মার্চ ২৬, ২০১৯ ১৩:১২ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ৩ থেকে ৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এ সূরার ৩ ও ৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُؤْفَكُونَ (3) وَإِنْ يُكَذِّبُوكَ فَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِنْ قَبْلِكَ وَإِلَى اللَّهِ تُرْجَعُ الْأُمُورُ (4)

“হে মানুষ, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর। আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন স্রষ্টা আছে কি, যে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে রিযিক দান করে? তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। অতএব তোমরা কীভাবে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ?”(৩৫:৩)

“তারা যদি আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে, তবে আপনার পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণকেও তো মিথ্যাবাদী বলা হয়েছিল। যাবতীয় বিষয় আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে।” (৩৫:৪)

গত আসরে আমরা আল্লাহ তায়ালার সার্বজনীন ও সর্বব্যাপী রহমত বা দয়া নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আর আজকের এ দুই আয়াতে মানুষের সৃষ্টি ও তাকে রিজিক দানের ক্ষেত্রে আল্লাহর একক কর্তৃত্বের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: আসমান ও জমিন থেকে তোমাদের প্রতি যেসব অনুগ্রহ নাজিল হয় তা আসে এক আল্লাহরই পক্ষ থেকে। যে আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনিই তোমাদেরকে রিজিক দান করেন। বিষয়টি এরকম নয় যে, তোমাদেরকে এক আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন এবং অন্য কেউ তোমাদেরকে রিজিক দান করেন। তিনি ছাড়া যেমন কোনো স্রষ্টা নেই তেমনি তোমাদের রিজিকও তিনি ছাড়া অন্য কারো হাতে নেই। কাজেই হে মানুষ! আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছ থেকে যদি রিজিক আশা করো তাহলে তোমরা বিভ্রান্তিতে পতিত হবে।

এখানে রিজিক বলতে আমরা যা খাই শুধুমাত্র তার কথা বোঝানো হয়নি বরং আমাদের জীবন চলার জন্য যাবতীয় প্রয়োজনের কথা বোঝানো হয়েছে। পরের আয়াতে বিশ্বনবী (সা.) ও মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ বলছেন, কাফের ও মুশরিকরা কুরআনের বাণী অস্বীকার করে আল্লাহর নবীর ওপর যে মিথ্যারোপ করছে তাতে নিজেদের সঠিক অবস্থানের ব্যাপারে তোমাদের মনে যেন বিন্দুমাত্র সন্দেহ না জাগে। বরং তোমরা তোমাদের পথে অটল ও অবিচল থেকো এবং জেনে রেখো, পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তীত হবে। সেদিন তিনি আজকের আচরণের জন্য কাফেরদের শাস্তি দেবেন এবং তোমাদেরকে করবেন পুরস্কৃত।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:

১. ঐশী নেয়ামত বা অনুগ্রহগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে আল্লাহকে চেনা সহজ হয় এবং কুফর ও শিরক থেকে দূরে থাকা যায়।

২. মানুষের রিজিক আল্লাহর হাতে। তিনি তাঁরই সৃষ্ট দৃশ্যমান বস্তুর মাধ্যমে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।

৩. অতীত জাতিগুলোর পরিণতির কথা স্মরণ করলে যেমন মুসলমানদের ঈমান দৃঢ় হয় তেমনি কাফির-মুশরিকদের ঐশ্বর্য ও ভোগবিলাস দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।

৪. কিয়ামতের ভয় অন্তরে পোষণ করলে কাফেরদের শত্রুতার পাশাপাশি পার্থিব জীবনের নানা বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে ঈমানের পথে অটল থাকা সহজ হয়।

সূরা ফাতিরের ৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللَّهِ الْغَرُورُ (5)

“হে মানুষ, নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। সুতরাং, (দুদিনের) পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে প্রতারণা না করে। এবং সেই প্রবঞ্চক (শয়তান) যেন কিছুতেই তোমাদেরকে আল্লাহর (দয়া ও ক্ষমার ব্যাপারে) অহংকারী না করে (এবং ধোঁকা দিতে না পারে)।” (৩৫:৫)

