সূরা লুকমান; আয়াত ৭-১১ (পর্ব-২)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা লুকমানের ৭ নম্বর থেকে ১১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِ آَيَاتُنَا وَلَّى مُسْتَكْبِرًا كَأَنْ لَمْ يَسْمَعْهَا كَأَنَّ فِي أُذُنَيْهِ وَقْرًا فَبَشِّرْهُ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ (7)
“এবং যখন ওদের সামনে আমার আয়তসমূহ পাঠ করা হয়, তখন ওরা দম্ভের সাথে এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেন ওরা তা শুনতেই পায়নি (অথবা) যেন ওদের দু’কান বধির। সুতরাং ওদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও।” (৩১:৭)
আগের পর্বে বলা হয়েছে, কিছু মানুষ মিথ্যা ও অনর্থক কথাবার্তা প্রচার করে অন্যদেরকে মাতিয়ে রাখে যাতে তারা সত্যের বাণী শুনতে এবং তা গ্রহণ করে ঈমানদার হতে না পারে। এরপর আজকের এ আয়াতে বলা হচ্ছে-এ ধরনের মানুষ পবিত্র কুরআনের বাণী সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা তো দূরের কথা এর আয়াত শুনতেই রাজি নয়। কুরআন থেকে তাদের এই মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণ আত্মম্ভরিতা ও দম্ভ। তারা নিজেদেরকে আল্লাহর রাসূল (সা.) ও ঈমানদার ব্যক্তিদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ মনে করে। যে কারণে তারা সত্যের বাণী শুনতে রাজি নয়।
স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের মানসিকতার অধিকারী মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে যায় এবং ঐশী ক্রোধ ও আজাবের শিকার হয়।এর কারণ হচ্ছে- তারা অজ্ঞতা ও জ্ঞানের অভাবের কারণে কুরআনের বাণী অস্বীকার করেনি বরং জেনেবুঝে শুধুমাত্র দম্ভ ও অহংকারের কারণে কুরআনের বাণী শুনতে চায়নি।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. দাম্ভিক হৃদয় সত্য গ্রহণের পথে অন্তরায়। এটি মানুষকে পথভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
২. ফালতু ও অনর্থক কথাবার্তা নিয়মিত শুনলে মানুষের অন্তর থেকে ধীরে ধীরে সত্য গ্রহণের ক্ষমতা লোপ পেতে থাকে এবং এক পর্যায়ে সে পুরোপুরি সত্যবিমুখ হয়ে যায়।
সূরা লুকমানের ৮ ও ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتُ النَّعِيمِ (8) خَالِدِينَ فِيهَا وَعْدَ اللَّهِ حَقًّا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (9)
“যারা ঈমান আনে আর সৎকাজ করে নিঃসন্দেহে তাদের জন্য রয়েছে নেয়ামতে ভরা বাগানসমূহ (বা জান্নাত)।” (৩১:৮)
“সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি যথার্থ। তিনি পরাক্রমশালী (অপরাজেয়) ও প্রজ্ঞাময়।” (৩১:৯)
এই পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে সত্যের বাণী শুনতে যাদের ভালো লাগে না; বরং ফালতু ও আজেবাজে কথাবার্তা বলতে তাদের খুব পছন্দ। এ ধরনের মানুষ সমাজে কুফরি প্রচার করে বেড়ায় যার পরিণতিতে তাদের জন্য ঐশী শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। অন্যদিকে আরেকদল মানুষ আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে। এর পরিণতিতে মহান আল্লাহর কাছ থেকে তারা পায় মহা পুরস্কার। তারা হচ্ছে সেইসব মানুষ যারা আন্তরিকতা ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে কুরআনের বাণী পড়ে ও শোনে, এ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে এবং গভীর উপলব্ধির মাধ্যমে ঈমান আনে। তারা বিশ্বজগতের প্রতিপালকের বিরুদ্ধে দম্ভ করার পরিবর্তে মহান আল্লাহ ও তাঁর নির্দেশাবলীর সামনে মাথানত করে এবং তাঁর বান্দাদের সঙ্গে আন্তরিকতা ও বিনয়ের সঙ্গে কথা বলে। এ ধরনের মানুষকে মহান আল্লাহ চিরকালীন শান্তির আবাস জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন এবং তাঁর আশ্বাস বাস্তবায়িত হবে সন্দেহাতীতভাবে। কারণ, তিনি মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। তিনি যেমন দুর্বল ও অক্ষম নন তেমনি বাস্তবায়ন অযোগ্য কোনো প্রতিশ্রুতিও তিনি দেন না।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. শুধুমাত্র ঈমান কিংবা শুধমাত্র সৎকর্ম মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারবে না। সৎকর্মশীল ঈমানদার ব্যক্তিরাই কেবল আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ প্রাপ্ত হবেন এবং তারাই নেয়ামতপূর্ণ অবিনশ্বর জান্নাতে প্রবেশ করার সুযোগ পাবেন।
২. জান্নাত হচ্ছে এমন এক সৌভাগ্য ময়আবাসস্থল যেখানে মানুষের জন্য রয়েছে বস্তুগত ও আত্মিক উভয় প্রয়োজনীয়তা মেটানোর অফুরন্ত ভাণ্ডার। কাজেই সেখানে মানুষ ক্লান্ত হবে না, অসহনীয় কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে না এবং তার মধ্যে কখনো অনুতাপও আসবে না।
৩. আমাদেরকে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতিগুলোকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে। সাধারণ মানুষের দেয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যেন আল্লাহর ওয়াদাকে গুলিয়ে না ফেলি। কারণ মানুষের দেয়া প্রতিশ্রুতি অনেক সময় মিথ্যা হয় অথবা তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা ওই ব্যক্তির থাকে না।
