আগস্ট ২৮, ২০১৭ ১৩:৫৪ Asia/Dhaka
  • মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি-২৩

মুহাজ্জাব উদ্দিন দাখভর চিকিৎসাবিদ্যার জগতে এক পরিচিত নাম। সপ্তম শতকে তিনি সিরিয়া এবং মিশরে চিকিৎসাবিদ্যায় বহু ছাত্র তৈরি করেন। বিশেষ করে দামেশকে তাঁর অসংখ্য ছাত্র তৈরি হয়েছিল।

দাখভর তাঁর মৃত্যুর আগে একটি চিকিৎসা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। হিজরী ৬২৮ সালে এই চিকিৎসা বিদ্যালয়টির উদ্বোধন হয় এবং ৮২০ হিজরী পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি তার কার্যক্রম চালিয়ে যায়। সপ্তম হিজরির বিখ্যাত চিকিৎসক ও মনীষীদের মধ্যে ইবনে কোফের নাম বেশ পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন সিরীয় চিকিৎসক। ইবনে নাফিসের যে কজন স্বনামধন্য ছাত্র পরবর্তীকালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে আপন মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন তাঁদের মাঝে অন্যতম হলেন ইবনে কোফ। অস্ত্রোপচার বা অপারেশন সম্পর্কে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বই লেখেন। এই বইটি কেবল স্বতন্ত্রই নয় বরং ব্যতিক্রমধর্মীও ছিল।

বইটির আরবি নাম হলো আল উমদাতু ফি সানাআতিল জারাহা।চক্ষু চিকিৎসা ব্যতীত অন্যান্য অনেক অপারেশনের পদ্ধতি নিয়ে এই বইতে আলোচনা করা হয়েছে। চক্ষু চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা না করার কারণ হলো চক্ষু চিকিৎসা সে সময় চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের বাইরে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি বিষয় হিসেবে পরিগণিত ছিল। অস্ত্রোপচার বা অপারেশনের ব্যাপারে ইবনে কোফ বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং বিস্তৃত পর্যায়ে কাজ করেছেন। মানব দেহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রগ সম্পর্কে তিনি চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়ে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। হার্টের ভাল্ব্ এর কাজ নিয়েও তিনি চমৎকার এবং সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বিশেষ করে সূক্ষ্ম রগগুলোর ব্যাপারে তিনি যে সময় ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন সে সময় মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কৃত হয়নি। এমনকি ইউরোপে মলপিগি মানব দেহের সূক্ষ্ম রগগুলো সম্পর্কে যে যথার্থ ব্যাখ্যা দেন তারও অন্তত চারশ' বছর আগে ইবনে কোফ ঐ ব্যাখ্যা তুলে ধরেছিলেন।

মুসলিম মনীষীগণ অবশ্য চক্ষু চিকিৎসা বিষয়েও মূল্যবান সৃষ্টিকর্ম রেখে গেছেন। চিকিৎসা বিদ্যা বিষয়ক প্রায় সকল সৃষ্টিকর্মেই চক্ষু চিকিৎসা সংক্রান্ত আলাদা অধ্যায় রাখা হতো। ঐ অধ্যায়ে শুধুমাত্র চক্ষু সংক্রান্ত রোগ-ব্যাধি এবং তার চিকিৎসা নিয়েই লেখা হতো। মুসলমান চক্ষু চিকিৎসাবিদগণ চক্ষু চিকিৎসায় নতুন নতুন বহু কিছু আবিষ্কার করেছেন। চক্ষুরোগ এবং তার চিকিৎসা সম্পর্কে গ্রিক চিকিৎসাবিদগণ যেসব উপায় বাতলিয়েছেন সেসবের বাইরেও চোখের আরো অনেক রোগ সনাক্ত করে সেগুলোর চিকিৎসা পদ্ধতিও বাতলে দিয়েছেন ইরানী চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণ। চোখের বিচিত্র অপারেশান,চোখের মণির পানি তুলে নেওয়া কিংবা চোখের কর্ণিয়ায় জমাট তৈলাক্ত পানি বের করা ইত্যাদি সম্পর্কে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছেন মুসলমান চিকিৎসাবিদগণ। সেইসাথে তাঁরা চোখের বিচিত্র রোগের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কেও স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গেছেন। খনিজ, প্রাণীজ এবং উদ্ভিজ্জ ইত্যাদি বিচিত্র ধরনের চিকিৎসা মাধ্যমের কথাও তাঁরা বলে গেছেন।

