সূরা সিজদাহ; আয়াত ১০-১৪ (পর্ব-৩)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা সিজদাহর ১০ থেকে ১৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১০ থেকে ১১ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَقَالُوا أَئِذَا ضَلَلْنَا فِي الْأَرْضِ أَئِنَّا لَفِي خَلْقٍ جَدِيدٍ بَلْ هُمْ بِلِقَاءِ رَبِّهِمْ كَافِرُونَ (10) قُلْ يَتَوَفَّاكُمْ مَلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ تُرْجَعُونَ (11)
“এবং তারা বলে, আমরা (মৃত্যুর পর পচে গলে) মাটিতে মিশ্রিত হয়ে গেলেও পুনরায় নতুন করে সৃজিত হবো কি? (এর মাধ্যমে) বরং তারা তাদের পালনকর্তার সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে।” (৩২:১০)
“বলুন, তোমাদের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। অতঃপর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।” (৩২:১১)
আগের পর্বে মানুষ সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এরপর আজকের এই দুই আয়াতে মানুষের মৃত্যুর প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে: কিয়ামতে অবিশ্বাসীরা বলে: মানুষের মৃত্যুর পর তার দেহ পচে গলে মাটিতে মিশে যায়। এমনকি তার হাড় পর্যন্ত পচে মাটির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। ফলে মানুষের শরীরের আর কোনো অংশই অবশিষ্ট থাকে না। এ অবস্থায় তাদেরকে কিয়ামতের দিন কীভাবে আবার জীবিত করা হবে? যে শরীরটি পুরোপুরি মাটিতে মিশে গেল তার পক্ষে কীভাবে আবার জীবিত হওয়া সম্ভব? কাফেরদের এই অবান্তর প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ বলছেন: মাটির মধ্যে যেটিকে রাখা হয় এবং যেটি মাটিতে মিশে যায় সেটি শুধুমাত্র মানুষের দেহ। কিন্তু যে প্রাণ দিয়ে সে এতদিন জীবিত থেকে দুনিয়ায় চলাফেরা করেছে সেই প্রাণ বা রুহ মৃত্যুর মুহূর্তে আল্লাহর কাছে ফিরে যায়। কিয়ামতের দিন এই রুহকে আবার দুনিয়ার সেই দেহের মতো আরেকটি দেহে প্রবিষ্ট করানো হবে। এভাবেই কিয়ামতের দিন মানুষ আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় হাজির হবে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. কিয়ামতের ময়দানে মানুষের উপস্থিতি হবে সশরীরে। কাফেররা এই বিষয়টিতে সন্দেহ পোষণ করে বা পুরোপুরি অস্বীকার করে।
২. মানুষের রুহ বা প্রাণই আসল; শরীর মূল্যহীন। যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে ততক্ষণ মানুষের দাম আছে। কখনো দুর্ঘটনায় হাত বা পা দেহ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পরও প্রাণ থাকে বলে একজন মানুষ পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকে। কিন্তু প্রাণ চলে যাওয়ার পর মুহূর্তেই পুরো শরীর অক্ষত থাকার পরও এই দেহ আর কোনো কাজে আসে না।
সূরা সিজদাহ’র ১২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَوْ تَرَى إِذِ الْمُجْرِمُونَ نَاكِسُو رُءُوسِهِمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ رَبَّنَا أَبْصَرْنَا وَسَمِعْنَا فَارْجِعْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا إِنَّا مُوقِنُونَ (12)
“এবং যদি আপনি দেখতেন যখন অপরাধীরা তাদের পালনকর্তার সামনে নতশির হয়ে বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা, (আপনি যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা) আমরা দেখলাম ও শ্রবণ করলাম। এখন আমাদেরকে (আবার দুনিয়ায়) পাঠিয়ে দিন, আমরা সৎকর্ম করব। আমরা দৃঢ়বিশ্বাসী হয়ে গেছি।” (৩২:১২)
আগের দুই আয়াতে কিয়ামতের ব্যাপারে কাফেরদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। আর এই আয়াতে বিশ্বনবী (সা.) ও মুমিনদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: তোমরা যদি দেখতে কিয়ামতের দিন সব কাফের ও অপরাধী মাথা নীচু করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে আবার পৃথিবীর জীবনে ফিরে যেতে চাইবে। কিন্তু সেদিন তাদের আবেদন মঞ্জুর হবে না। সেদিন জান্নাত ও জাহান্নাম দেখার পর এবং জাহান্নামীদের গগনবিদারি চিৎকার শোনার পর তারা বলবে, আমরা নিজেদের চোখে কিয়ামতকে দেখেছি বলে আর এ বিষয়টিকে অস্বীকার করি না। কিন্তু সেদিনের সে স্বীকারোক্তি বড্ড দেরিতে দেয়া হবে এবং তা তাদের কোনো কাজেই আসবে না।
তাদেরকে বলা হবে, তোমরা কি দুনিয়ায় নবী-রাসূলদের কথা শোনোনি এবং তাদের মুজিযা দেখোনি? সেদিন কেন সেগুলোতে বিশ্বাস করোনি? তাদের কথাগুলো সত্য হলে তোমাদের পরিণতি কি হতে পারে তা একবারও কেন ভেবে দেখোনি? তাদের কথাগুলো প্রত্যাখ্যান করার মতো উপযুক্ত যুক্তি কি তোমাদের কাছে ছিল? নাকি তোমরা দুনিয়ার ভোগবিলাস ও রিপুর চাহিদা চরিতার্থ করার জন্য নবীদের কথা অস্বীকার করেছিলে?
