি তাকে খেয়ে ফেলে সে-ই ভালো।

জঙ্গলে গিয়ে সে ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় একটি কুটির দেখতে পেল। কুটিরের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখল, সেখানে এক দরবেশ আল্লাহর ধ্যান করছে। গরীব লোকটি নিজের সৎ স্বভাব ও ধর্মের প্রতি মমতার কারণে দরবেশের কুটিরটি ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন  করে ফেলল, দরবেশের গাভীটিকে মাছে নিয়ে ঘাস খাওয়ানোর পর দুধ দোয়াল এবং নানা বুনো ফল-মূল তুলে এসে দরবেশের কুটিরে রেখে দিল।

দরবেশ মুনাজাত শেষে করে গরীব লোকটির দিকে তাকালেন। দেখলেন তার কুটির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, গাভীটিকে ভালোভাবে খাওয়ানো হয়েছে এবং নানা সুস্বাদু ফল-মূলে তার ঘর ভর্তি।

দরবেশ জানতে পারলেন যে, তার কুটিরে আসা লোকটি অত্যন্ত বিনয়ী এবং ঈমানদার কিন্তু বড়ই গরীব।

দরবেশ গরীব লোকটিকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাকে বললেন: "তুমি যদি আমার কথামতো চলো তাহলে আর গরীব থাকবে না। আমি তোমাকে এই রুমালটি দিচ্ছি। ভালো করে দেখো, রুমালটির একদিক হলো হলুদ আর অন্যদিক সবুজ। তুমি যদি সবুজ দিকটি মাটিতে বিছাও তবে রুমাল তুলেই তুমি সোনার মোহর পাবে। এই রুমালটি নিয়ে সোজা বাড়ি চলে যাবে- সাবধান, পথে কোত্থাও থামবে না। তুমি যদি আমার এই নির্দেশ পালন করতে পারো তবে কোনোদিনই আর গরীব থাকবে না।"

গরীব লোকটি দরবেশকে শত শত সালাম ও ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ির দিকে যাত্রা করল। অনেকক্ষণ হেঁটে হেঁটে সূর্যের তাপ ও গরমে সে খুব হয়রান হয়ে পড়ল। হঠাৎ কাছেই একটি দোকান দেখতে পেয়ে সে সেখানে বিশ্রাম নেয়ার জন্য থামল। দরবেশের জাদুর রুমালের কেরামতি দেখার জন্য এবার তার খুব ইচ্ছা হলো। সে দরবেশের নির্দেশ মতো রুমালের সবুজ দিকটি মাটিতে বিছিয়ে পুণরায় তুলতেই সেখানে দেখা গেল অনেকগুলো সোনার মোহর!

দোকানদার কাছেই বসেছিল। সে গরীব লোকটির জাদুর রুমালের কেরামতি দেখে অবাক হয়ে গেল। দোকানদার মনে মনে ফন্দি করল- যেভাবেই হোক এই রুমালটি হাত করতেই হবে।

দোকানদার অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে গরীব লোকটিকে তার ঘরের মধ্যে নিয়ে নানা ধরনের মিষ্টান্ন এনে আদর করে খাওয়াতে লাগল। গরীব লোকটি দোকানদারের এই ব্যবহারে খুব খুশি হলো। আর এই ফাঁকে দোকানদার কৌশলে তার কাছ থেকে রুমালের সব ঘটনা শুনে নিল।

গরীব লোকটি বাড়িতে ফিরে যাবার প্রস্তাব দিতেই দোকানদার অতি-বিনয়ের সাথে অনুরোধ করল: আজকে রাতটা আমাদের সাথেই থেকে যান। আপনার মতো খোদার রহমতপ্রাপ্ত লোকের খেদমত করে জীবনটা ধন্য করতে চাই।

সাদাসিধে লোকটি দোকানদানের কাকুতি-মিনতিতে একদম গলে গেল। রাতের খাবার সেরে সে তার মূল্যবান রুমাল ও মোহরগুলো দোকানদারের কাছে জমা রেখে সে ঘুমাতে গেল।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গরীব লোকটি বাড়ি যাবার জন্য তৈরি হলো এবং দোকানদারকে তার রুমাল ও মোহরগুলো ফেরত দেয়ার অনুরোধ করল।

এদিকে হয়েছে কী! ধূর্ত দোকানদার গরীব লোকটির জাদুর রুমালটি রেখে ওই রকমের অবিকল আরেকটি রুমাল আর মোহরগুলো অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ফের দিল। গরীব লোকটি বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে দোকানদারকে ধন্যবাদ দিয়ে সেখান থেকে বের হলো।

সে বাড়িতে পৌঁছার পর আনন্দের সঙ্গে তার স্ত্রীকে ডেকে প্রথমে মোহরগুলো দিল। তারপর সারাদিন সে তার স্ত্রী ও ছেলেদের কাছে দরবেশ ও রুমালের গল্প বলতে লাগল। সন্ধ্যায় সকলকে একত্র করে সে দরবেশের দেয়া জাদুর রুমালটি মাটিতে বিছাল। কিন্তু না! কিছুই ঘটল না! একটা মোহরও দেখা গেল না।

