সূরা লুকমান; আয়াত ২৫-২৮ (পর্ব-৭)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা লুকমানের ২৫ থেকে ২৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ২৫ ও ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ (25) لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ (26)
“এবং আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল কে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। বলুন, সকল প্রশংসাই আল্লাহর। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জ্ঞান রাখে না।” (৩১:২৫)
“নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলে যা কিছু রয়েছে সবই আল্লাহর। নিঃসন্দেহে আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।” (৩১:২৬)
এই আয়াতে মূর্তিপূজারিসহ সব ধরনের মানুষের পক্ষ থেকে স্বীকার্য একটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় এই বিশ্বজগত কে সৃষ্টি করেছেন? তাহলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দেবে- আল্লাহ। কারণ সব মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই এ বিষয়টি উপলব্ধি করে যে, তারা নিজেরা নিজেদেরই সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়। বিশ্বজগত এবং এর মাঝে থাকা উপাদানগুলো সৃষ্টির তো প্রশ্নই আসে না। এমনকি মূর্তিপূজারি মুশরিকরাও স্বীকার করে যে, এই মূর্তিগুলো সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক নয় বরং একজন প্রভুই এই বিশ্বজগত পরিচালনা করছেন।
মুশরিকদের এই স্বীকারোক্তির জের ধরে পরের আয়াতে বলা হয়েছে, যেহেতু এক প্রভু এই জগতের স্রষ্টা কাজেই আমাদের সেবায় নিয়োজিত এত কিছু সৃষ্টি করার জন্য এক স্রষ্টার প্রশংসা এবং তাঁর ইবাদত করতে হবে। অন্য কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা মূর্তির উপাসনা করা যাবে না।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. মুশরিকরা স্রষ্টা হিসেবে এক আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করে না। তারা বরং মূর্তিকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে এগুলোকে স্রষ্টার কাছে পৌঁছার উপকরণ মনে করে এবং তাদের কাছে শাফায়াত চায়।
২. মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিই তাকে আল্লাহকে চিনতে সহায়তা করে। এমনকি মুশরিকরাও একজন প্রভুকে স্রষ্টা হিসেবে স্বীকার করে।
৩. অজ্ঞতার কারণেই মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালিত হয়। মানুষকে অজ্ঞতার হাত থেকে রক্ষা করে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতেই মহান আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন।
এই সূরার ২৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَوْ أَنَّمَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَجَرَةٍ أَقْلَامٌ وَالْبَحْرُ يَمُدُّهُ مِنْ بَعْدِهِ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ مَا نَفِدَتْ كَلِمَاتُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ (27)
“এবং পৃথিবীতে যত বৃক্ষ আছে, সবই যদি কলম হয় এবং সমুদ্রের সাথে আরও সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও তাঁর বাক্যাবলী লিখে শেষ করা যাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (৩১:২৭)
এই আয়াতে সৃষ্টিজগত ও এর ভেতরে থাকা সব বস্তু ও প্রাণীজগতের বিশালতার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, এই সৃষ্টিজগতের ব্যাপারে মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। কাজেই পৃথিবীর সব গাছকে কলম এবং সাগরের সব পানিকে কালি হিসেবে ব্যবহার করা হলেও মহান আল্লাহর সৃষ্টিজগত সম্পর্কে লিখে শেষ করা যাবে না।
