সূরা সাবা: আয়াত ৬-৯ (পর্ব-২)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা সাবার ৬ থেকে ৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এই সূরার ৬ ও ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَيَرَى الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ الَّذِي أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ هُوَ الْحَقَّ وَيَهْدِي إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ (6) وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا هَلْ نَدُلُّكُمْ عَلَى رَجُلٍ يُنَبِّئُكُمْ إِذَا مُزِّقْتُمْ كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّكُمْ لَفِي خَلْقٍ جَدِيدٍ (7)
“যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তারা আপনার পালনকর্তার নিকট থেকে অবতীর্ণ কুরআনকে সত্য জ্ঞান করে এবং এটা মানুষকে পরাক্রমশালী ও প্রশংসনীয় আল্লাহর পথ প্রদর্শন করে।” (৩৪:৬)
“এবং যারা কুফরের পথ অবলম্বন করে তারা বলে, আমরা কি তোমাদেরকে এমন ব্যক্তির সন্ধান দেব, যে তোমাদেরকে খবর দেয় যে, (মৃত্যুর পর কবরে) তোমরা সম্পুর্ণ পঁচে-গলে যাওয়ার পরও তোমাদেরকে নতুন করে সৃষ্টি করা হবে?” (৩৪:৭)
এর আগের আয়াতগুলোতে সেইসব মানুষ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে যারা কিয়ামতকে অস্বীকার এবং অন্য মানুষকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করে। এরপর এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: যাদের জ্ঞান আছে এবং যারা চিন্তা করে তারা আপনার প্রতি অবতীর্ণ আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করে এবং এক পর্যায়ে তাদের কাছে এগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হয়ে যায়। তাদের মধ্যে এই উপলব্ধি আসে যে, ঐশী হেদায়েত অর্জনের সঠিক পথ হচ্ছে কুরআনুল কারিমের আয়াতে বিশ্বাস ও তা অনুসরণ করা।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জামানায় আহলে কিতাবের কিছু ধর্মগুরু তাদের ধর্মীয় বিদ্বেষ ও পূর্বধারণা পরিত্যাগ করে আল্লাহর রাসূলের প্রতি ঈমান এনে মুসলমান হয়ে যান। পরবর্তীতে ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় বহু জ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তি কুরআনের আয়াত অধ্যয়ন করে এর সত্যতা ও বিশালতা উপলব্ধি করার পর আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন।
এদের বিপরীতে সব সময়ই একটি গোষ্ঠী ছিল এবং এখনো আছে যারা পবিত্র কুরআন ও রাসূলে আকরাম (সা.)কে অস্বীকার করার অজুহাত হিসেবে মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে তুলে ধরে তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তারা উপহাস ও অবজ্ঞাভরে আল্লাহর রাসূলের কথা উল্লেখ করে বলে, এই ব্যক্তি দাবি করছে, মানুষের দেহ কবরে পঁচে-গলে মাটি হয়ে যাওয়ার পর আবার মাটির ভেতর থেকে জীবিত হয়ে বের হয়ে আসবে। আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দেয়ার লক্ষ্যে কাফেররা এ ধরনের প্রচেষ্টা চালায়।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. যারা ধর্মকে মানুষের অজ্ঞতার ফসল বলে মনে করে তাদের বিপরীতে ইতিহাসে এমন অনেক চিন্তাবিদ ও গবেষক পাওয়া যায় যারা ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করে তা স্বীকার করেছেন এবং মুসলমান হয়েছেন।
২. নবী-রাসূলদের পথ অনুসরণের মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তিরা পার্থিব ও পরকালীন জীবনে সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন লাভ করেন।
৩. খোদাদ্রোহী মানুষেরা তাদের যুক্তি ও বিচারবুদ্ধিকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে ঠাট্টা ও উপহাসের মাধ্যমে মানুষের কাছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যক্তিত্বকে ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করে। মানুষকে এই মহামানবের শরনাপন্ন হওয়া থেকে দূরে রাখার জন্য তারা এ অপচেষ্টা চালায়।
