জানুয়ারি ২৭, ২০১৮ ১৪:০৮ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা সিজদাহর ১৫ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১৫ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:  

إِنَّمَا يُؤْمِنُ بِآَيَاتِنَا الَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِهَا خَرُّوا سُجَّدًا وَسَبَّحُوا بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ (15)

“কেবল তারাই আমার আয়াতসমূহের প্রতি ঈমান আনে, যাদের সামনে এই আয়াতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়া হলে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং অহংকারমুক্ত হয়ে তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে।” (৩২:১৫)

এই পৃথিবীতে ঈমানের দাবিদার বহু মানুষ আছে যাদের কথার সঙ্গে কাজের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা ঈমানের দাবি করেন কিন্তু তাদের কাজ-কর্ম কুরআনের শিক্ষাভিত্তিক নয়। ঈমানের দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও তারা আল্লাহর সামনে যেমন সিজদাবনত হয় না তেমনি মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও বিনয়ী নয়। তারা একদিকে আল্লাহর আদেশের সামনে নাফরমানি করে এবং অন্যদিকে মানুষের সামনে দম্ভ ও অহংকার করে বেড়ায়। এই আয়াতটি ইন্নামা (انَّمَا) শব্দ দিয়ে শুরু হয়েছে যা দিয়ে বিশেষ জনগোষ্ঠীকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।  অর্থাৎ শুধুমাত্র এই বিশেষণে ভূষিত লোকজনই শুধু প্রকৃত ঈমানদার এবং বাকি সবাই ঈমানদারের মিথ্যা দাবিদার।

প্রকৃত ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য পবিত্র কুরআন তথা কালামে পাকের সামনে নিজেকে পুরোপুরি আত্মসমর্পন করা। এটির জন্য এত উঁচু পর্যায়ে চলে যাওয়া প্রয়োজন যে, যখনই সে কুরআনের আহ্বান শোনে তখনই সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহ তায়ালার পবিত্রতা ঘোষণা করবে। অথবা যখনই পবিত্র কুরআনের আয়াত অনুযায়ী তাদেরকে কোনো কাজের ব্যাপারে সাবধান করে দেয়া হয় তখনই তারা তা মেনে নেয় এবং অহংকার ও দম্ভভরে তা প্রত্যাখ্যান করে না।

তারা একদিকে আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের প্রশংসা করে এবং অন্যদিকে জীবনের দুঃখ-কষ্ট, ঘাত-প্রতিঘাতের জন্য আল্লাহকে দায়ী করে না। তারা মহান আল্লাহকে বিশ্ব পরিচালনায় সব ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতির ঊর্ধ্বে মনে করে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

 ১. আল্লাহ তায়ালার সামনে সিজদা করা এবং তাঁর প্রশংসা ও মহিমা ঘোষণা করা প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। যে মুসলমান নামাজ আদায় করে না সে প্রকৃতপক্ষে ঈমানদার হওয়ার দাবি করতে পারে না।

২. সিজদাহ’র সময় সবচেয়ে উত্তম তাসবিহ হচ্ছে আল্লাহর হামদ ও পবিত্রতা ঘোষণা করা। অর্থাৎ এটা বলা যে, ‘সুবহানা রব্বিয়াল আ’লা ওয়া বিহামদিহ।’

৩. সেই সিজদাহ আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য ও মূল্যবান যেটা করার পর মানুষের অন্তরে গর্ব, অহংকার ও দম্ভ স্থান পায় না।

এই সূরার ১৬ ও ১৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ (16) فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (17)

“(গভীর রাতে) তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।” (৩২:১৬)      

“কেউ জানে না তার কৃতকর্মের জন্য কি কি নয়ন-প্রীতিকর প্রতিদান লুক্কায়িত আছে।” (৩২:১৭)

আগের আয়াতে আল্লাহ তায়ালার সামনে সিজদাবনত হওয়ার কথা উল্লেখ করার পর এই দুই আয়াতে ঈমানদার ব্যক্তির আরো কিছু গুণ বা বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে।  বলা হচ্ছে, তারা শুধু ফরজ নামাজগুলোই আদায় করে না সেইসঙ্গে গভীর রাতে যখন বাকি সবাই ঘুমে থাকে তখন জাগ্রত হয় এবং নামাজ ও মুনাজাতে মশগুল হয়ে যায়। আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে শেষরাত।  কারণ তখন মানুষ দৈনন্দিন কাজকর্মের চাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত অবস্থায় পরিপূর্ণ মনযোগ দিয়ে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হতে পারে। মানুষ যেন নিজের মন্দকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারে সেজন্য শেষরাত হচ্ছে সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ সময়ে সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি জাহান্নামের আগুন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তাঁর দরবারে অশ্রু ঝরাতে এবং তাঁর রহমতের অবগাহনে সিক্ত হওয়ার আশায় কান্নাকাটি করতে পারে।

নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর সঙ্গে এই সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সে তাঁর বান্দাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায়ও অনুপ্রাণিত হয়। সে তার সামর্থ্য অনুযায়ী বিপদে পড়া মানুষদের সাহায্যে এগিয়ে যায় এবং তাকে আল্লাহ তায়ালা যে রিজিক দান করেছেন তা থেকে তাদেরকে দান করে।

পরের আয়াতে এ ধরনের মানুষদের জন্য আল্লাহর প্রতিদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো ধরনের প্রদর্শন ইচ্ছা ছাড়া যারা এভাবে প্রবল অনুরাগে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করে এবং তাঁর বান্দাদের খোঁজ খবর রাখে তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা এমন প্রতিদান দেবেন যা কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না, তিনি কি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার তাদের জন্য নির্ধারিত রেখেছেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. প্রকৃত মুমিন নিজেকে আল্লাহর আজাব থেকে যেমন মুক্ত ভাবে না তেমনি তাঁর রহমতের ব্যাপারেও নিরাশ হয় না। সে সব সময় ভয় ও আশা নিয়ে বেঁচে থাকে এবং কখনো অহংকার বা হতাশা তাকে পেয়ে বসে না।

২- মধ্যরাতের পর ঘুম থেকে জেগে উঠে কুরআন তেলাওয়াত করা, নামাজ পড়া এবং আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করা প্রকৃত মুমিনের লক্ষণ।

এবং

৩- আল্লাহ  তায়ালার অফুরন্ত পুরস্কার পেতে চাইলে ভোররাতে ঘুম থেকে জাগার কষ্ট সহ্য করতে হবে। 

সূরা সিজদাহর ১৮ ও ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

أَفَمَنْ كَانَ مُؤْمِنًا كَمَنْ كَانَ فَاسِقًا لَا يَسْتَوُونَ (18) أَمَّا الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَلَهُمْ جَنَّاتُ الْمَأْوَى نُزُلًا بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (19)

“ঈমানদার ব্যক্তি কি অবাধ্যের অনুরূপ? তারা (কখনোই পরস্পরের) সমান নয়।” (৩২:১৮)

“যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্যে রয়েছে তাদের কৃতকর্মের আপ্যায়নস্বরূপ বসবাসের জান্নাত।” (৩২:১৯)

আগের কয়েকটি আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই দুই আয়াতে ঈমানের সঠিক ও মিথ্যা দাবিদারদের মধ্যে তুলনা করে বলা হয়েছে: দুটি দলেরই কৃতকর্মের ফল প্রত্যক্ষ করো। দেখো যারা আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে তাদের পরিণতি কি হয়েছে আর যারা মুখে ঈমানের দাবি করা সত্ত্বেও বাস্তবে নাফরমানি করতো তারা কি কঠির পরিণতির মুখোমুখি হয়েছে। মহান আল্লাহর কাছে কখনোই এই দুই দল সমান নয়।

পরের আয়াতে এমন জান্নাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যেটি মহান আল্লাহ তাঁর সৎ ও নেককার বান্দাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। প্রত্যেক সৎকর্মশীল ঈমানদার ব্যক্তি নিজ নিজ আমলের ভিত্তিতে জান্নাতে স্থান পাবে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মানুষকে ঈমানের দিকে আহ্বানের ক্ষেত্রে প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিদের জীবনের সঙ্গে গুনাহগার ও ফাসেক ব্যক্তিদের জীবনের তুলনা করা যেতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষ দুই দলের কৃতকর্ম সঠিকভাবে উপলব্ধি করে নিজেদের চলার পথ বেছে নিতে পারবে।

২. ঈমান ও আমল দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জান্নাত হচ্ছে মানুষের আমলের প্রতিদান; শুধু ঈমানের দাবিদার আমলহীন মানুষ জান্নাতের গন্ধও পাবে না। #