রংধনু আসর: বিশ্বাসের পরীক্ষা
রংধনু আসরের শিশু কিশোর বন্ধুরা, তোমরা তো জানো, প্রতিটি জীবের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন। আর এ খাদ্য সরবরাহ করা হয় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। পবিত্র কুরআনের সূরা জুমআর ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'আল্লাহই একমাত্র রিজিকদাতা।'
অন্যদিকে সূরা মায়েদার ৮৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'আল্লাহতায়ালা যেসব বস্তু তোমাদেরকে দিয়েছেন, তার মধ্য থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু খাও এবং আল্লাহকে ভয় কর, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী।'
বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছো যে, কেউ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনুক কিংবা না আনুক, আল্লাহর সবার রিজিকের ব্যবস্থা করে থাকেন। রিজিকদাতা হিসেবে মহান আল্লাহ কেমন ভূমিকা পালন করেন সে সম্পর্কে ইরানের বিখ্যাত মনীষী মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী একটি গল্প লিখেছেন। আজকের আসরের শুরুতে আমরা সেই গল্পটিই তোমাদেরকে শোনাব। গল্পের পর থাকবে পরিশ্রমের গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু কথা এবং মানব মস্তিস্ক সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য। আর সবশেষে থাকবে একটি ইসলামী গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন সহকর্মী আশরাফুর রহমান। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে শুরু করছি আমাদের আজকের গল্প 'বিশ্বাসের পরীক্ষা'।
একবার এক ব্যক্তি এক ওয়াজ মাহফিলে গেল বক্তৃতা শুনতে। মাহফিলে যাবার পর সে এক মাওলানাকে বক্তৃতা করতে দেখতে পেল। মাওলানা তখন বলছিলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদেরকে খাদ্য দান করেন। কেউ ইচ্ছা করুক বা না করুক, আল্লাহর করুণাবশত তার কাছে খাদ্য পৌঁছে যাবেই।'' লোকটি মাওলানার বক্তৃতা যে বিশ্বাস করেনি তা নয়। কিন্তু তার মনে একটু খটকা লেগেছিল। তাই একদিন বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য সে জনমানবহীন এক মরুভুমিতে গেল এবং একটি পাহাড়ের কাছে গিয়ে মরার মত করে শুয়ে পড়ল। সে মনে মনে বলল, আজ যদি আমার কাছে কেউ খাবার নিয়ে আসে, তাহলে আমার সন্দেহ দুর হবে।
ওই পাহাড়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল একটি কাফেলা। তারা পথ হারিয়ে পাহাড়ের কাছে এসে অবস্থান নিল। কাফেলার লোকেরা দেখল, একটি লোক পাহাড়ের ওপর শুয়ে আছে। জনমানবহীন একটি পাহাড়ে একজন লোককে শুয়ে থাকতে দেখে তারা অবাক হয়ে গেল। নিজেদের মধ্যে তারা বলাবলি করতে লাগল, লোকটি বোধহয় মারা গেছে কিংবা কোনো হিংস্র প্রাণীর আক্রমন থেকে বাঁচার জন্য এখানে লুকিয়ে আছে। তাদের মধ্যে একজন গিয়ে লোকটির শরীর ছুঁয়ে দেখল, কিন্তু লোকটি কোনো সাড়া-শব্দ করল না। কাফেলার লোকেরা শেষমেষ ধরে নিল যে, ভাগ্যাহত দরিদ্র লোকটি ক্ষুধাতৃষ্ণা সহ্য না করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। তাই তারা একটি পাত্রে করে কিছু খাবার নিয়ে এল এবং তার মুখে দেয়ার চেষ্টা করল।