সূরা সাবার ৮ ও ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَفْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَمْ بِهِ جِنَّةٌ بَلِ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآَخِرَةِ فِي الْعَذَابِ وَالضَّلَالِ الْبَعِيدِ (8) أَفَلَمْ يَرَوْا إِلَى مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنْ نَشَأْ نَخْسِفْ بِهِمُ الْأَرْضَ أَوْ نُسْقِطْ عَلَيْهِمْ كِسَفًا مِنَ السَّمَاءِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً لِكُلِّ عَبْدٍ مُنِيبٍ (9)
“সে কি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলে অথবা সে কি উম্মাদ? (মোটেই না) বরং যারা পরকালে অবিশ্বাসী, তারা আযাব ও ঘোরতর পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত রয়েছে।” (৩৪:৮)
“তারা কি তাদের সামনের ও পশ্চাতের আকাশ ও পৃথিবীর প্রতি লক্ষ্য করে না? আমি ইচ্ছা করলে তাদেরকে ভূপৃষ্ঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে অথবা আকাশের কোন (প্রস্তুর) খণ্ড তাদের উপর নিক্ষেপ করতে পারি। নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রত্যেক তওবাকারী বান্দার জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে।” (৩৪:৯)
আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীরা তাঁর কথা উল্লেখ করে বলে বেড়াত: এই ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলছে এবং পাগল হয়ে গেছে বলে উল্টাপাল্টা কথা বলছে। একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে কীভাবে এ ধরনের কথা বলা সম্ভব?
চরম ঔদ্ধত্য এই জনগোষ্ঠীর জবাব দিতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলছেন: “রাসূলে খোদা মিথ্যাবাদী নন এবং পাগলও হয়ে যাননি বরং তোমরাই মহা পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত রয়েছ। তোমরা ভেবেছ, কিয়ামতকে অস্বীকার করলেই তোমরা পরকালের কঠিন আযাব থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবে।
আয়াতের পরবর্তী অংশে এ ধরনের অবাধ্য ও গোঁয়ার প্রকৃতির লোকদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: তোমরা কি আকাশ ও ভূপৃষ্ঠের প্রতি লক্ষ্য করো না যে, সেগুলো কি বিশাল শক্তিমত্তায় সৃষ্টি করা হয়েছে? যিনি এই বিশাল জগতকে অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্বে এনেছেন তাঁর পক্ষে কি মানুষকে মৃত্যুর পর আবার সৃষ্টি করা অসম্ভব? তোমরা কি সত্যিই তাঁর শক্তিমত্তার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে এ ধরনের কথা বলছ? তিনি কি শক্তিশালী ভূমিকম্পের মাধ্যমে তোমাদেরকে ভূপৃষ্ঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারেন না? অথবা আকাশ থেকে বিশাল পাথরখণ্ড নিক্ষেপ করে তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়িসহ ধ্বংস করে ফেলতে পারেন না? প্রত্যেক চিন্তাশীল মানুষ আল্লাহ তায়ালার এই ক্ষমতার ব্যাপারে অবগত রয়েছেন এবং তারা জানেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ঘটনা বহুবার ঘটেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, একদল মানুষ এতসব নিদর্শন চোখের সামনে থাকার পরও তা থেকে শিক্ষা না নিয়ে উল্টো কিয়ামতকে অস্বীকার করে বসে।
এ দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১. কিছু মানুষ আছে যারা আল্লাহকে এই সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা মনে করলেও পরকালে বিশ্বাসী নয়। তারা মনে করে এভাবে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের বেড়াজাল থেকে মুক্ত থেকে যা খুশি তাই করা সম্ভব।
২. আখেরাতে অবিশ্বাস থেকেই পথভ্রষ্টতার সূচনা হয়।
৩. এই বিশাল সৃষ্টিজগত সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করলে স্রষ্টার পাশাপাশি পরকাল সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাস শক্তিশালী হয়।
৪. যারা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে না তারা কীভাবে আল্লাহর ভয়াবহ আজাব তেকে নিজেদেরকে রক্ষা করবে?
এবং
৪. সৃষ্টিজগত সম্পর্কে চিন্তাভাবনা মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে ধাবিত করে। কাজেই আমাদের উচিত বেশি বেশি চিন্তা ও গবেষণা করা।#