তার স্ত্রী মনে মনে ভাবল, জাদুর রুমাল-টুমাল কিছুই না, তার স্বামী তাদের ঠকাবার চেষ্টা করছে। আসলে সে মোহরগুলো কোনো ধনী লোকের সিন্দুক থেকে চুরি করে এনেছে। মিথ্যা কথা বলার জন্য স্ত্রী একটা ঝাঁটা এসে গরীব লোকটিকে দমাদম পিটাতে লাগল। বহু কষ্টে স্ত্রীর হাত থেকে ছাড়া পেয়ে সে ওই দোকানদারের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

তার বিশ্বাস ছিল, দোকানদারই তার আসল রুমালি সরিয়ে এই নকল রুমাল দিয়েছে। দরবেশের কথামতো সে যদি সোজা বাড়ি চলে আসত তাহলে এই অঘটন ঘটত না।

দোকানে পৌঁছে সে দোকানদারকে তার আসল রুমাল ফিরিয়ে দিতে অনুরোধ করল। কিন্তু দোকানদার এমন একটা ভাব দেখাল যেন এরআগে কখনো তাকেই দেখেইনি! শুধু তাই নয়, গরীব লোকটিকে সে গলাধাক্কা দিয়ে সেখান থেকে বের করে দিল।

এ ঘটনার দুঃখে এবং হতাশায় গরীব লোকটি একেবারে ভেঙে পড়ল। এখন কোন্‌ মুখে আবার দরবেশের কাছে ফিরে যাবে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে লাগল।

অনেক ভাবনা-চিন্তার পর সে দরবেশের কাছে ফিরে গিয়ে সব ঘটনা খুলে বলে তার কাছে মাফ চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। দরবেশের কুটিরে গিয়ে সে আগের মতোই ঘর পরিষ্কার করল, গাভীকে খাওয়াল এবং বন থেকে ফল-মূল সংগ্রহ করে আনল।

দরবেশ মুনাজাত শেষ করে তাদের দেখেই সবকিছু বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন, 'চিন্তার কোনো কারণ নাই- আমি সবই জানতে পেরেছি। তুমি আবার তোমার রুমাল ফিরে পাবে। আজকের দিনটা অপেক্ষা করো।'

পরদিন সকালে দরবেশ গরীব লোকটিকে একটি লাঠি উপহার দিয়ে বললেন, 'তুমি লাঠিকে প্রহার করতে বললেই সে তোমার আদেশ মতো কোনো ব্যক্তিতে প্রহার করতে থাকবে যে পর্যন্ত না তুমি থাকতে বলবে। এখান থেকে যাওয়ার পথে দোকানদারের সঙ্গে দেখা করে যেও।'

লোকটি বুঝতে পারল যে, বজ্জাত ও লোভী দোকানদারকে শায়েস্তা করার জন্যই তাকে লাঠিটি দেয়া হয়েছে। দরবেশকে আবারে সালাম ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লোকটি দোকানের দিকে যাত্রা করল। দোকানদার তার হাতে লাঠি দেখে ভাবল, গরীব লোকটি হয়ত এবার জাদুর লাঠি নিয়ে এসেছে। এই লাঠিও হয়ত অসাধ্য সাধন করতে পারে।

এই ভেবে সে লোকটিকে বিনয়ের সাথে সম্মান করে বসতে দিল এবং আগের দিনের বেয়াদবির জন্য বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল। গরীব লোকটি মৃদু হেসে বলল- হ্যাঁ, এটাও এক জাদুর লাঠি। এর কেরামতি দেখতে চাইলে বাড়ি সব লোকজনকে ডাকতে হয়। দোকানদারের স্ত্রী-পুত্রসহ বাড়ির সব লোকজন সেখানে জড়ো হলে গরীব লোকটি লাঠিকে হুকুম দিল:

লাঠি! লাঠি! জাদুর লাঠি

আমার আদেশ বলছি খাঁটি!

আপন মূর্তি ধারণ কর্‌

দুষ্ট পিঠে ঢিট্‌ কর্‌।

একথা বলতেই লাঠি সামনে যাকে পেল তাকেই নির্দয়ভাবে পেটাতে থাকল। দোকানদার প্রাণভয়ে তার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। কিন্তু জাদুর লাঠি সেখানে ঢুকেই তাকে দমাদম পেটাতে লাগল। দোকানদার দিশাহারা হয়ে ঘরের ছাদে গিয়ে আশ্রয় নিল। কিন্তু জাদুর লাঠি সেখানে গিয়েই বেদম প্রহার করতে লাগল। কোনো উপায় না দেখে দোকানদার ছাদ থেকে নেমে গরীব লোকটির সামনে শুয়ে মাফ চাইল। এরপর জাদুর রুমালটি ফিরিয়ে দিল।   

