সূরা সাবা: আয়াত ৪২-৪৫ (পর্ব-১১)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা সাবার ৪২ থেকে ৪৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এই সূরার ৪২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَالْيَوْمَ لَا يَمْلِكُ بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ نَفْعًا وَلَا ضَرًّا وَنَقُولُ لِلَّذِينَ ظَلَمُوا ذُوقُوا عَذَابَ النَّارِ الَّتِي كُنْتُمْ بِهَا تُكَذِّبُونَ (42)
“অতএব আজকের দিনে তোমরা একে অপরের কোন উপকার ও অপকার করার অধিকারী হবে না; আর আমি জালেমদেরকে বলব, তোমরা আগুনের যে শাস্তিকে মিথ্যা বলতে তা আস্বাদন কর।” (৩৪:৪২)
এর আগের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুশরিকদের উদ্দেশ করে বলেছিলেন, তোমরা ফেরেশতাদের পূজা করার পাশাপাশি আশা করতে কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের জন্য সুপারিশকারী হবে। কিন্তু কিয়ামতের দিন খোদ ফেরেশতারা এ বিষয়টি অস্বীকার করে বলবে, তোমরা আসলে পূজা করতে শয়তানের এবং তার কাছে সাহায্য কামনা করতে।
এরপর আজকের এ আয়াতে বলা হচ্ছে: কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ এবং তিনি যাদেরকে অনুমতি দেবেন তারা ছাড়া আর কেউ অন্যের কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারবে না। অর্থাৎ সেদিন তারা জান্নাতপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে জাহান্নামে কিংবা জান্নাহাম অবধারিত হয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে জান্নাতে নিতে পারবে না। সেদিনের একমাত্র কর্তৃত্ব থাকবে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহর হাতে। কাজেই মুশরিকরা পার্থিব জীবনে নিজেদের পাশাপাশি আল্লাহর দ্বীনের ওপর সবচেয়ে বড় জুলুম করার কারণে সেদিন তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। এ হচ্ছে সেই জাহান্নাম যার কথা তারা দুনিয়াতে অস্বীকার করত।
এ আয়াত থেকে আমরা যেসব শিক্ষা পাই তার কয়েকটি হচ্ছে:
১. দুনিয়াতে মানুষ ইচ্ছা করলে অন্যের উপকার বা ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু কিয়ামতের দিন অন্যের উপকার করা তো দূরের কথা কারো পক্ষে নিজের উপকার করারই ক্ষমতা থাকবে না।
২. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো মুখাপেক্ষী হওয়া নিজের প্রতি এক ধরনের জুলুম। তবে আল্লাহ তায়ালাই নবী-রাসূলদের মতো যাদেরকে মাধ্যম হিসেবে পাঠিয়েছেন তাদের কথা ভিন্ন।
সূরা সাবার ৪৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آَيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ قَالُوا مَا هَذَا إِلَّا رَجُلٌ يُرِيدُ أَنْ يَصُدَّكُمْ عَمَّا كَانَ يَعْبُدُ آَبَاؤُكُمْ وَقَالُوا مَا هَذَا إِلَّا إِفْكٌ مُفْتَرًى وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلْحَقِّ لَمَّا جَاءَهُمْ إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ (43)
“এবং যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হয়, তখন তারা বলে, তোমাদের বাপ-দাদারা যার ইবাদত করত এ লোকটি যে তা থেকে তোমাদেরকে বাধা দিতে চায়। তারা আরও বলে, এই কুরআন মনগড়া মিথ্যা ছাড়া কিছু নয়। আর কাফেরদের কাছে যখন সত্য আগমন করে, তখন তারা বলে, এতো এক সুস্পষ্ট জাদু।” (৩৪:৪৩)
আগের কয়েকটি আয়াতে কিয়ামত অস্বীকারকারীদের অবস্থা বর্ণনা করার পর এই আয়াতে তাদের পক্ষ থেকে কুরআন অস্বীকার করার কথা জানানো হয়েছে। বলা হচ্ছে: উগ্রতা ও গোঁড়ামির কারণে মুশরিকরা কুরআন ও রাসূলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত যুক্তির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে পিতৃপুরুষদের ধর্মীয় বিশ্বাসে অটল থাকে। শুধুমাত্র বাপ-দাদাদের শিক্ষার বিপরীত কথা বলার কারণে তারা কুরআনের আয়াত গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করে। কুরআনে কারিমের ব্যাপারে মুশরিকদের দ্বিতীয় দাবি হচ্ছে, এসব আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে আসেনি বরং একজন মানুষ মনগড়া মিথ্যা সাজিয়ে আল্লাহর নামে চালিয়ে দিতে চায়। কুরআনের প্রতি মুশরিকদের তৃতীয় অপবাদ হচ্ছে, যদি কেউ কুরআনের বাণীতে অভিভূত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে থাকে তাহলে সে রাসূলে খোদার জাদুকরি বক্তব্যের ধোকায় পড়েছে; এসব বক্তব্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আসেনি।