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. যারা দিনিয়ায় মুমিনদের নিয়ে ঠাট্টা মস্করা করে কিয়ামতের দিন অপরাধীদের মতো তাদের মস্তক অবনত থাকবে।
২. মুমিন ব্যক্তিরাই প্রকৃত জ্ঞানী। তারা না দেখেই কিয়ামত এবং জান্নাত ও জাহান্নামে নিশ্চিত বিশ্বাস করেছে। কিন্তু কাফেররা কিয়ামতের দিন চোখে দেখার পর নিশ্চিত বিশ্বাসী হবে। কিন্তু সেদিনের বিশ্বাস কোনো কাজে আসবে না।
৩. কিয়ামতের দিন যা আমাদেরকে সাহায্য করবে তা হলো ঈমান, সৎকাজ বা নেক আমল।
সূরা সিজদাহ’র ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَوْ شِئْنَا لَآَتَيْنَا كُلَّ نَفْسٍ هُدَاهَا وَلَكِنْ حَقَّ الْقَوْلُ مِنِّي لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ (13) فَذُوقُوا بِمَا نَسِيتُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا إِنَّا نَسِينَاكُمْ وَذُوقُوا عَذَابَ الْخُلْدِ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ (14)
“আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেককে সঠিক দিক নির্দেশ দিতাম; (তা না করে আমি সবাইকে সঠিক ও ভুল পথ বাছাই করার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দিয়েছি) কিন্তু আমার এ উক্তি (ও প্রতিশ্রুতি) অবধারিত সত্য যে, আমি (অপরাধী) জিন ও মানব সকলকে দিয়ে অবশ্যই জাহান্নাম পূর্ণ করব।” (৩২:১৩)
“অতএব আজকের এ সাক্ষাতের কথা ভুলে যাওয়ার কারণে তোমরা (আজাবের স্বাদ) আস্বাদন কর। আমিও তোমাদেরকে ভুলে গেলাম। তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের কারণে চিরস্থায়ী আযাব ভোগ কর। ” (৩২:১৪)
এই আয়াতে মানুষের হেদায়েত প্রাপ্তিকে তার স্বাধীনতার ওপর ছেড়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ মানুষের সামনে নবী-রাসূল, আসমানি কিতাব এবং বিবেক দান করেছেন যাতে সে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য চিনতে পারে। এরপর সত্য গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি মানুষের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। তিনি তার ফেরেশতাদের দিয়ে কোনো মানুষকে ঈমান আনতে বাধ্য করেন না। এদিক দিয়ে নবী-রাসূলরা হচ্ছেন শিক্ষকের মতো। দুনিয়ার জীবনে অমনোযোগী ছাত্র যেমন বছরের শেষে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে পৃথিবীর অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় তেমনি নবী রাসূলদের শিক্ষায় অমনযোগীরা কিয়ামতের দিন জান্নাত থেকে বঞ্চিত হয়ে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।
অনেকে প্রশ্ন করেন, আল্লাহ যদি সত্যিই মহান দয়ালু হয়ে থাকেন তাহলে তিনি কীভাবে তার বান্দাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন? এই ভ্রান্ত ধারণা ও প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে এই আয়াতে। বলা হচ্ছে: আল্লাহর দয়া মানুষের জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত প্রযোজ্য যতক্ষণ সে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে তওবা করে। কারণ, মহান আল্লাহ অনেক বড় দয়ালু বলে বান্দা অনুতপ্ত হলেই তাকে মাফ করে দেন। কিন্তু কাফের ও পাপী বান্দারা একের পর এক পাপ করতেই থাকে এবং কখনো তাদের অন্তরে কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ আসে না। তারা নিজেরাই নিজেদেরকে আল্লাহর দয়া লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. ঐশী সত্য গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য নয় বরং স্বাধীন। কারণ, বাধ্যতামূলক ঈমানের কোনো মূল্য নেই।
২. কিয়ামতের দিন অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর দয়া কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। কাফের ও পাপী ব্যক্তিরা কৃতকর্মের অবধারিত পরিণতিতে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
৩. মহান আল্লাহ কখনো তার বান্দাকে ভুলে যান না। বান্দাই বরং কৃতকর্মের মাধ্যমে আল্লাহকে নিজের ব্যাপারে অমনোযোগী করে দেয়।
৪. কিয়ামতকে অস্বীকার করা থেকেই সব পাপের সূচনা হয়।#