সূরা সাবা: আয়াত ২৫-৩০ (পর্ব-৭)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা সাবার ২৫ থেকে ৩০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এই সূরার ২৫ থেকে ২৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ لَا تُسْأَلُونَ عَمَّا أَجْرَمْنَا وَلَا نُسْأَلُ عَمَّا تَعْمَلُونَ (25) قُلْ يَجْمَعُ بَيْنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ يَفْتَحُ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ وَهُوَ الْفَتَّاحُ الْعَلِيمُ (26) قُلْ أَرُونِيَ الَّذِينَ أَلْحَقْتُمْ بِهِ شُرَكَاءَ كَلَّا بَلْ هُوَ اللَّهُ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (27)
“(হে রাসূল! আপনি) বলুন, আমাদের অপরাধের জন্য তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না এবং তোমরা যা কিছু কর, সে সম্পর্কে(ও) আমরা জিজ্ঞাসিত হব না।” (৩৪:২৫)
“বলুন, আমাদের পালনকর্তা (কিয়ামতের দিন) আমাদের ও তোমাদেরকে সমবেত করবেন, অতঃপর তিনি তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সঠিকভাবে ফয়সালা করবেন। তিনি সর্বজ্ঞ ফয়সালাকারী।” (৩৪:২৬)
“বলুন, তোমরা যাদেরকে আল্লাহর সাথে অংশীদাররূপে সংযুক্ত করেছ, তাদেরকে এনে আমাকে দেখাও। কখনোই সম্ভব নয়, বরং তিনিই আল্লাহ, পরাক্রমশীল, প্রজ্ঞাময়।” (৩৪:২৭)
গত আসরে আমরা বলেছি, আল্লাহর রাসূল (সা.) মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকিমের দিকে আহ্বান করার সময় কাফের ও মুশরিকদেরকে চিন্তা-গবেষণা করে সঠিক পথ বাছাই করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে পার্থিব জীবনে সে যে পথে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তার ভিত্তিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অবশ্য সেদিন মানুষের মধ্যে বিচার ও ফয়সালা করার দায়িত্ব থাকবে আসমান ও জমিনের একচ্ছত্র অধিপতি ও সর্বজ্ঞানী আল্লাহ তায়ালার হাতে। তিনি সত্য দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে ফয়সালা করবেন এবং প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের পুরস্কার ও শাস্তি দেবেন।
পৃথিবীর জীবনে সব মত ও পথের অনুসারীরা দাবি করে, তাদের মতবাদ, বিশ্বাস ও চিন্তাধারাই সঠিক। কাজেই এখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন কাজ। কিন্তু কিয়ামতের দিন এ ধরনের কোনো বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ থাকবে না। সেদিন সবার সামনে সত্য উন্মোচিত হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে সত্য ও মিথ্যাকে আলাদা করে ফেলবেন।
পরে আয়াতে আবার মুশরিকদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: তোমরা যাদেরকে আল্লাহর অংশীদার মনে করছ আসলে তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। এটা তোমাদের অবচেতন মনের অলীক কল্পনা। তোমাদের মূর্তিগুলো মাটি, কাঠ ও পাথর দিয়ে তৈরি জড় বস্তু ছাড়া আর কিছু নয় এবং এগুলো বিশ্বজগত সৃষ্টি ও পরিচালনায় কোনো ভূমিকাই রাখতে পারে না।
এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:
১. কিয়ামতের দিন বিচারের মাপকাঠি হবে সত্য ও মিথ্যা। পারিবারিক সম্পর্ক বা আত্মীয়তার বন্ধন নয়।
২. বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে আলোচনার সময় তাদেরকে পাপী ও অপরাধী হিসেবে সম্মোধন করা যাবে না। তাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়ে তা গ্রহণের সুফল ও প্রত্যাখ্যানের কুফল বর্ণনা করতে হবে।
৩. মূর্তি বা কোনো মানুষ অথবা কোনো ফেরেশতা যাকেই মুশরিকরা তাদের কল্পিত উপাস্য মনে করুক না কেন এসব কথিত উপাস্য তার কিছুই জানে না। মূর্খ মানুষ অযথা তাদেরকে নিজেদের মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে।
