মার্চ ০২, ২০১৯ ১৬:০৫ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা সাবার ৪৬ থেকে ৪৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এই সূরার ৪৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قُلْ إِنَّمَا أَعِظُكُمْ بِوَاحِدَةٍ أَنْ تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَى وَفُرَادَى ثُمَّ تَتَفَكَّرُوا مَا بِصَاحِبِكُمْ مِنْ جِنَّةٍ إِنْ هُوَ إِلَّا نَذِيرٌ لَكُمْ بَيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ (46)

“(হে রাসূল আপনি) বলুন, আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি: তোমরা আল্লাহর নামে দু’জন দু’জন করে ও একজন একজন করে দাঁড়াও, অতঃপর চিন্তা-ভাবনা করো (যাতে তোমরা উপলব্ধি করতে পারো যে)- তোমাদের সঙ্গীর মধ্যে কোন উম্মাদনা নেই। তিনি তো আসন্ন কাঠোর শাস্তি সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ক করেন মাত্র।”

এই আয়াত থেকে শুরু করে সূরা সাবার পরবর্তী আয়াতগুলোতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে সুস্পষ্টভাবে নিজের দাওয়াতের পদ্ধতি জনগণের সামনে তুলে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। এই আয়াতে প্রথম নির্দেশ হিসেবে আল্লাহ বলছেন: হে নবী! আপনি জনগণকে বলুন তোমাদের পাশাপাশি তোমাদের সমাজকে সংশোধনের জন্য আমি দাওয়াতের বাণী নিয়ে এসেছি। তোমরা যদি সমাজে বিদ্যমান পাপকাজ, অপকর্ম ও নোংরামি থেকে মুক্তি চাও এবং এসব কাজের কঠোর পরিণতি ভোগ করতে না চাও তাহলে নিজেদেরকে ও সমাজকে সংশোধনের জন্য উঠে দাঁড়াও, আন্দোলন করো। এই আন্দোলন হবে আল্লাহর প্রতি ঈমানের ভিত্তিতে এবং তাঁকে খুশি করার জন্য, পার্থিব কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য নয়।

তোমরা যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে খুশি করতে চাও তাহলে যেকোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগে নিজেদের বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনাকে সংশোধন করে নাও। আল্লাহ তায়ালা কেনো তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের কাছে কি চান তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করো। তিনি কি উদ্দেশ্যে তোমাদের কাছে তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন তা একবার ভাবো। সেইসঙ্গে তোমরা যে পাপাচারে নিমজ্জিত রয়েছো সেসবের পরিণতি কি হতে পারে তাও ভেবে দেখো।

যদি তোমরা একটুখানি চিন্তা করো তাহলে উপলব্ধি করবে যে, মহান আল্লাহ মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার জন্য তাঁর নবীকে পাঠিয়েছেন। কাজেই তোমাদেরকে পাপকাজের পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক করা ছাড়া রাসূলের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তাহলে যিনি তোমাদেরকে নিজেদের অন্যায় কাজের ব্যাপারে সতর্ক করছেন তিনি কীভাবে উন্মাদ হবেন? তোমরা কেন তার বিরুদ্ধে এমন মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ? তোমরা যেসব অপকর্ম করছ তার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে এতদিন তোমরা অজ্ঞ ছিলে। এখন কেউ যদি সে বিষয়টি তোমাদেরকে জানান তাহলেই কি তিনি উন্মাদ হয়ে যাবেন?

অবশ্য সমাজ সংশোধনের প্রচেষ্টা চালানোর সময় অপরের সাহায্যের প্রত্যাশা করা যাবে না। এটা ভাবা যাবে না যে, গোটা সমাজ যেখানে নষ্ট হয়ে গেছে সেখানে আমি একা কীভাবে এত বড় কাজ করব? বরং দু’জন দু’জন করে এ কাজে হাত দিতে হবে। যদি তা না পাওয়া যায় তাহলে একজন একজন করে করতে হবে। আমাদেরকে নিজেদের সংশোধনের পাশাপাশি সমাজকে সংশোধনের জন্য চেষ্টা করতে হবে। কারো অবহেলা বা অবজ্ঞা যেন আমাদেরকে এ মহান কাজ থেকে বিরত না রাখে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. দ্বীনের কাজে শুধু বক্তৃতা দিয়ে কাজ হবে না। আন্দোলন করতে হবে এবং উদ্দেশ্য হতে হবে অবশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টি।

২. আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে আন্দোলন হয় তাতে মানুষের সংখ্যা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে না; বরং কতটা একনিষ্ঠ চিত্তে এ কাজ করা হচ্ছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

৩. আল্লাহর রাসূল যে সমাজে বড় হয়েছেন এবং যে সমাজের প্রতিটি মানুষ তাঁকে সচ্চরিত্রবান ও আল-আমিন বলে জানত সেই সমাজে যখন তিনি দ্বীনের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন তখন তাঁকে উন্মাদ বলে সম্মোধন করা হয়। এখান থেকে বোঝা যায়, দ্বীনের দাওয়াত দেয়া সহজ কাজ নয়। নানা বিপত্তি আসবে এবং সেসব প্রতিবন্ধকতা হাসিমুখে প্রতিহত করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

সূরা সাবার ৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন:

  قُلْ مَا سَأَلْتُكُمْ مِنْ أَجْرٍ فَهُوَ لَكُمْ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ (47)

“বলুন, আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক বা পুরস্কার চাই না বরং তা তোমাদেরই জন্য। আমার পুরস্কার তো আল্লাহর কাছে রয়েছে। তিনি প্রত্যেক বস্তুকেই প্রত্যক্ষ করছেন।” (৩৪:৪৭)

আগের আয়াতের মতো এই আয়াতেও মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে নিজের দাওয়াতের পদ্ধতি বর্ণনা করার আদেশ দিয়েছেন। রাসূল বলছেন: আমি পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে তোমাদেরকে সতর্ক করতে আসিনি এবং তোমাদের কাছ থেকে কোনো পুরস্কারও চাই না।  আমার রিসালাতের পুরস্কার আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

তোমাদেরকে আমি যে কাজের আহ্বান জানাচ্ছি তা করলে তার পুরস্কার তোমরাই পাবে। যদি তোমরা ভাবো আমি আমার জন্য কিছু চাচ্ছি সে চাওয়াও আসলে তোমাদেরই জন্য। যেমন- আমি যদি বলি আমার আহলে বাইতকে ভালোবাসো তাহলে তা এজন্য বলছি যে, এর সুফল তোমরাই ভোগ করবে। আমার আহলে বাইতকে অনুসরণ করলে তোমরা সঠিক পথের দিশা পাবে এবং পথভ্রষ্ট হবে না।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ধর্ম প্রচারকরা জনগণের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার আশা করতে পারবেন না। তারা আগে থেকে বলে দেবেন তারা মানুষের হেদায়েত ছাড়া অন্য কিছু চান না।

২. ধর্মীয় বিধি-বিধান পালন করতে গিয়ে আমরা যেন এটা না ভাবি যে, আল্লাহর ও তাঁর রাসূলকে আমরা কিছু দিলাম। আল্লাহর ইবাদত করে আমরা বরং নিজেদেরই উপকার করেছি; এতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কোনো লাভ হয়নি।

৩. যেহেতু আল্লাহ তায়ালা আমাদের সব কাজ প্রত্যক্ষ করছেন তাই কিছু মানুষের অবজ্ঞা ও কটূক্তির কারণে আমরা যেন কষ্ট পেয়ে মানুষকে দ্বীনের পথে দাওয়াত দেয়ার কাজ বন্ধ করে না দেই।#