লোকটি এবার মাওলানার কাছে শোনা কথাটি সত্য কিনা তা পরীক্ষা করে দেখার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ বন্ধ করে রাখল। কাফেলার লোকরা ভাবল, লোকটি এতো ক্ষুধার্ত যে, মুখ খোলার মত শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে। তাই তাদের একজন হাতের আঙ্গুল দিয়ে লোকটির মুখ খুলে ফেলল। আর অন্যজন ঝোলের মধ্যে কয়েক টুকরো রুটি ভিজিয়ে লোকটির মুখের মধ্যে ঠেলে দিল।
এ ঘটনার পর লোকটি উঠে দাঁড়াল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে বলে উঠল, এখন আমি নিশ্চিতভাবেই বিশ্বাস করি যে, আল্লাহই আমাদের রিজিকদাতা। সেদিন থেকে আল্লাহর করুণা সম্পর্কে লোকটির সন্দেহ চিরতরে দূর হয়ে গেল।
বন্ধুরা, গল্পটি থেকে তো তোমরা জানলে যে, আল্লাহই আমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করে থাকেন। তবে তাই বলে হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। রিজিকের সন্ধানে আমাদের বের হতে হবে অর্থাৎ পরিশ্রম করতে হবে।
অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আমরা পরিশ্রমের গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু কথা বলব। তোমরা নিশ্চয়ই ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসুতি'- এ প্রবাদটি শুনেছো। এ প্রবাসের অর্থাৎ পরিশ্রম ও চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমেই মানুষ সৌভাগ্য লাভ করে। বিশ্বের ইতিহাসও একথারই সাক্ষ্য দেয়। নবুয়্যত পাওয়ার পরপরই মক্কার কুরাইশরা রাসূল (সা.)-এর বিরুদ্ধে বাধার পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তখন কি হলো? আমাদের প্রিয় নবী কি ঘাবড়ে গেলেন? না, মোটেই না। বরং দ্বিগুণ তেজে বললেন, "ওরা আমার এক হাতে যদি চন্দ্র এবং আরেক হাতে সূর্যকেও এনে দেয় তবু আমার পথ থেকে আমি এক চুল পরিমাণও বিচ্যুত হবো না।"
বন্ধুরা, জীবনে এমন কঠিন অঙ্গীকার ছিল বলেই মক্কার সেই কিশোর রাখাল বালকটি বড় হয়ে সমগ্র জাহানের অধিপতি হতে পেরেছিলেন। এত অল্প সময়ে রাসূল (সা.) এর অবিস্মরণীয় সাফল্যের পেছনে আল্লাহর সাহায্যের পাশাপাশি তাঁর সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা এবং সাধনাও মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
তবে, শুধু সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চুপটি করে সোফায় বসে থাকলেই সাফল্য আসবে? না, এক্কেবারে না। তাহলে উপায়? হ্যাঁ, আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করতে চাইলে দরকার চেষ্টা আর সাধনা। একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি তোমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
প্রায় এক হাজার নতুন বিষয়ের আবিষ্কারক বৈজ্ঞানিক এডিসনের মৃত্যুর পর নিউইয়র্ক পত্রিকায় লেখা হয় "মানুষের ইতিহাসে এডিসনের মাথার দাম সবচেয়ে বেশি। কারণ এমন সৃজনশক্তি অন্য কারো মধ্যে দেখা যায়নি।" অথচ ১৮৭৯ সালের ২১ অক্টোবর তার আবিস্কৃত পৃথিবীর প্রথম বৈদ্যুতিক বাতিটি যখন জ্বলে উঠলো তখন ক'জন জানতো যে, বিগত দু'বছরে তিনি এটি নিয়ে প্রায় দশ হাজার বার ব্যর্থ চেষ্টা করে আজ সফল হয়েছেন! সত্যি সাফল্যের পেছনে কী নিদারুণ সাধনা!
