সূরা ফাতির: আয়াত ১২-১৩ (পর্ব-৫)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ১২ থেকে ১৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এ সূরার ১২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا يَسْتَوِي الْبَحْرَانِ هَذَا عَذْبٌ فُرَاتٌ سَائِغٌ شَرَابُهُ وَهَذَا مِلْحٌ أُجَاجٌ وَمِنْ كُلٍّ تَأْكُلُونَ لَحْمًا طَرِيًّا وَتَسْتَخْرِجُونَ حِلْيَةً تَلْبَسُونَهَا وَتَرَى الْفُلْكَ فِيهِ مَوَاخِرَ لِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (12)
“দু’টি সমুদ্র সমান নয়-একটির পানি মিঠা, কোমল (ও) তৃষ্ণানিবারক এবং অপরটি লোনা ও তিক্ত। কিন্তু তোমরা উভয়টি থেকেই তাজা গোশত আহার কর এবং পরিধানে ব্যবহার্য গয়নাগাটি আহরণ কর। তুমি তাতে তার ঢেউ চিরে জাহাজ চলতে দেখ, যাতে তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ উপভোগ কর এবং (এভাবেই) হয়ত তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।” (৩৫:১২)
এর আগের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি এবং তার কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোকপাত করেছিলেন। আর আজকের এ আয়াতে প্রকৃতিতে মহান আল্লাহর একটি নির্দশনের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: বিশ্বে যত সাগর-মহাসাগর আছে তা দুই ধরনের হয়। এগুলোর কোনোটির পানি মিঠা এবং কোনোটির পানি লোনা। কিন্তু দুই ধরনের সাগরেই মানুষের জন্য খাদ্য ও অলঙ্কার রেখে দিয়েছেন আল্লাহ। সাগরের পানিতে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির মাছ যেগুলোর উৎপাদন ও বংশ বিস্তারের জন্য মানুষ কোনো ধরনের পরিশ্রম করেনি। তারা শুধু এগুলো শিকার করে ভক্ষণ করছে। এসব মাছ শুধু সাগর উপকূলবর্তী লোকজনই খায় না বরং বিশেষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব মাছ চলে যায় দূরদূরান্তে বসবাসরত সব মানুষের কাছে। খাদ্যের পাশাপাশি সাগরে রয়েছে নানা রকমের ঝিনুক ও মনি-মুক্তা। দামী এসব পাথর নারীদের অলঙ্কারে ব্যবহৃত হয় যা বিনামূল্যে আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য সাগরে ছড়িয়ে রেখেছেন।
একইসঙ্গে সাগরের পানিতে রয়েছে জাহাজ চলাচলের উন্মুক্ত পথ। এই সমূদ্রপথ তৈরি করার জন্য মানুষকে কোনো খরচ করতে হয়নি। তারা শুধু সাগরের বুক চিরে জাহাজ চালিয়ে একস্থান থেকে আরেক স্থানে মানুষ ও পণ্য পরিবহন করছে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. সাগর হচ্ছে খাদ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস যা আল্লাহ তায়ালা বিনামূল্যে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেছেন।
২. মানুষের জীবনও সাগরের পানির মতো কখনো মিষ্টি-মধুর আবার কখনো টক বা তিক্ত। মানুষ যদি তার জীবনের জন্য উপযুক্ত ক্যাপ্টেন ও ভালো শিকারি হয় তাহলে সে সব পরিস্থিতিতে জীবনকে উপভোগ করতে এবং সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।
৩. ইসলামে অলঙ্কার দিয়ে সাজসজ্জা করতে নিষেধ করা হয়নি বরং এই আয়াতে তার পরোক্ষ অনুমোদন রয়েছে।
সূরা ফাতিরের ১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
يُولِجُ اللَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَيُولِجُ النَّهَارَ فِي اللَّيْلِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُسَمًّى ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِنْ قِطْمِيرٍ (13)
“তিনি রাত্রিকে দিবসে এবং দিবসকে রাত্রিতে প্রবিষ্ট করেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিয়োজিত করেছেন। প্রত্যেকটি আবর্তন করে এক নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত। ইনি আল্লাহ; তোমাদের পালনকর্তা, বিশ্বের সাম্রাজ্য (ও শাসন) তাঁরই হাতে রয়েছে। তাঁর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা তুচ্ছ খেজুর আঁটির ছালেরও মালিক নয়।” (৩৫:১৩)