হিজরি তৃতীয় শতকের শুরুতে ইবনে মাসভিয়ে এবং তাঁর ছাত্র হুনায়ন বিন ইসহাক চক্ষু চিকিৎসা সম্পর্কে খুবই মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিকর্ম রেখে গেছেন। ইতোপূর্বে চোখের যেসব রোগ সনাক্ত করা হয়নি কিংবা চিকিৎসা নিয়েও ভাবা হয় নি, তাঁরা সেইসব অসনাক্ত রোগগুলো সনাক্ত করেছেন এবং তার প্রতিকার সম্পর্কেও লিখেছেন। ‘চক্ষু বিষয়ক দশ প্রবন্ধ' ছিল হুনাইন ইবনে ইসহাকের লেখা বইয়ের নাম। চোখের ঝিল্লির ব্যথার মতো রোগের কথা ইতোপূর্বে কেউ জানতো না। চোখের এই রোগটি আবিষ্কৃত হবার পর চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ এই রোগের চিকিৎসা বা অপারেশান করার বিভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কার করার পেছনে উঠেপড়ে লেগে যেতে বাধ্য হলেন।

চক্ষু চিকিৎসার উন্নয়নে যেসব মুসলমান চিকিৎসক ব্যাপক অবদান রেখেছেন তাদেঁর একজন হলেন আলী ইবনে ইসা। তিনি একটি বই লিখেছিলেন তাযকেরাতুল কাহালাইন নামে। গুরুত্বপূর্ণ এই বইটিতে তিনি চোখের অন্তত ১৩০টি রোগ নিয়ে লিখেছেন। চোখের রোগ ব্যাধি নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন এমন আরেকজন মুসলমান চিকিৎসাবিদ হচ্ছেন আম্মার মৌসেলি। চক্ষু চিকিৎসা সংক্রান্ত তাঁর প্রচুর বই পুস্তকও রয়েছে। এসব বইতে তিনি চোখের অন্তত ৪৮টি সুনির্দিষ্ট রোগ সম্পর্কে কথা বলেছেন। ভেতরে ফাঁকা-এরকম সুঁই দিয়ে তিনি চোখের ভেতরের জল বের করার পদ্ধতি সম্পর্কেও এইসব পুস্তিকায় লিখেছেন।

হিজরি ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতকে চক্ষু চিকিৎসা সম্পর্কে আরবি পুস্তিকা লেখার একটা প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। কায়রোতে ফাতহুদ্দিন কায়সি নামের বিখ্যাত একজন চিকিৎসাবিদ ছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞান বিশেষ করে চক্ষু চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি মূল্যবান এবং ব্যাপক অবদান রেখেছিলেন। চক্ষু চিকিৎসা সম্পর্কে তাঁর ব্যাপক পড়ালেখা এবং গবেষণাই মূল্যবান সব গ্রন্থ রচনার নেপথ্য রহস্য।চোখের ফিজিওলজি,চক্ষু রোগের বিভিন্ন কারণ, রোগের লক্ষণ এবং চোখের ব্যথা-বেদনার চিকিৎসা ইত্যাদি সম্পর্কে তিনি তাঁর লেখা বইতে যেসব দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছেন, লিখিতভাবে সম্ভবত সেটাই ছিল প্রথম নিদর্শন এবং কোনো কোনো রোগ সম্পর্কে তিনিই ঐ বইতে সর্বপ্রথম আলোচনা করেছিলেন।

দামেশকে ইবনে আবু উসাইবা চোখের রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে বেশ মেধার পরিচয় দিয়েছেন। চক্ষু রোগের চিকিৎসা তাঁর সমকালে বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। ইবনে আবু উসাইবা তখন সিরিয়ার বিভিন্ন শহরের হাসপাতালগুলোতে চক্ষু চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এখন অবশ্য উয়ুনুল আম্বিয়া ফিত তাবাকাতিল আতিব্বা গ্রন্থের সাথেই তাঁর নামটি বেশি পরিচিত।

এভাবেই মুসলমান চিকিৎসক ও মনীষীগণ চোখের বহু রোগ সনাক্ত করেছেন এবং সেসব রোগের যথাযথ চিকিৎসা করেছেন।মুসলমান আরেক চক্ষু চিকিৎসক ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছিলেন। তাঁর নাম হলো সাদকা বিন ইব্রাহিম শাজেলি। চক্ষু রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত মূল্যবান অবদান রেখেছেন। তিনি তাঁর নিজস্ব গ্রন্থটিও লিখেছেন চক্ষু চিকিৎসা সম্পর্কে। এই গ্রন্থে তিনি চোখের অপারেশানের বহু পদ্ধতি সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছেন।চক্ষুরোগের চিকিৎসা ছাড়াও মুসলমান চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ পশুরোগের চিকিৎসা সম্পর্কে ব্যাপক অবদান রেখে গেছেন। এ সংক্রান্ত মুসলমান মনীষীগণের লেখা বহু গ্রন্থ এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। এভাবেই মুসলমান মনীষীগণ জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক মূল্যবান অবদান রেখে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন।# 

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/আবু সাঈদ/২৮