আমাদের জীবনে আমরা বাক্য বলতে কোনো বিষয়কে লেখা বুঝি। কিন্তু এই আয়াতে যে বাক্যাবলীর কথা বলা হয়েছে তার অর্থ মহান আল্লাহর নানারকম সৃষ্টি। এসব সৃষ্টির প্রত্যেকটি আল্লাহ তায়ালার অসীম ক্ষমতার নিদর্শন। সাধারণভাবে বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে লেখার জন্য কলম ও কাগজ ব্যবহার করেন। কিন্তু মহান আল্লাহর জ্ঞানের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। ঠিক এ কারণে এই আয়াতে আলোচ্য উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। কাগজ-কলম দিয়ে আল্লাহর সৃষ্টিজগত, তাঁর দয়া ও নেয়ামতগুলো লেখা সম্ভব নয়।
এই আয়াতের দুটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১. মানুষের পক্ষে যতখানি জানা সম্ভব হয়েছে তার চেয়ে মহান আল্লাহর সৃষ্টি অনেক বিশাল। বিশ্বজগতকে আমাদের সংকীর্ণ ও সীমিত দৃষ্টি দিয়ে দেখা উচিত নয়। কারণ সেক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে আমরা ভ্রান্ত ধারণার শিকার হতে পারি।
২. বিশ্বজগতের সকল সৃষ্টি এক আল্লাহর অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। এ অবস্থায় একাধিক কাল্পনিক স্রষ্টার কাছে সাহায্য চাওয়া কিংবা বহু স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হওয়া ঠিক নয়। আমাদের সকল চাওয়া থাকতে হবে এক আল্লাহর কাছে।
সূরা লুকমানের ২৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
مَا خَلْقُكُمْ وَلَا بَعْثُكُمْ إِلَّا كَنَفْسٍ وَاحِدَةٍ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ (28)
“তোমাদের (সবার) সৃষ্টি ও পুনরুত্থান (আল্লাহর কাছে) একটি মাত্র প্রাণী সৃষ্টি ও পুনরুত্থানের সমান ছাড়া আর কিছু নয়। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।” (৩১:২৮)
আগের আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহর সৃষ্টির বিশালতা বর্ণনা করার পর এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালার অসীম ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে: তাঁর কাছে একজন মানুষ সৃষ্টি এবং সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত মানুষ এসেছে এবং আসবে তাদের সবাইকে সৃষ্টি একই সমান। আল্লাহর অসীম ক্ষমতার সামনে এক ও অসংখ্য সৃষ্টিতে কোনো তফাৎ নেই।
শুধুমাত্র পৃথিবীতে মানুষকে সৃষ্টিই নয় সেইসঙ্গে কিয়ামতের দিন তাদের পুনরুত্থানও মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালার জন্য অতি সহজ। মানব সৃষ্টির শুরু থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ পর্যায়ক্রমে মারা গেছে এবং যাবে তাদের সবাইকে তিনি আবার একসঙ্গে জীবিত করবেন। আমাদের মতো নানা গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ মানুষের জন্য সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কঠিন কাজ সংখ্যায় কম হলে আমাদের জন্য সেটি করা অনেক সময় সহজ হয় কিন্তু সংখ্যা বা পরিমাণ বেড়ে গেলে কাজটি আমাদের জন্য করা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু মহান আল্লাহর জন্য দুঃসাধ্য বলে কোনো কিছু নেই এবং সংখ্যায় অগণিত বা বিশাল পরিমাণ কোনো কিছু করা তার জন্য অতি সহজ।
আয়াতের পরের অংশে বলা হয়েছে: তিনি মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী হওয়ার কারণে তিনি আমাদের সব কৃতকর্মের খবর জানেন। ফলে সেই জ্ঞানের ভিত্তিতে তিনি পুনরুত্থান দিবসে আমাদের পুরস্কার বা শাস্তি দেবেন।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. সময়, স্থান ও সংখ্যা মানুষের জন্য অর্থবহ বিষয় হলেও মহান আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতার কাছে এসব কিছু মূল্যহীন। তাঁর কাছে একজন মানুষ সৃষ্টি করা এবং এক কোটি মানুষ সৃষ্টি করার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সব কিছুই আল্লাহর জন্য সহজ।
২. আমরা যদি উপলব্ধি করি যে, আল্লাহ আমাদের সব কথা শোনেন এবং সব কাজ দেখেন তাহলে আমরা আমাদের প্রতিটি কাজ অত্যন্ত সাবধানের সঙ্গে করব এবং বিপথে পরিচালিত হওয়া থেকে বিরত থাকব।#