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালার আরেকটি প্রাকৃতিক নিদর্শন বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে: নিজ অক্ষের ওপর এবং সূর্যের চারদিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৃথিবীর ঘুর্নয়নের ফলে দিন, রাত এবং মাস ও বছর তৈরি হয়। এই দিবস ও রাত্রি সৃষ্টি হয় আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ নির্দেশের ফলে। বছরের বিভিন্ন ঋতুতে এই দিন ও রাতের দৈর্ঘ্যে তারতম্য ঘটে। শীতকালে দিন ছোট এবং রাত বড় হয়। গ্রীষ্মকালে তার উল্টোটা ঘটে। দিন ও রাতের আবর্তনকে এখানে দিনের মধ্যে রাতের প্রবেশ এবং রাতের মধ্যে দিনের প্রবেশ বলে উল্লেখ করেছেন আল্লাহ তায়ালা। কারণ, দিন কিংবা রাত কোনোটিই হঠাৎ করে আসে না। দিন শেষে আস্তে আস্তে রাতের আঁধার নেমে আসে এবং রাত শেষে ধীরে ধীরে দিনের আলো ফুটে ওঠে।
আয়াতের পরবর্তী অংশে দিন ও রাত সৃষ্টির কারণ হিসেবে চন্দ্র ও সূর্যকে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে। আল্লাহকে ভুলে গিয়ে একসময় সূর্যের বিশালতায় মুগ্ধ হয়ে মানুষ সূর্যের উপাসনা করত। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলছেন, এই সূর্য তাঁরই নির্দেশে মানুষের সেবায় নিয়োজত রয়েছে। সূর্যের আলোয় পৃথিবী আলোকিত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি এই সূর্যালোকের মাধ্যমে পৃথিবীতে পৌঁছায়।
দিনের শেষে রাতের বেলায় চন্দ্র একটি বিশাল আয়না হয়ে সূর্যের আলোর প্রতিচ্ছবি পৃথিবীবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়। এই চন্দ্র রাতকে ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে এবং সাগর কিংবা স্থলপথের পথিকদের পথ চলতে সাহায্য করে।
তবে মানুষ যেন একথা না ভাবে যে, এই পৃথিবী, চন্দ্র ও সূর্য চিরকাল স্থায়ী হবে। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, এসব বস্তু একটি নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তাঁর আদেশে ঘুরতে থাকবে। সেই মেয়াদ আল্লাহ ছাড়া আর কারো জানা নেই। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে।
আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে: ঈমানদার মানুষ সেই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে ও তাঁর ইবাদত করে যিনি সৃষ্টিজগতের সবকিছুর নিয়ন্তা। তিনি যেমন সবকিছু সৃষ্টি করেছেন তেমনি এসব সৃষ্টি একমাত্র তাঁরই আজ্ঞাবহ। কিন্তু কাফের ও মুশরিকরা এই মহাসত্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়ে উপাসনার জন্য অন্য কিছুকে বেছে নিয়েছে। কিন্তু আল্লাহ বলছেন, তাঁকে ছাড়া কাফেররা যাদের আনুগত্য করে এই সৃষ্টিজগতের ওপর তাদের বিন্দু পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব নেই।
সংক্ষেপে এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১. গোটা বিশ্বজগত পরিচালিত হচ্ছে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী। তাঁর ইচ্ছার বাইরে প্রকৃতির কোনো কর্ম সম্পাদিত হয় না।
২. দিনের পরে রাতের আগমন এবং বছরের বিভিন্ন সময় দিন ও রাতের সময়ের পার্থক্য কোনো দৈব ঘটনা নয়। আল্লাহ তায়ালার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার আওতায় এসব প্রাকৃতিক ঘটনা সম্পাদিত হয়।
৩. এই গোটা বিশ্বজগত সুদীর্ঘকাল ধরে নির্দিষ্ট নিয়মে আবর্তিত হয়ে আসলেও এর একটি নির্ধারিত মেয়াদ রয়েছে। মেয়াদ শেষে সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আবার আল্লাহর আদেশে সেগুলোর পুনরাবির্ভাব ঘটবে।
৪. আমাদের এমন আল্লাহর ইবাদত করা উচিত যিনি সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। এমন কাউকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয় যে তার নিজেরই নিয়ন্ত্রণকারী নয়।#