জাদুর রুমালটি ফিরে পেয়ে গরীব লোকটি এক রকম দৌড়ে তার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হল। বাড়ি পৌঁছে ঘরের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে রুমালটি মাটিতে বিছাল। সাথে সাথেই দেখা গেলে কয়েকটি সোনার মোহর। সে রুমালের গুণ পরীক্ষার জন্য বারবার রুমালটি মাটিতে বিছাতে লাগল। প্রতিবারই সে সোনার মোহর পেতে লাগল। এইবার সে তার স্ত্রী এবং সন্তানদের দরবেশের দেয়া রুমালের  কেরামতি দেখার জন্য ডাকল। তারা সব কিছু দেখে এবার বিশ্বাস করল। এরপর থেকে রুমাল রীতিমতভাবে মোহর দিতে লাগল। কিছু দিনের মধ্যে সেই মোহর দিয়ে তারা একটি বিরাট জমিদারি কিনে ফেলল এবং সুখে স্বাচ্ছন্দে বসবাস করতে লাগল।

বন্ধুরা, তোমরা হয়ত ভাবছ গল্পটি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষের জীবন তো আর রূপকথার মতো নয়। যাইহোক, অল্পদিনের মধ্যেই দরিদ্র লোকটির জাদুর রুমালের কেরামতির কথা দেশের সবখানে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই তাকে নতুন জমিদার হিসেবে সম্মোধন করতে লাগল। দেশের রাজার কানেও পৌঁছল এই আশ্চর্য রুমালের গুণের কথা। রাজা ভাবলেন, এভাবে যদি লোকটি ধন-সম্পদ সঞ্চয় করতে থাকে তাহলে তো তার ধন-ভাণ্ডারকেও সে একদিন ছাড়িয়ে যাবে! যেভাবেই হোক জাদুর রুমালটি দখল করতে হবে।

রাজা অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত তার এক বিচক্ষণ উজিরকে পাঠালেন নতুন জমিদারের কাছে। নতুন জমিদারের ধন-দৌলত ও ধর্মকর্মের প্রশংসা করার পর উজির বললেন যে, আপনি যদি ইচ্ছা করেন তাহলে আপনার বড় ছেলেকে দিয়ে রাজার মেয়েকে বিয়ে করাতে পারেন।

দেশের রাজার আত্মীয় হওয়াকে অত্যন্ত সম্মানের মনে করে নতুন জমিদার তখনি উজিরের প্রস্তাবে রাজি হল এবং বিয়ের প্রস্তাব পাঠাল।

পরদিন উজির আবার ফিরে এসে নতুন জমিদারকে জানাল যে, রাজা আপনার প্রস্তাবে খুব খুশি হয়েছেন- তবে প্রস্তাবটি আপনি নিজে দিলে তিনি আরও সন্তুষ্ট হবেন।

এরপর উজির জমিদারের কানে কানে বলল, রাজকন্যা তার জাদুর রুমালটিও দেখতে চান। আপনার যদি কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে রুমালটিও সঙ্গে নিয়ে যাবেন।

পরদিন জমিদার রুমালটি নিয়ে রাজদরবারে হাজির হল। রাজা তার পাত্র-মিত্রসহ অত্যন্ত সমাদরের সঙ্গে জমিদারকে স্বাগত জানাল। কিছুক্ষণ আলাপের পর তিনি জমিদারকে বললেন তার আশ্চর্য রুমালটি রাজকন্যাকে দেখাবার জন্য অন্দর মহলে নিয়ে যেতে চান। রাজার কথায় কোনো কিছু মনে না করে জমিদার রুমালটি দিয়ে দিল।

এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল কিন্তু রাজা আর ফিরে এল না। জমিদার খবর পাঠাল, তার রুমালটি ফেরত দিতে। কিন্তু রাজা তার কাছ থেকে কোনো রুমাল নেয়ার কথা বেমালুম অস্বীকার করলেন। শুধু তাই নয়, রাজার লোকজন জমিদারকে অপমান করে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিল।

তবে জমিদারকে তেমন অসন্তুষ্ট মনে হলো না। ধীরে ধীরে বাড়ি গিয়ে জাদুর লাঠি নিয়ে এলেন তিনি। রাজ-প্রাসাদের ফটকে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন:

"লাঠি! লাঠি! জাদুর লাঠি!

আমার আদেশ বলছি খাঁটি।

আপন মূর্তি ধারণ কর্‌,

দুষ্ট পিঠে টিট্‌ কর্‌।

যেই বলা- অমনি জাদুর লাঠি দমাদম পিটুনি শুরু করে দিল। রাজা পিটুনির চোটে শেষ পর্যন্ত শোবার ঘরের পালঙ্কের নিচে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। কিন্তু সবজান্তা লাঠি সেখানে গিয়েই তাকে নাস্তানাবুদ করতে লাগল। উপায়ন্তর না দেখে রাজা পালঙ্কের নিচ থেকে বের হয়ে জমিদারের কাছে মাফ চাইলেন এবং জাদুর রুমাল ফেরত দিলেন।

জমিদার সেখান থেকে ফিরে নিজের ধন-সম্পত্তি আরও বাড়াতে লাগলেন। তার সম্পত্তি এত বেশি হলো যে, একসময় তার বড় ছেলে দেশে রাজা হল এবং তাদের সুখের সীমা রইল না।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৬