বন্ধুরা, চেষ্টা-সাধনার পাশাপাশি একাগ্রচিত্তে মস্তিস্তকে কাজে লাগাতে পারলে সাফল্য আসবেই। অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আমরা মহামূল্যবান 'মানব মস্তিস্ক' নিয়ে তোমাদেরকে কিছু জানা-অজানা তথ্য শোনাতে চাই। তোমরা শুনে বিস্মিত হবে যে, মানব মস্তিস্ককে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সুপার কম্পিউটার বলা হয়ে থাকে। মানব মস্তিস্কের ওজন মাত্র তিন পাউন্ড হলেও এর গঠন কম্পিউটারের চেয়ে হাজার হাজার কোটি গুণ জটিল। ডাক্তার ওয়াল্টারের মতে, বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে মস্তিস্কের মত কার্যকরী একটি বৈদ্যুতিক বা এটমিক মস্তিস্ক তৈরি করতে চাইলে পনের শত কোটি, কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ যে পরিমাণ টাকা দিয়ে বর্তমান সময়ের অত্যাধুনিক প্রায় দশ হাজার কোটি কম্পিউটার কেনা সম্ভব।
বন্ধুরা, শরীরে একটু চিমটি কেটে দেখো তো স্বপ্ন দেখছো কিনা? মজার খবর হলো, এই মস্তিষ্ককে চালাতে এক হাজার কোটি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ এর প্রয়োজন হবে। দৈনিক চালু রাখার জন্যে প্রয়োজন হবে কর্নফুলির কাপ্তাইয়ের মতো তিন হাজার আড়াইশত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামগ্রিক উৎপাদন। আর এই যান্ত্রিক মস্তিস্কের আয়তন হবে আঠারোটি এক’শ তলা বিল্ডিংয়ের সমান।
আমাদের মস্তিষ্কের সবচেয়ে ওপরের সাদা ঢেউ খেলানো অংশকে কর্টেক্স বলে। স্তরে স্তরে বিন্যস্ত এই কর্টেক্সকে সমান্তরালভাবে সাজালে এর আয়তন হবে দু’হাজার বর্গমাইলেরও বেশি অর্থাৎ প্রায় ব্রুনাই দেশের সমান। চৌদ্দশত কোটি নিরপেক্ষ জীবকোষ দিয়ে কর্টেক্স গঠিত। এ সকল পরস্পর বিচ্ছিন্ন সম্পূর্ণ একক জীবকোষকে নিউরন বলা হয়।
নিউরন এতই ক্ষুদ্র যে, কয়েকশত নিউরন একত্র করলে একটি আলপিনের মাথায় অনায়াসেই স্থান নিতে পারবে। প্রতি সেকেন্ডেই হাজার হাজার নিউরন এসে ব্রেইনের প্রাথমিক স্তরে জমা হতে থাকে। এরা একেকটি ইলেক্ট্রনিক সিগনাল যা শরীরের বিভিন্ন অংশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং মূল নিয়ন্ত্রণের আদেশ অতি দ্রুত হাজার কোটি সেলে ছড়িয়ে দেয়। ব্রেইনের এ সকল প্রতিক্রিয়া অনেক সময় সেকেন্ডের দশ লক্ষ ভাগের মাত্র একভাগ সময়ে ঘটতে পারে। আমাদের দেহের মেরুদণ্ডের মাধ্যমে নিউরনগুলো সারা শরীরের যন্ত্রপাতিগুলোকে সজীব ও তৎপর রাখে।
এগুলির আবার অনেক স্বতন্ত্র বিভাগ রয়েছে যার সংখ্যা প্রায় ২৫০টি। যেমন- কোনো অংশ শোনার জন্যে, কোনো অংশ বলার জন্য, কোনো অংশ দেখার জন্য আবার কোনো অংশ অনুভূতিগুলোকে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল টাওয়ারে ট্রান্সমিট করার জন্যে ব্যস্ত থাকে। এতে আবার বসানো হয়েছে একটি স্বয়ংক্রিয় শক্তিশালী ‘মেমোরি সেল’। যার কাজ হলো নিত্য নতুন সংগ্রহ গুলিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজনের সময় তাকে ‘রি ওয়াইন্ড’ করে মেমোরি গুলিকে সামনে নিয়ে আসা। এই স্মৃতি সংরক্ষণশালা প্রতি সেকেন্ড ১০টি নতুন বস্তুকে স্থান করে দিতে পারে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বপ্রকারের যাবতীয় তথ্য ও তত্ত্বকে একত্র করে এক জায়গায় করে যদি এই মেমোরি সেলে রাখা যায় তাতে এর লক্ষ ভাগের একভাগ জায়গাও পূরণ হবে না!
বন্ধুরা, তোমরা কি ভাবতে পারছ কত শক্তিশালী আমাদের এ মস্তিষ্ক! তবে দুঃখের বিষয় হল, আমরা এর হাজার ভাগের একভাগও কাজে লাগাতে পারি না। আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে মহামূল্যবান মস্তিস্ককে কাজে লাগানোর তৌফিক দিন এই কামনা করে এবং আমাদের প্রতি করুণা ও রহমত বর্ষণের জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের শুকরিয়া আদায় করে আজকের আসর শেষ করতে চাই। তবে অনুষ্ঠান শেষ করব শিশুশিল্পী আবু রায়হানের গাওয়া একটা গান দিয়ে। #
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/ মো: আবু সাঈদ/২৭