এপ্রিল ২৩, ২০১৯ ১২:৪৩ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ৯ থেকে ১১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এ সূরার ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَاللَّهُ الَّذِي أَرْسَلَ الرِّيَاحَ فَتُثِيرُ سَحَابًا فَسُقْنَاهُ إِلَى بَلَدٍ مَيِّتٍ فَأَحْيَيْنَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا كَذَلِكَ النُّشُورُ (9)

“আল্লাহই বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর সে বায়ু মেঘমালা সঞ্চারিত করে। অতঃপর আমি তা মৃত ভূখন্ডের দিকে পরিচালিত করি এবং তা দ্বারা সে ভূখন্ডকে তার মৃত্যুর পর জীবিত করে দেই। এমনিভাবেই হবে (তোমাদের) পুনরুত্থান।” (৩৫:৯)

গত আসরে আমরা কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফির ব্যক্তিদের পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আর আজকের এ আয়াতে তাদের উদ্দেশ করে কথা বলা হয়েছে যারা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার অবধারিত বিষয়টিকে অসম্ভব মনে করে। আল্লাহ তায়ালা বলছেন, এই পার্থিব জীবনে তোমরা প্রতি বছর শীতকাল আসলে গাছপালা ও ফসলের জমিকে মরে যেতে দেখ এবং এরপর বসন্তে সেই মৃতপ্রায় গাছে পাতা গজায় এবং তারপর বর্ষাকালে মৃত ভূমি জীবিত হয়ে ওঠে।  কিয়ামতের দিন তোমরা মানবজাতি এভাবেই আবার জীবিত হবে।

এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. সাগর ও মহাসাগর থেকে পুঞ্জিভূত মেঘমালা তৈরি, সেই মেঘ বাতাসের মাধ্যমে শুষ্ক ভূখণ্ডের দিকে প্রবাহিত করা এবং বৃষ্টিপাত ঘটানোর মতো প্রাকৃতিক ঘটনাবলী মোটেই দৈব কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা যার একমাত্র পরিচালক হচ্ছেন বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন।

২. আল্লাহ তায়ালা এই প্রাকৃতিক ঘটনার উপমা দিয়ে অত্যন্ত সহজভাবে কিয়ামতের সত্যতার প্রমাণ তুলে ধরেছেন। এরপরও যারা এ সত্য উপলব্ধি করবে না তারা অত্যন্ত দুর্ভাগা।

সূরা ফাতিরের ১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ وَالَّذِينَ يَمْكُرُونَ السَّيِّئَاتِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَكْرُ أُولَئِكَ هُوَ يَبُورُ (10)

“কেউ সম্মান চাইলে জেনে রাখুন, সমস্ত সম্মান আল্লাহরই কাছে রয়েছে। (শুধুমাত্র) পবিত্র বাক্য তাঁর দিকে আরোহণ করে এবং সৎকর্ম তাকে তুলে নেয়।  আর যারা মন্দ কার্যের চক্রান্তে লিপ্ত থাকে, তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হবে।” (৩৫:১০)

দুনিয়াদার ব্যক্তিরা মনে করে, অর্থ-সম্পদ কিংবা ক্ষমতার মাধ্যমে সম্মান অর্জন করা সম্ভব এবং এজন্য তারা সম্পদ বা ক্ষমতা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনের কাজে তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা নিয়োগ করে। কিন্তু পবিত্র কুরআন ঘোষণা করছে, প্রকৃত সম্মান রয়েছে আল্লাহর হাতে এবং তা অর্জনের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করার পাশাপাশি তাঁর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতে হবে। প্রকৃত সম্মান তখনই অর্জন করা সম্ভব যখন একজন মানুষকে অন্য কারো ওপর কোনো কারণেই নির্ভর করতে না হয়। মহাপরাক্রমশালী সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ছাড়া এই যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব নয়।