কুরআনের প্রতি কাফের ও মুশরিকরা এই যে তিন ধরনের অপবাদ দিয়েছে এটি শুধু শেষ নবীর সময়েই ঘটেনি বরং আল্লাহ যুগে যুগে যত নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের সবার প্রতি কাফের-মুশরিকরা এ ধরনের অপবাদ দিয়েছে।
এ আয়াত থেকে আমরা যেসব শিক্ষা নিতে পারি তার কয়েকটি হচ্ছে:
১. পূর্বপুরুষদের সম্পদ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে কিন্তু তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস গ্রহণ করা যাবে না।
২. সব যুগের নবী-রাসূলরা আগে থেকেই মানুষের মধ্যে সত্যবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কাজেই তাদের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ মনগড়া ও মিথ্যা একটি কিতাব রচনা করার প্রশ্নই আসে না।
৩. যেকোনো জাদুবিদ্যা শেখার জন্য এই বিদ্যার শিক্ষক প্রয়োজন কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবী-রাসূলগণ কারো কাছ থেকে জাদুবিদ্যা শেখেননি। তারা শুধুমাত্র আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাদেরকে সঠিক পথের দিশা দিতে পৃথিবীতে এসেছেন।
এই সূরার ৪৪ ও ৪৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا آَتَيْنَاهُمْ مِنْ كُتُبٍ يَدْرُسُونَهَا وَمَا أَرْسَلْنَا إِلَيْهِمْ قَبْلَكَ مِنْ نَذِيرٍ (44) وَكَذَّبَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَمَا بَلَغُوا مِعْشَارَ مَا آَتَيْنَاهُمْ فَكَذَّبُوا رُسُلِي فَكَيْفَ كَانَ نَكِيرِ (45)
“এবং আমি তাদেরকে কোন (ঐশী) কিতাব দেইনি, যা তারা অধ্যয়ন করবে এবং আপনার পূর্বে তাদের কাছে কোন সতর্ককারী প্রেরণ করিনি।” (৩৪:৪৪)
“এবং তাদের পূর্ববর্তীরাও (নবী-রাসূলদের প্রতি) মিথ্যা আরোপ করেছে। অথচ আমি (অতীতে) তাদেরকে যা দিয়েছিলাম, (আপনার কওমের লোকজন) তার এক দশমাংশও পায়নি। এরপরও তারা আমার রাসূলগণকে মিথ্যা বলেছে। অতএব (দেখো) কেমন ছিল আমার শাস্তি।” (৩৪:৪৫)
আল্লাহর নবী ও পবিত্র কুরআনের প্রতি মুশরিকদের অপবাদের জবাবে এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: এর আগে কুরাইশ জাতির প্রতি কোনো নবী বা আসমানি কিতাব পাঠানো হয়নি। কাজেই তাদের পক্ষে সেরকম কোনো কিতাবের বাণীর ওপর ভিত্তি করে কুরআনের বাণীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)কে জাদুকর বলা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তারা যুক্তির কাছে না গিয়ে গায়ের জোরে এসব কথা বলেছে। পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: অতীতের জাতিগুলো মক্কার মুশরিকদের চেয়ে শৌর্যবীর্যে দশগুণেরও বেশি অগ্রগামী ছিল। তারপরও তাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়েছেন। কাজেই তাদের সেই ইতিহাস সামনে থাকার পরও কুরাইশের কাফেররা কীভাবে আল্লাহর রাসূল ও তার কিতাবকে অস্বীকার করে?
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. ধর্মীয় বিষয়ে কোনো কিছু গ্রহণ বা বর্জনের জন্য ঐশী গ্রন্থ বা রাসূলের সুন্নতকে ভিত্তি ধরতে হবে। শুধুমাত্র ভ্রান্ত ধ্যান-ধারনা দিয়ে কোনো কিছু গ্রহণ বা বর্জন করা যাবে না।
২. দ্বীনের শত্রুদের সম্পদ ও ক্ষমতা আল্লাহর মহাশক্তির সামনে তুচ্ছ। কাজেই শত্রুদের ক্ষমতাকে ভয় পেলে চলবে না। আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করে সঠিক পথে চলা অব্যাহত রাখতে হবে।
৩. বর্তমান সময়ের মানুষের জন্য অতীত জাতিগুলোর ঘটনাপ্রবাহে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। ক্ষমতা হাতে পেলে আমরা যেন অহংকারী হয়ে না যাই এবং আল্লাহর বিপক্ষে না দাঁড়াই। #