রংধনু আসর: পিঁপড়া, মাছি ও ভোমরা
রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই 'লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু'- এই প্রবাদটি শুনেছো। এ প্রবাদটির মধ্যেই লোভের পরিণতির কথা বলা হয়েছে। তারপরও অনেক মানুষ লোভ-লালসার কাছে নিজেকে বন্দি করে ফেলে।
লোভী ব্যক্তি সমাজের জন্য দুঃখ-কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) বলেছেন, "তোমরা লোভ থেকে বিরত থাকো, কারণ তোমাদের পূর্ববর্তীদের অনেকেই লোভের কারণে ধ্বংস হয়েছে।" অন্যদিকে আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ.) বলেছেন, "লোভ পরিহার কর। কেননা লোভী ব্যক্তি অপমানের হাতে বন্দী। তার এ বন্দীদশা কখনও শেষ হবে না।" তিনি আরো বলেন, "লোভ আত্মাকে অপবিত্র করে, ধর্মকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে এবং যৌবনকে ধ্বংস করে।"
লোভী ব্যক্তি কোনো ন্যায়-অন্যায় চিন্তা করে না। ইমাম বাকের (আ.) লোভী ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছেন, 'দুনিয়ার লোভী লোকদের উদাহরণ রেশম কীটের মতো। রেশম কীট, যত বেশী সুতা পায় তত বেশী তার শরীরে জড়িয়ে রাখে, শেষে দেখা যায় সুতা পেঁচতে পেঁচতে এক সময় সে দম বন্ধ হয়ে মারা যায়।'
বন্ধুরা, আজকের আসরে আমরা এক লোভী পিঁপড়ার গল্প শোনাব। এটি লিখেছেন ইরানের মরমী কবি শেখ ফরিদউদ্দিন আত্তার। গল্পের পর থাকবে পিঁপড়া সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য আর সবশেষে তোমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবো বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার এক নতুন বন্ধুকে। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান রহমান। তাহলে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।
এক পিঁপড়া একটি গমের দানা মুখে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিল। পথিমধ্যে একটি উঁচু পাথরের কাছে আসতেই তার নাকে লাগল মধুর ঘ্রাণ। চোখ তুলে তাকিয়ে বিরাট মৌচাক দেখে তার জিভে পানি চলে এল। দেরি না করে তখনই সে মুখের দানা ফেলে দিয়ে মধু খাওয়ার জন্য পাথর বেয়ে উপরে উঠার চেষ্টা শুরু করল। কিন্তু যত চেষ্টাই করুক না কেন, কিছুতেই উঠতে পারছিল না। কিছুদূর উঠার পরই পরে যাচ্ছিল মাটিতে। কিন্তু মধুর লোভ তাকে পাগল করে তুলল। শেষ পর্যন্ত পিঁপড়া চিৎকার দিয়ে বলে উঠল:
পিঁপড়া: "তোমরা কে, কোথায় আছ...দয়া করে আমাকে মৌচাকে উঠিয়ে দাও। আমি মধু খাব, আমি মধু খাব।"
এ সময় পাশেই উড়ে যাচ্ছিল একটি ভোমরা। পিঁপড়ার চিৎকার চেঁচামেচি শুনে সে বলল:
ভোমরা: "এই পিঁপড়া! হয়েছে কী? এতো মধু মধু করছ কেন? তুমি কি জানো না, মৌচাকে গেলে বিপদ হতে পারে?"