আয়াতের পরবর্তী অংশে সম্মান অর্জনের জন্য খাঁটি ঈমান ও সৎকাজ করার কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: যে জিনিস ঊর্ধ্বমুখী হয় বা মানুষকে ঊর্ধ্বমুখী করে তা হচ্ছে ঈমান ও সৎকাজ; অন্য কিছু নয়। কেউ কেউ মনে করে, ছলচাতুরি, প্রবঞ্চনা ও প্রতারণার মাধ্যমে তারা সম্মান অর্জন করতে পারবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলছেন, এ ধরনের পাপকাজে লিপ্ত হয়ে ক্ষণিকের জন্য সম্মান অর্জন করা সম্ভব হলেও এক সময় তাদের এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে এবং তারা চরম অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হবে। আর পরকালে এ ধরনের মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. প্রকৃত সম্মান আল্লাহর কাছে রয়েছে, মানুষের কাছে নয়। আজ যাদেরকে সম্মানিত হতে দেখা যায় আগামীকাল তাদের অনেককে অপমানিত হতে হবে। আজকের বাদশাহ কালকের ফকির। কিন্তু একজন মুমিন চরম কষ্ট ও সংকটের মধ্যেও সম্মানিত জীবন যাপন করেন, কারণ তিনি নির্ভর করেছেন সম্মানের একচ্ছত্র মালিক আল্লাহর ওপর।

২. ঈমান ও সৎকাজের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তারা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এর একটি দুর্বল বা সবল হলে অন্যটিও দুর্বল বা সবল হয়।

এবং

৩. প্রতারণা ও ধূর্তামির মাধ্যমে কেউ স্থায়ী সম্মান অর্জন করতে পারে না।

সূরা ফাতিরের ১১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ جَعَلَكُمْ أَزْوَاجًا وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنْثَى وَلَا تَضَعُ إِلَّا بِعِلْمِهِ وَمَا يُعَمَّرُ مِنْ مُعَمَّرٍ وَلَا يُنْقَصُ مِنْ عُمُرِهِ إِلَّا فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ (11)

“আল্লাহ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন প্রথমে মাটি থেকে, অতঃপর বীর্য থেকে, তারপর তোমাদেরকে করেছেন যুগল। তাঁর জ্ঞাতসারে ছাড়া কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং সন্তান প্রসব করে না। (আল্লাহর জ্ঞানের) কিতাবে লিখিত বিধান ছাড়া কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ আয়ু পায় না অথবা তার বয়স হ্রাস পায় না।  নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।” (৩৫:১১)

কিয়ামতকে অস্বীকারকারী ব্যক্তিরা তাদের বক্তব্যের পক্ষে শক্ত কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারে না। তারা বরং উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে বিষয়টি নিয়ে সংশয় সৃষ্টি করতে চায়। তাদের এমন প্রশ্নের জবাবে এই আয়াতে বলা হচ্ছে: যিনি তোমাদেরকে একবার সামান্য মাটি থেকে সৃষ্টি করতে পেরেছেন তিনি কি কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে আরেকবার সৃষ্টি করতে পারবেন না? নারীর গর্ভে বীর্য নিক্ষেপ থেকে শুরু করে গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসব পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায় সম্পর্কে যার পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান রয়েছে এবং এই পর্যায়গুলো যিনি নির্ধারণ করে দিয়েছেন কিয়ামতের দিন কি তিনি অক্ষম হয়ে পড়বেন? মোটেই নয়। তাছাড়া, জন্মের পরেও তোমরা দীর্ঘজীবন লাভ করা কিংবা অল্প বয়সেই মৃত্যুবরণ করার বিষয়টিও আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাতেই হয়। এসব বিষয় আগে থেকে আল্লাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়ে রয়েছে। কাজেই পুনর্বার তোমাদের সৃষ্টি করার ব্যাপারে মনে বিন্দুমাত্র সংশয় রেখো না।      

এ আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. মানুষ সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করলে আমরা আল্লাহর অসীম ক্ষমতা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারব। এর ফলে আমাদের মধ্যে আল্লাহর প্রতি উদাসিনতা সৃষ্টি হবে না এবং গর্ব ও অহংকারও আমাদেরকে পেয়ে বসবে না।

২. হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে কেয়ামত পর্যন্ত সব মানুষ মাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছে এবং আবার তাদেরকে মাটিতে ফিরে যেতে হবে।

এবং

৩. আমাদের আয়ুষ্কাল আল্লাহর হাতে রয়েছে। তিনি নিজ প্রজ্ঞা অনুযায়ী আমাদের আয়ু বাড়িয়ে দেন কিংবা কমান।#