ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯ ১২:২৬ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা সাবার ৩৮ থেকে ৪১ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এই সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَالَّذِينَ يَسْعَوْنَ فِي آَيَاتِنَا مُعَاجِزِينَ أُولَئِكَ فِي الْعَذَابِ مُحْضَرُونَ (38)

“আর যারা আমাকে ব্যর্থ করতে পারবে ভেবে আমার আয়াতসমূহকে (অস্বীকার ও বাতিল করার) অপপ্রয়াসে লিপ্ত হয়, তাদেরকে (ঐশী) আযাবে উপস্থিত করা হবে।”(৩৪:৩৮)

গত আসরে সূরা সাবার ৩৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা বলেছি, অধিক সম্পদ ও বেশি সন্তান-সন্ততি মানুষকে ইহলৌকিক সুখ ও পরকালীন মুক্তি দিতে পারে না; বরং ঈমান এবং আমল বা সৎকাজই পারে দুই জগতে মানুষের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনতে।  যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে তাদের জন্যই আল্লাহ তায়ালা পরকালে চিরসুখের জান্নাত প্রস্তুত রেখেছেন।

আর আজকের এই আয়াতে জান্নাতবাসীদের বিপরীতে যারা কুফরি করে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: এ ধরনের মানুষ আল্লাহ সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করে তাঁর আনুগত্য করার পরিবর্তে সব সময় সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তারা ভাবে তাদের কাছে যেহেতু ক্ষমতা, সম্পদ ও অন্যান্য জাগতিক সামগ্রী রয়েছে তাই তারা এসব কিছুকে ব্যবহার করে আল্লাহ তায়ালার আধিপত্যের বাইরে চলে যেতে এবং তাঁর আজাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। কিন্তু মহান আল্লাহ এই আয়াতে তাদের সে ধারণাকে ভ্রান্ত উল্লেখ করে বলছেন, তাদেরকে অবশ্যই কেয়ামতের দিক পাকড়াও করা হবে এবং তাদেরকে পার্থিব জীবনের কৃতকর্মের জন্য চরম শাস্তি ভোগ করতে হবে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দু’টি বিষয় হচ্ছে:

১. ক্ষমতা ও ধন-সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিরা আল্লাহকে ব্যর্থ করে দেয়ার এবং সৃষ্টিকর্তাকে অক্ষম হিসেবে তুলে ধরার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। কিন্তু এ কাজে তারা ব্যর্থ হয়। এসব দাম্ভিক ও অহংকারী মানুষ উল্টো নিজেরাই ব্যর্থ হয় এবং আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়।

২. ইসলামের শত্রুরা মানুষের মধ্যে পবিত্র কুরআনের প্রভাব দুর্বল করে দেয়ার চেষ্টা চালায়। কাজেই সব মুসলমানের বিশেষ করে আলেম-উলামার দায়িত্ব হচ্ছে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে শত্রুদের এ প্রচেষ্টা সর্বান্তকরণে প্রতিহত করা।

সূরা সাবার ৩৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قُلْ إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ (39)

“বলুন, আমার পালনকর্তা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন অথবা (যাকে ইচ্ছা) সংকীর্ণ (ও সীমিত) পরিমাণে দেন। এবং তোমরা যা কিছু (তার রাস্তায়) ব্যয় কর, তিনি তার বিনিময় দেন। তিনি সর্বোত্তম রিযিক দাতা।” (৩৪:৩৯)

যেসব দাম্ভিক ও অহংকারী ব্যক্তি নিজেদের সম্পদ ও ক্ষমতার দম্ভে আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধাচরণ করে আগের আয়াতে তাদের পরিণতি বর্ণনা করার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: মানুষের রিজিক একমাত্র আল্লাহর হাতে রয়েছে। তিনি নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে যাকে ইচ্ছা অনেক বেশি রিজিক দান করেন এবং কারো কারো রিজিক সংকীর্ণ করে দেন। কাজেই আল্লাহ তায়ালা যদি কাউকে রিজিক বাড়িয়ে দেন তার যেমন অহংকারী হওয়া উচিত নয় তেমনি কারো রিজিক সীমিত হয়ে আসলেও তার হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে এ কাজ করেছেন এবং এতেই বান্দার কল্যাণ নিহিত রয়েছে। 

আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে: মানুষকে সর্বাবস্থায় তার সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবি মানুষকে দান করতে হবে। কারণ, যতটুকু সামর্থ্য আমাদের আছে তার সবটুকুই আল্লাহর দান। এ ছাড়া,এই আয়াতে আল্লাহ এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, আমরা যতটুকু দান করব তিনি তার বিনিময় দেবেন। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, এই বিনিময় হতে পারে দ্বিগুণ, ১০ গুণ বা তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি।

এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. মানুষের মেধা ও যোগ্যতা কিংবা তার রিজিকের পরিমাণ নির্ভর করে আল্লাহ তায়ালার প্রজ্ঞার ওপর।  মানুষ শুধু প্রচেষ্টা চালাতে পারে; রিজিক দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ।

২. মানুষসহ সকল প্রাণীর রিজিক যার হাতে সেই আল্লাহ এ নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, মানুষ যা কিছু দান করবে তিনি তার চেয়ে উত্তম প্রতিদান দেবেন।

এই সূরার ৪০ ও ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ يَقُولُ لِلْمَلَائِكَةِ أَهَؤُلَاءِ إِيَّاكُمْ كَانُوا يَعْبُدُونَ (40) قَالُوا سُبْحَانَكَ أَنْتَ وَلِيُّنَا مِنْ دُونِهِمْ بَلْ كَانُوا يَعْبُدُونَ الْجِنَّ أَكْثَرُهُمْ بِهِمْ مُؤْمِنُونَ (41)

“এবং যেদিন তিনি তাদের সবাইকে একত্রিত করবেন এবং ফেরেশতাদেরকে বলবেন, এরা কি তোমাদেরই পূজা করত?”(৩৪:৪০)

“ফেরেশতারা বলবে, (হে আল্লাহ!) আপনি পবিত্র, আপনি আমাদের পালনকর্তা, তারা নয়; তারা বরং জিনদের পূজা করত এবং তাদের অধিকাংশই শয়তানে বিশ্বাসী ছিল।” (৩৪:৪১)

মুশরিকদের অন্যতম কুসংস্কার ও ভুল ধারনা ছিল এই যে, কিয়ামতের দিন ফেরেশতারা তাদের মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে শাফায়াত বা সুপারিশ করতে পারবে। এ কারণে তারা নানাভাবে ফেরেশতাদের পূজা করত এবং তাদের ইবাদতখানায় ফেরেশতাদের জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণ করে রাখত। অথচ ফেরেশতারা নিজেরা এ ধরনের দাবি করত না এবং তাদের তাদের জন্য এ ধরনের কোনো স্থান নির্ধারণ করে দিতেও বলেনি।

পবিত্র কুরআনে কিয়ামতের দিন এ ধরনের মুশরিকদের পরিণতির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হচ্ছে: আল্লাহর সামনে ফেরেশতারা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বলবে, মুশরিকরা শয়তানের চক্রান্তের শিকার হয়েছিল এবং তারা শয়তানের আনুগত্য করত। শয়তানের নির্দেশেই তারা যাবতীয় কাজ করত। শয়তান মূর্তিপূজাকে তাদের জন্য দৃষ্টিনন্দন করে দিয়েছিল। শয়তানের প্ররোচনায় খোদাদ্রোহী কাজ করেই তারা আনন্দ পেত। তারা এক আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানের বান্দায় পরিণত হয়েছিল এবং তারই পূজা করত।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. ফেরেশতাদের প্রতি মুশরিকদের বিশেষ সম্মান ছিল। তারা ভাবত, কিয়ামতের দিন ফেরেশতারা তাদের জন্য শাফায়াত বা সুপারিশ করতে পারবে। এ কারণে তারা তাদের ধারণা অনুযায়ী সেই শাফায়াত পেতে নানাভাবে ফেরেশতাদের পূজা করত।

২. শয়তান যাতে আমাদের ধোঁকা দিতে না পারে সেজন্য প্রতি মুহূর্তে সজাগ থাকতে হবে। আমরা যেন ঈমানের সঠিক পথ ছেড়ে ভুল পথে পা না বাড়াই। শয়তান সব সময় খারাপ কাজকে আমাদের চোখে শোভনীয় করে ফুটিয়ে তোলে।  এ ব্যাপারে সচেতনতা খুবই জরুরি। #