এই আয়াতে কিয়ামতের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: কিয়ামতের দিনের হিসাব-নিকাশ এবং পূণ্যবান ব্যক্তিদের জন্য জান্নাত ও পাপাচারীদের জন্য জাহান্নামের যে প্রতিশ্রুতি আল্লাহ দিয়েছেন তার সবই অকাট্য সত্য। কাজেই সাবধান! পার্থিব জীবনের চাকচিক্য তোমাদেরকে যেন আখেরাতের কথা ভুলিয়ে না দেয়। সেই সঙ্গে শয়তান যেন আল্লাহর ক্ষমাশীল ও দয়ালু গুণের কথা তুলে ধরে তোমাদেরকে গুণাহর কাজে মগ্ন করে না রাখে। আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন- সেই আশায় তোমরা অহংকারী হয়ে পাপকাজে লিপ্ত থেকো না।

এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. মানুষকে পাপকাজে লিপ্ত করার ক্ষেত্রে শয়তানের অন্যতম কৌশল হচ্ছে তাকে আল্লাহর ক্ষমাশীলতা ও দয়ার প্রতি আশাবাদী করে রাখা। অথচ আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে তওবা করে পাপকাজ থেকে বিরত থাকা। জেনেবুঝে পাপের পথে অটল থাকলে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়া যাবে না।

২. শয়তান কাফেরদেরকে পার্থিব জীবনের চাকচিক্য ও ভোগবিলাসের মাধ্যমে ধোঁকা দেয়। আর মুমিনদের ধোঁকা দেয়ার অপকৌশল হচ্ছে আল্লাহর ক্ষমার ব্যাপারে আশাবাদী করে রাখা। এজন্য এই আয়াতে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।

সূরা ফাতিরের ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا إِنَّمَا يَدْعُو حِزْبَهُ لِيَكُونُوا مِنْ أَصْحَابِ السَّعِيرِ (6)

“নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু; অতএব তাকে শত্রু রূপেই গ্রহণ কর। সে শুধু তার দলবলকে আহবান করে যেন তারা জাহান্নামী হয়।” (৩৫:৬)   

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে মুমিনদেরকে এই মর্মে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, সৃষ্টির শুরু থেকে শয়তান তোমাদের সঙ্গে শত্রুতা করেছে এবং আদমকে সিজদা করতে রাজি হয়নি। আল্লাহর ওই নির্দেশ অমান্য করার কারণে সে ঐশী দরবার থেকে বিতাড়িত হয়েছে। সেদিন থেকে সে এই শপথ করেছে যে, যত বেশি সম্ভব মানুষকে ধোঁকা দিয়ে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। কাজেই তার এই কসম খাওয়া শত্রুতার বিপরীতে তোমরাও তাকে শত্রু  মনে করো এবং তার প্রতারণার ফাঁদে পা দিও না।

আয়াতের পরের অংশে মানুষকে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: তোমাদের অন্তরের ওপর শয়তানের কোনো আধিপত্য নেই এবং সে তোমাদেরকে পাপকাজে বাধ্য করতে পারে না। শয়তান শুধু তাদেরকেই প্রতারিত করতে পারে যারা আগে থেকে শয়তানের দলে ভিড়ে আছে এবং তার অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছে।  এ ধরনের মানুষ শয়তানের অনুগামী হয়ে গেছে বলে এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের মানুষ শয়তানের সঙ্গে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আমরা যেন শত্রুর হাত থেকে শুধুমাত্র আমাদের জান-মাল ও দেশ রক্ষার কাজে ব্যস্ত না থাকি। এগুলো রক্ষা করা অবশ্যই জরুরি কাজ। কিন্তু সেইসঙ্গে আমাদের ঈমান ও আমল রক্ষার গুরুত্ব যেন কোনো অংশে কমে না যায়। একটুখানি অসতর্ক ও অবহেলার কারণে আমরা মারাত্মক পাপ ও বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয়ে যেতে পারি।

২. হিজবুল্লাহ বা মুমিনদের দল থেকে বেরিয়ে গেলে হিজবুশ-শয়তান বা শয়তানের দলে ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একবার শয়তানের সহগামী হলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন এবং এর অবধারিত পরিণতি জাহান্নাম।# 

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম।আশরাফুর রহমান/২৬