পিঁপড়া: "আমি বিপদ-আপদ বুঝি না। আমি মধু খেতে চাই। বিপদ-আপদ আমিই ঠেকাব। তুমি আমাকে সাহায্য কর।"
ভোমরা: "আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব না। কারণ মৌমাছির বিষ আছে ওখানে। তাছাড়া মধু খুবই আঁঠালো। ওতে তোমার হাত-পা লেগে গেলে তখন আর কিছুতেই বাঁচতে পারবে না।"
পিঁপড়া: "মৌমাছির বিষের থোড়াই কেয়ার করি আমি। যেভাবেই হোক আমি মধু খেতে চাই।"
ভোমরা: "শোনো পিঁপড়া! জেদ করো না। তুমি যদি বাঁচতে চাও তাহলে মধু খাওয়ার মতো বিপজ্জনক আশা ছেড়ে দাও। মনে রেখো, লোভের ফল কখনো ভালো হয় না।"
পিঁপড়া: "আরে রাখো তোমার ওয়াজ-নসিহত! যদি পারো তাহলে আমাকে মৌচাকে উঠিয়ে দাও আর যদি না পারো তাহলে দাদাগিরি না দেখিয়ে এখান থেকে কেটে পড়ো।"
ভোমরা: "ঠিকাছে! আমার কথা যখন তোমার পছন্দ হচ্ছেই না তখন আমি চলে যাচ্ছি। তবে তোমাকে আবারো মধু খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান করে দিচ্ছি।"
এ কথা বলে ভোমরা চলে গেল। পিঁপড়া আবারো চিৎকার জুড়ে দিল অন্য কারো সাহায্য পাওয়ার আশায়। ওই পথ দিয়েই যাচ্ছিল একটি মাছি। পিঁপড়া মধু খেতে চায় শুনে সে তাকে মনে মনে শায়েস্তা করতে চাইল। কিন্তু তা প্রকাশ না করল না। মাছি বলল:
মাছি: "আরে পিঁপড়া ভাইয়া যে! তুমি মধু খেতে চাও তা আগে আমাকে বলবে না? এসো, আমার সাথে এসো। আমি এক্ষুণি তোমাকে মৌচাকে নিয়ে যাব।"
মাছির কথা শুনে পিঁপড়া খুশিতে লাফিয়ে উঠল। এরপর বলল :
পিঁপড়া : "বাহঃ বাহঃ কী মজা! কতো বড় কপাল আমার! আমি মধু খেতে পারব এরচেয়ে সৌভাগ্য আর কী হতে পারে? মাছি ভাই, তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। তুমিই হচ্ছো, গরীবের সত্যিকারের বন্ধু।"
পিঁপড়ার কথা শুনে মাছি খুব খুশী হলো। তারপর পিঁপড়াকে মাটি থেকে তুলে মৌচাকের কাছে নিয়ে রাখল এবং নিজে বিদায় হলো। মাছি চলে গেলে পিঁপড়া প্রথমে এদিক-সেদিক থেকে কিছুটা মধু চুষে খেলো। এরপর আস্তে আস্তে মৌচাকে ভেতরে প্রবেশ করল। মধু খেতে খেতে দেখল কিছুতেই মাথা নাড়ানো যাচ্ছে না। হাত-পা ছুড়ে মাথা উঠাতে গিয়ে দেখতে পেল, হাত-পাও মধুর আঠায় লেগে গেছে। আরো চেষ্টা করতেই সারা শরীর মধুতে ভিজে লেগে গেল। মধুর আঠা থেকে নিজেকে ছাড়াতে না পেরে পিঁপড়া চিৎকার দিয়ে বলে উঠল :
পিঁপড়া : কে কোথাও আছো, আমাকে বাঁচাও। মহা বিপদে পড়েছি আছি। কোনো বীর যদি আমাকে উদ্ধার করতে পারো তাহলে আমি দুটো গম পুরস্কার দেবো।
এদিকে কাজ সেরে ওই পথ দিয়েই যাচ্ছিল ভোমরা। পিঁপড়ার চিৎকার শুনে তার মন কেঁদে উঠল। সে দ্রুত পিঁপড়াকে মৌচাক থেকে উদ্ধার করল। তারপর বলল :
ভোমরা : "তোমাকে গালমন্দ করতে চাই না। লোভের ফল যে ভালো না তা নিশ্চয়ই এতক্ষণে টের পেয়েছো। তোমার ভাগ্য ভালো ছিল যে আমি এ পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম। নইলে তোমার পরিণতি কী হতো তা আমার আর বলার দরকার নেই। শোন পিপড়া, ভবিষ্যতে সাবধানে চলবে। আর মাছিদের কথা শোনো না। মাছিরা পিঁপড়াদের দরদি নয়। ওরা তোমাদের মঙ্গলও চায় না।"