এই সূরার ২৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (28)
“আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। ” (৩৪:২৮)
আগের আয়াতগুলোতে তৌহিদ ও শিরক নিয়ে আলোচনার পর এই আয়াতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)কে গোটা মানবজাতির জন্য রাসূল হিসেবে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। তিনি সরাসরি কথা বলেছেন হিজায অঞ্চলের মানুষদের সঙ্গে এবং তাঁর কিতাব আরবি ভাষায় রচিত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি বিশেষ কোনো দেশ, জাতি বা সময়ের জন্য প্রেরিত হননি বরং তাঁর শান্তির বার্তা সব যুগের সব মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর শিক্ষা কার্যকর থাকবে।
এ আয়াতে এই মহাপুরুষের দাওয়াতের পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়েছে: যারা তাঁর দাওয়াতের বাণী শুনে সঠিক পথ গ্রহণ করবে তাদের জন্য তিনি দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে সুখী জীবনের সুসংবাদ দিয়েছেন। অন্যদিকে যারা গোঁয়ার্তুমি ও জিদের বশবর্তী হয়ে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্কবার্তাও উচ্চারণ করেছেন।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:
১. বিশ্বনবী (সা.) গোটা মানবজাতির জন্য রাসূল হিসেবে পৃথিবীতে এসেছিলেন। যেসব অমুসলিম বলে, তিনি আমাদের জাতির মধ্য থেকে আসেননি বলে আমরা তাকে গ্রহণ করব না; তাদের উত্তর হতে পারে এই যে, হযরত ঈসা মাসিহ (আ.) তো ফিলিস্তিন ও সিরিয়া অঞ্চলে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। কাজেই ওই দুই অঞ্চল ছাড়া আর কোনো দেশের মানুষের তো খ্রিস্টান হওয়া উচিত নয়।
২. রাসূলে খোদা আল্লাহর বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব নিয়ে এসেছিলেন; কাউকে জোর করে ইসলাম গ্রহণ করানো তাঁর কাজ ছিল না।
সূরা সাবার ২৯ ও ৩০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
وَيَقُولُونَ مَتَى هَذَا الْوَعْدُ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (29) قُلْ لَكُمْ مِيعَادُ يَوْمٍ لَا تَسْتَأْخِرُونَ عَنْهُ سَاعَةً وَلَا تَسْتَقْدِمُونَ (30)
“তারা বলে, তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে বল, এ ওয়াদা (অর্থাৎ কিয়ামত) কখন বাস্তবায়িত হবে?” (৩৪:২৯)
“বলুন, তোমাদের জন্য এমন একটি দিনের ওয়াদা রয়েছে যাকে তোমরা এক মুহূর্তও বিলম্বিত করতে পারবে না এবং ত্বরান্বিতও করতে পারবে না।” (৩৪:৩০)
এই আয়াতে কিয়ামত সম্পর্কে বলা হচ্ছে: অবিশ্বাসী কাফিররা কিয়ামতকে অস্বীকার করতে না পেরে এটির দিন-ক্ষণ নিয়ে তর্ক জুড়ে দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো কিছুর অস্তিত্ব তার দিন-ক্ষণ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা না থাকার ওপর নির্ভর করে না। যেমন- আমরা সবাই জানি একদিন আমাদের মৃত্যু হবে কিন্তু সেই দিনটি আমাদের জানা নেই।
এই আয়াতে বলা হচ্ছে, কিয়ামত একটি অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার। আল্লাহ তায়ালা এর জন্য যে সময় নির্ধারণ করে রেখেছেন তার চেয়ে এক মুহূর্ত আগে বা পরে তা সংঘটিত হবে না। কিয়ামত দেখার পর তা থেকে পালিয়ে যাওয়ার বা তাকে একটু পিছিয়ে দেয়ার ক্ষমতা তোমাদের থাকবে না। কাজেই তোমরা সেই কঠিন দিবসকে অস্বীকার না করে সেদিন আল্লাহকে কি জবাব দেবে তার প্রস্তুতি নাও।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. কিয়ামতের দিন-ক্ষণ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। এমনকি নবী-রাসূলদেরও সে সময় সম্পর্কে কোনো জ্ঞান দেয়া হয়নি।
২. কিয়ামত কবে হবে কীভাবে হবে তা নিয়ে সময় নষ্ট না করে আমাদের উচিত সেদিনের কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য পুঁজি সঞ্চয় করে নিয়ে যাওয়া।#