সূরা লুকমান; আয়াত ১৭-১৯ (পর্ব-৫)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা লুকমানের ১৭ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ (17)
“হে পুত্র, নামায কায়েম কর, (মানুষকে) সৎকাজের আদেশ দাও, মন্দকাজ করতে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে সবর কর। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।” (৩১:১৭)
গত দুই আসরে আমরা নিজ ছেলের প্রতি হযরত লুকমানের কিছু উপদেশ নিয়ে আলোচনা করেছি। সেখানে তিনি ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে ছেলেকে উপদেশ দিয়েছেন। এরপর আজকের এ আয়াতে আল্লাহর ইবাদত ও সমাজের প্রতি একজন মুমিনের সর্বপ্রথম কর্তব্য সম্পর্কে নিজ পুত্রকে হযরত লুকমান বলেন, তৌহিদ বা একত্ববাদ মেনে নেয়ার পর আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা হচ্ছে তোমার প্রধান কাজ। এই ইবাদতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হচ্ছে নামাজ। নামাজ মহান আল্লাহ ও তোমার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং এই ইবাদত তোমার ঈমানের ভিত্তিকে মজবুত করে দেয়।
অবশ্য শুধু নামাজ আদায় করলেই তুমি নিজের ধর্মীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে না। সেইসঙ্গে শুধুমাত্র নিজের পরকালের কথা চিন্তা করাও যথেষ্ট নয়। সমাজের অন্য মানুষকেও নামাজ আদায়সহ আরো যত ভালো কাজ আছে সেগুলো করতে উৎসাহিত করতে হবে। এর ফলে সমাজ মহৎ কাজে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি মন্দ কাজের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে যাতে সমাজে পাপকাজ শেকড় গেড়ে বসতে না পারে। স্বাভাবিকভাবেই সমাজে ভালো কাজের প্রচলন এবং খারাপের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে মানুষকে নানারকম বিপদাপদ ও হুমকির মোকাবিলা করতে হয়। কারণ, খারাপ লোক যেকোনো উপায়ে সমাজকে পরিশুদ্ধ করার কাজে বাধা দিতে চায়। কিন্তু মুমিন ব্যক্তি এ ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে ভয় পেয়ে সমাজ ছেড়ে পালিয়ে যাবে না। বরং সমাজ থেকে মন্দকাজ দূর করে ভালো কাজ প্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত দৃঢ় পায়ে নিজের পথে অটল থাকবে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ঈমানদার ব্যক্তির দৃঢ় প্রত্যয় ও সংকল্প থাকতে হবে। এটি না থাকলে সে কোনো কাজে সফল হবে না।
২. সন্তানের প্রতি পিতামাতার অবশ্য পালনীয় কর্তব্যের একটি হচ্ছে তাকে নামাজ আদায় করতে উৎসাহিত করা।
৩. আমাদের সন্তানদেরকে এমনভাবে প্রতিপালন করতে হবে যাতে বড় হয়ে সে সমাজের স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে দায়িত্ব কাঁধে নিতে সক্ষম হয়। সে যেন সমাজে ছড়িয়ে পড়া মন্দ কাজে বাধা দিতে এবং ভালো কাজকে উৎসাহিত করার অনুপ্রেরণা পায়।
সূরা লুকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ (18)
“অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।” (৩১:১৮)