ভোমরার কথা শুনে পিঁপড়া খুব অনুতপ্ত হলো। জীবনে আর লোভ করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করল এবং নিজের ব্যবহারের জন্য ভোমরার কাছে ক্ষমা চাইল।
বন্ধুরা, লোভী পিঁপড়ার গল্পটি শুনলে। গল্পের সঙ্গে বাস্তব জীবনের মিল নাও থাকতে পারে। তবে জীবনে কোনোদিন পিঁপড়ার কামড় খাওনি এমন কাউকে হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। পবিত্র কুরআনে পিঁপড়ার নামে একটি সূরা আছে। সূরাটির নাম নামল। সূরাটির এ ধরনের নামকরণের কারণ হচ্ছে- এ সূরায় পিঁপড়ার সঙ্গে হযরত সুলাইমান (আ.)’র কথোপকথন স্থান পেয়েছে।

পিঁপড়া সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য
অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আমরা পিঁপড়া বা পিপিলিকা সম্পর্কে তোমাদেরকে কিছু জানা-অজানা তথ্য জানাব।
- বন্ধুরা, পিঁপড়া বা পিঁপড়ে বা পিপীলিকা হল ফর্মিসিডি (Formicidae) গোত্রের অন্তর্গত সামাজিক কীট বা পোকা। পিঁপড়া এদের ঘনিষ্ঠ প্রজাতি বোলতা ও মৌমাছির মত একই বর্গ হাইমেনপ্টেরার (Hymenoptera) অন্তর্গত। এখন পর্যন্ত জানা প্রায় ২২ হাজার পিঁপড়া প্রজাতির মধ্যে সাড়ে ১২ হাজার শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। একটা পিঁপড়া তার নিজ ওজনের ২০ গুণ বেশি ওজনের কোনো জিনিস তুলতে পারে।
- একটা পিঁপড়ার বাসায় তিন ধরণের পিঁপড়া থাকে। কর্মী পিঁপড়া, পুরুষ পিঁপড়া আর রানি পিঁপড়া। সারাজীবন ধরে রাণী পিঁপড়া শুধু খায়, ঘুমায় আর ডিম পাড়ে। তার সেবার জন্য রয়েছে শ্রমিক পিঁপড়া। এদের কাজ হলো ঘুরে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করে আনা। আর সেই খাবার পাহাড়া দেয়ার দায়িত্ব থাকে সৈনিক পিঁপড়াদের ওপর। তাছাড়াও অন্য পিঁপড়াদের জায়গা জমি দখল করতে এবং নিজেদের বাসাবাড়ি রক্ষা করার দায়িত্বও সৈনিক পিঁপড়াদের। অন্যান্য পিঁপড়া বস্তি আক্রমণ করে আর সৈনিক পিঁপড়া খাবার ও ডিম নিয়ে আসে। সেই ডিম ফুটে যে পিঁপড়ার বাচ্চারা বের হয় তারা নতুন বস্তিতে চাকর-বাকরের মতো ফাই-ফরমাশ খাটে।
- রানি পিঁপড়াদের ডানা থাকে। যখন তারা নতুন বাড়ি বানায় তখন সেই ডানাকে ছায়া দেয়ার কাজে ব্যবহার করে।
- পিঁপড়ারা কিন্তু কানে শোনে না। ফলে মাটির কম্পন অনুভব করেই তাদের কানে শোনার কাজ চালাতে হয়। এদের আবার ফুসফুসও নেই। তার বদলে রয়েছে সারা গায়ে অসংখ্য ছোট ছোট গর্ত। সেগুলো দিয়েই শ্বাসকার্য চালিয়ে নেয় ওরা। ও হ্যাঁ, আর একটা কথা। পিঁপড়ারা খুব বেশি মারামারি না করলেও, একবার শুরু করলে শত্রুকে খুন না করা পর্যন্ত কিন্তু থামে না অর্থাৎ পিঁপড়ারা যদি যুদ্ধ শুরু করে তাহলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যায়।
- পিঁপড়ার একটা বাসার রানি যখন মারা যায় এরপর বাসার পিঁপড়ারা মাত্র কয়েকমাস বাঁচতে পারে। রানি ছাড়া অন্য কোনো পিঁপড়া জন্ম নিতে পারে না।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৮