সূরা লুকমানের ১০ ও ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
خَلَقَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا وَأَلْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ وَبَثَّ فِيهَا مِنْ كُلِّ دَابَّةٍ وَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجٍ كَرِيمٍ (10) هَذَا خَلْقُ اللَّهِ فَأَرُونِي مَاذَا خَلَقَ الَّذِينَ مِنْ دُونِهِ بَلِ الظَّالِمُونَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (11)
“তিনি খুঁটি ব্যতীত আকাশমণ্ডলী সৃষ্টি করেছেন; তোমরা তা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা, যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্বপ্রকার জন্তু। আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছি, অতঃপর তাতে উদগত করেছি সর্বপ্রকার কল্যাণকর ও মূল্যবান উদ্ভিদরাজি।” (৩১:১০)
“এটা আল্লাহর সৃষ্টি; অতঃপর তিনি ব্যতীত অন্যরা (যাদেরকে তোমরা তাঁর সঙ্গে শরীক করো, তারা) যা সৃষ্টি করেছে, তা আমাকে দেখাও। বরং জালেমরা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত রয়েছে।” (৩১:১১)
এই দুই আয়াতে বিশ্বজগত সৃষ্টিতে মহান আল্লাহর কয়েকটি নিদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আকাশমণ্ডলি ও তারকারাজি সৃষ্টি করে দৃশ্যমান কোনো খুঁটি ছাড়াই সেগুলোকে ভাসিয়ে রাখা। বিশাল বিশাল পাহাড় সৃষ্টি করা। কুরআনের বাণী অনুযায়ী ভূপৃষ্ঠের স্থিতিশীলতা ও স্থিতি অবস্থা ধরে রাখার জন্য এসব পাহাড় তৈরি করা হয়েছে। জল, স্থল ও আকাশে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী সৃষ্টি। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ ও এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী উদ্ভিদ ও তৃণরাজি ছড়িয়ে দেয়া। এ সব কিছুই সৃষ্টি করেছেন মহা পরাক্রমশালী ও দয়াময় আল্লাহ এবং এসব সৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি বা বস্তু তার সহযোগী ছিল না।
এই আয়াতে অদৃশ্যমান সেইসব স্তম্ভের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে আকাশমন্ডলির পাশাপাশি নিজ নিজ কক্ষপথে নক্ষত্র ও তারকারাজি ঘুর্ণায়মান অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া, এখানে বলা হচ্ছে, ভূমিকে নড়াচড়ার হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে পাহাড়সমূহের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এগুলো পবিত্র কুরআনের বৈজ্ঞানিক অলৌকিক নিদর্শনের কিছু উদাহরণ। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে-পবিত্র কুরআনে এসব বৈজ্ঞানিক নিদর্শন এমন যুগে বর্ণনা করা হয়েছে যখন আকাশমন্ডলি ও ভূপৃষ্ঠ সম্পর্কে মানুষের তেমন কোনো জ্ঞানই ছিল না।
সৃষ্টিজগতে মহান আল্লাহর এসব সুস্পষ্ট নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে কিছু মানুষ অজ্ঞতা কিংবা ভুল ধারণার কারণে অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর পূজা করে। তারা ভাবে, এসব ব্যক্তি ও বস্তু তাদের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তাদের আচরণ দেখে মনে হয় মহান আল্লাহ বিশ্বজগত পরিচালনার কিছু দায়িত্ব এসব অংশীদারের কাছে অর্পণ করেছেন। এ কারণে পরের আয়াতে প্রশ্ন করা হচ্ছে: তোমরা যাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করো এই বিশ্বজগতের কোনটি সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা রয়েছে? তাদের পক্ষে আসমান-জমিন ও উদ্ভিদরাজি তো দূরের কথা একটি মশা বা মাছিও কি তৈরি করা সম্ভব? আয়াতের শেষ অংশে এ ধরনের চিন্তাধারাকে নিজের আত্মা ও আল্লাহ তায়ালার প্রতি জুলুম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো-
১. নভোমণ্ডলে হাজার হাজার কোটি ভাসমান গ্রহ নক্ষত্রের নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুর্ণয়ন মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রমাণ বহন করে। সেইসঙ্গে এটি পবিত্র কুরআনের অন্যতম অলৌকিক নিদর্শন। কারণ, ১৪০০ বছর আগে এই কুরআনে অদৃশ্যমান যে স্তম্ভের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাকে বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হিসেবে অভিহিত করছেন।
২. মাটি, পানি, উদ্ভিদ ও প্রকৃতি মহান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান সৃষ্টি। আমাদেরকেও আমাদের চারপাশের পরিবেশের মর্যাদা উপলব্ধি করতে এবং সঠিক উপায়ে এর ব্যবহারে সচেষ্ট হতে হবে।
৩. মহান আল্লাহকে চেনার একটি উপায় হচ্ছে তার সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের সৃষ্টির তুলনা করা।
৪. যে ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো উপাস্যের দিকে ধাবিত হয় সে প্রকারান্তরে জুলুম করে এবং এই জুলুম তাকে চূড়ান্ত পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যায়।#