এই আয়াতে হযরত লুকমান মানুষের স্বভাবের কিছু মন্দ দিক তুলে ধরে সেগুলো করা থেকে নিজের সন্তানকে বিরত থাকতে বলেছেন। নিজেকে অন্য সবার চেয়ে বড় মনে করার মধ্যদিয়েই মানুষের অন্তরে গর্ব ও অহংকারের জন্ম হয়। এই অহংকার একটি মানুষের সামাজিক আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এই আয়াতে এ ধরনের দু’টি অন্যায় আচরণের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এর একটি হচ্ছে অন্যকে ছোট করা বা অপমান করার উদ্দেশ্যে তাকে অবজ্ঞা করা। কোনো কোনো মানুষ সুনাম বা অর্থসম্পদ অর্জনের লক্ষ্যে এ ধরনের আচরণ করে থাকে। তারা নিজেদেরকে নামীদামী বা ধনী ব্যক্তি হিসেবে ভাবে এবং মনে করে অন্যরা তাদের চেয়ে অনেক নীচুশ্রেণির মানুষ। হযরত লুকমান দ্বিতীয় যে আচরণটির কথা বলেছেন তা হলো সমাজে গর্বভরে চলাফেরা করা। কোনো কোনো মানুষ বিনয়ী হওয়ার পরিবর্তে এতটা দম্ভভরে মানুষের মাঝে চলাফেরা করে যেন মনে হয়, তারা এই বিশ্বের অধিপতি এবং অন্য সবার উচিত তাদের সামনে কুর্নিশ করে চলা।
এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১. মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা হচ্ছে সন্তানের প্রতি হযরত লুকমানের অন্যতম উপদেশ। আল্লাহ তায়ালা এই বিজ্ঞচিত উপদেশ পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করে মূলত তাঁর সব বান্দাকে এই গুণে গুণান্বিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
২. অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানদেরকে কিশোর বয়সের শুরুতেই এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া যাতে তারা গর্ব ও অহংকারসহ সব ধরনের নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা পায়।
সূরা লুকমানের ১৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ (19
“পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কন্ঠস্বর নীচু কর। নিঃসন্দেহে গাধার কণ্ঠস্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।” (৩১:১৯)
দু’টি চারিত্রিক খারাপ দিক থেকে বিরত থাকতে নিজ সন্তানকে আহ্বান জানানোর পর এই আয়াতে হযরত লুকমান তাকে দু’টি উন্নত নৈতিক গুণাবলী অর্জনের উপদেশ দেন। তিনি বলেন, জীবনে চলার প্রতিটি পদক্ষেপে মধ্যবর্তী ও ভারসাম্যপূর্ণ পথ অবলম্বন করবে। আচার-ব্যবহারে যেমন উগ্র হওয়া যাবে না তেমনি চরম নমনীয় হওয়াও কাম্য নয়। রাস্তায় চলাচল করার সময়ও ক্ষিপ্রগতি কিংবা অতি ধীরে চলা থেকেও বিরত থাকতে হবে। তুমি স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলাফেরা করবে।
শুধু চলাফেরা ও আচরণে ভারসাম্য আনলে চলবে না কথা বলার ক্ষেত্রেও ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে হবে। এত আস্তে কথা বলা যাবে না যাতে অন্যরা শুনতে না পায়। অন্যদিকে এত বেশি জোরেও বলা যাবে না যাতে অন্যদের মনে বিরক্তি ও অসন্তুষ্টির উদ্রেক হয়। এমনটি মনে করো না যে, তুমি জোরে কথা বললেই মানুষের কাছে তা ভালো লাগবে এবং তারা তোমার বক্তব্য মেনে নেবে। উচ্চস্বরে কথা বলা যে কতটা অপছন্দনীয় তা বোঝানোর জন্য এখানে গাধার উদাহরণ টানা হয়েছে। বলা হয়েছে, নানা প্রাণীর কণ্ঠস্বরের মধ্যে গাধার চিৎকারই সবচেয়ে কর্কশ ও অপ্রীতিকর।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:
১. রাস্তায় চলাফেরা করা এবং কথা বলার মতো সামাজিক আদব-কায়দা সন্তানকে শেখানো পিতামাতার কর্তব্য। কোনো অভিভাবক যেন না ভাবেন, এসব বিষয় তার সন্তান আপনাআপনি শিখে যাবে।
২. যেকোনো বিষয়ে শৈথিল্য বা উগ্রতা অবলম্বন করা উচিত নয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বহুবার আমাদেরকে মধ্যপন্থা অবলম্বনের আদেশ দিয়েছেন।
৩. উচ্চস্বরে কথা বলা ও চিৎকার দেয়া মহান আল্লাহর কাছে একটি অপছন্দীয় ও নিন্দনীয় কাজ। কাজেই আমাদেরকে নীচু স্বরে কথা বলতে এবং অনর্থক চিৎকার চেচামেচি পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কিয়ামতের দিন আমাদেরকে প্রতি কথা ও কাজের হিসাব আল্লাহর দরবারে দিতে হবে।#