এপ্রিল ১৪, ২০১৯ ১৪:১৮ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ৭ থেকে ৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এ সূরার ৭ ও ৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

الَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَالَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ (7)

“যারা কুফরি করে তাদের জন্যে থাকবে কঠোর আযাব। আর যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” (৩৫:৭)

গত আসরে মানুষের সঙ্গে ইবলিস শয়তানের ঘোরতর শত্রুতার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছিল, যারা হিজবুশ-শয়তান বা শয়তানের দলে ভিড়বে তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আর আজকের এ আয়াতে বলা হচ্ছে, কুফরি করলে অর্থাৎ আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করলে মানুষের অন্তরে শয়তানের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দ্বার অবারিত হয়ে যায়। এর পরিণতিতে ওই ব্যক্তিকে জাহান্নামের কঠিন আযাব ভোগ করতে হবে। কিন্তু যদি কেউ সত্যের প্রতি ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে তাহলে শয়তানের প্ররোচনায় সে কিছু ভুলত্রুটি করে ফেললেও আল্লাহ তায়ালা তার গোনাহ মাফ করে দিয়ে তাকে নিজের দয়া ও রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন। 

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর ইবাদত ও সৎকর্মবিহীন ঈমান কোনো কাজে আসবে না এবং এ ধরনের কথিত ঈমানদার আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার লাভ করবে না। তবে জাহান্নামে যাওয়ার জন্য শুধু কুফরি বা সত্য প্রত্যাখ্যানই যথেষ্ট। কারণ, মানুষ যখন ভুল পথ বেছে নেয় তখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বাহনে চড়লেও তার পক্ষে আর কখনোই লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব হয় না।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. জান্নাতপ্রাপ্তি হচ্ছে একজন মানুষের জীবনের চূড়ান্ত সফলতা। কর্মের পরিণতির কথা চিন্তা করে কাজ করলে মানুষের পক্ষে সেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব। মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায় না। কাজেই সেই ব্যক্তি বুদ্ধিমান যে ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবন থেকে পুঁজি সঞ্চয় করে পরকালীন জীবনকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে নেয়।

২. মানুষের গোনাহ মাফ না হওয়া পর্যন্ত তার পক্ষে আল্লাহর পুরস্কার প্রাপ্তি বা জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। কোনো পাপী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। 

এবারে সূরা ফাতিরের ৮ নম্বর আয়াতের দিকে দৃষ্টি দেব। এই আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

أَفَمَنْ زُيِّنَ لَهُ سُوءُ عَمَلِهِ فَرَآَهُ حَسَنًا فَإِنَّ اللَّهَ يُضِلُّ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ فَلَا تَذْهَبْ نَفْسُكَ عَلَيْهِمْ حَسَرَاتٍ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِمَا يَصْنَعُونَ (8)

“যাকে মন্দকর্ম শোভনীয় করে দেখানো হয় ও সে তাকে উত্তম মনে করে, (সে কি তার সমান যে মন্দকে মন্দ মনে করে?) নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথ প্রদর্শন করেন। সুতরাং তাদের জন্যে অনুতাপ করে (ও কষ্ট পেয়ে) আপনার জীবন যেন ধ্বংস হয়ে না যায়। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন।” (৩৫:৮)

আগের আয়াতে মুমিন ও কাফির ব্যক্তির পরিণতির কথা বর্ণনা করার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: সত্যকে অস্বীকার করতে করতে মানুষের অন্তর এতটা কলুষিত হয়ে যায় যে, সে খারাপ কাজকে ভালো বলে মনে করতে থাকে। কোনো ঘটনা ভালো নাকি মন্দ তা যাচাই করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। খারাপ কাজ ও আচরণ তার কাছে শোভনীয় হয়ে যায় বলে সে নিজেকে সংশোধনের প্রয়োজন মনে করে না। এ ধরনের মানুষ নিজের ভুল ও অন্যায় কর্মকে সঠিক মনে করে বলে যতই উপদেশ দেয়া হোক না তা সে গ্রহণ করে না। 

কাফেররা আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকার করে বলে সবকিছুকে নিজেদের প্রবৃত্তি দিয়ে যাচাই করে। প্রবৃত্তি মানুষকে সারাক্ষণ ভোগবিলাস ও ঋপুর চাহিদা মেটাতে উৎসাহিত করে বলে বেশিরভাগ খারাপ কাজকে সে মানুষের জন্য শোভনীয় করে তুলে ধরে। অপরপক্ষে মুমিন ব্যক্তিরা নিজেদের কথা, কাজ ও আচরণকে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী যাচাই করে নেয়। তারা প্রবৃত্তির কামনার কাছে আত্মসমর্পন করে না। 

স্বাভাবিকভাবেই প্রবৃত্তির আনুগত্য করার কারণে মানুষ আল্লাহর হেদায়াত থেকে বঞ্চিত হয় এবং পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু কারো মধ্যে ঈমান থাকলে তার পক্ষে আল্লাহর হেদায়াত প্রাপ্তি সহজ হয়ে যায় এবং সে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে চলতে থাকে। 

আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা বিশ্বনবী (সা.) ও সব মুমিনকে উদ্দেশ করে বলছেন, সত্য বাণী গ্রহণ করা তো দূরে থাক যাদের সত্য শোনারই আগ্রহ নেই তাদের জন্য অনুতাপ ও দুঃখ করার প্রয়োজন নেই। এতে করে তোমাদের জীবন চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে কিন্তু তারা ঈমান আনবে না। তাদের ফয়সালা আল্লাহ তায়ালার হাতে ছেড়ে দিতে হবে। মহান আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম ও অন্তরের সবকিছু সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আমাদের প্রিয়নবী (সা.) হেদায়েতের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি বরং কেউ সত্যবাণী গ্রহণ না করলে তিনি অন্তরে খুব কষ্ট পেতেন। তবে এ আয়াতের অর্থ কিন্তু এটাও নয় যে, কেউ ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করলে আমরা ব্যথিত হবো না।  বরং এ আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে- এই দুঃখ যেন মানুষকে হেদায়েতের আহ্বান জানানোর ব্যাপারে আমাদেরকে নিরুৎসাহিত না করে। আমরা যেন এই ভেবে হতাশ হয়ে না পড়ি যে, আমাদের আহ্বানে কাজ হচ্ছে না। বরং যারা সত্য গ্রহণে প্রস্তুত তাদের সামনে আমাদেরকে দাওয়াতে বাণী পৌঁছে দেয়া অব্যাহত রাখতে হবে। 

এ আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে: 

১. মানুষের প্রবৃত্তির একটি বড় বিপদ হচ্ছে সে সব ধরনের মন্দকর্মকে শোভনীয় করে তুলে ধরে এবং প্রতিটি খারাপ কাজেরই ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। অন্য কথায়, গোনাহর কাজ করার আগে মানুষ নিজের জন্য একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে তারপর সে কাজ করতে উদ্যত হয়।

২. আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ভালো ও খারাপের পার্থক্য করতে হবে; অন্তরের প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী নয়।

৩. গোনাহর কাজ মানুষকে পথভ্রষ্টতার দিকে ধাবিত করে। কাজেই এই গোমরাহি ও পথভ্রষ্টতার জন্য মানুষ নিজেই দায়ী। 

৪. মানুষ ভ্রান্ত পথ ছেড়ে সঠিক পথে আসতে না চাইলে সেজন্য কষ্ট পেতে দোষ নেই। তবে সেই কষ্ট যেন আমাদেরকে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে না দেয়।#