সূরা ফাতির: আয়াত ১৪-১৭ (পর্ব-৬)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ১৪ থেকে ১৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এ সূরার ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
إِنْ تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ (14)
“তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শোনে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না। কেয়ামতের দিন তারা তোমাদের শিরক অস্বীকার করবে। বস্তুতঃ মহাজ্ঞানী (আল্লাহর) ন্যায় তোমাকে কেউ (ঘটনাবলী সম্পর্কে) অবহিত করতে পারবে না।” (৩৫:১৪)
এর আগের আয়াতে বলা হয়েছে, মুশরিকরা যাদেরকে ডাকে এবং যাদের ইবাদত করে তাদের কোনো ক্ষমতা নেই; এমনকি তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণও রয়েছে আল্লাহ তায়ালার হাতে। এরপর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: মুশরিকরা যাদেরকে ডাকে তাদের যেমন ডাক শোনার ক্ষমতা নেই তেমনি সে ডাকে সাড়া দেয়ারও ক্ষমতা নেই। মাটি, কাঠ ও পাথরের তৈরি মূর্তির কান, বাগযন্ত্র কিংবা উপলব্ধি ক্ষমতা নেই। মানুষের হাতে নির্মিত এসব উপাস্য যেমন পার্থিব জীবনে মানুষের কোনো উপকার করতে পারে না তেমনি কিয়ামতের দিনও তাদের কোনো কাজে আসবে না। কিয়ামতের দিন বরং এসব উপাস্য আল্লাহর আদেশে কথা বলা শুরু করবে এবং যারা তাদের উপাসনা করত তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।
তারা বলবে, তোমরা মুশরিকরা প্রকৃতপক্ষে আমাদের উপাসনা করতে না বরং তোমরা তোমাদের খেয়াল-খুশিরই পূজা করতে। তোমরা আমাদের সামনে এসে মাথা নত করতে ঠিকই কিন্তু তোমাদের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের মনের বাসনা ও ভোগ-বিলাসকে চরিতার্থ করা।
আয়াতের শেষাংশে বলা হচ্ছে: কিয়ামতের দিন যে এই ঘটনাটি ঘটবে সে খবর একমাত্র মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তায়ালা জানেন। মানুষ যাতে এই ঘটনা জানার পর শিরক ও পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচতে পারে সেজন্য তিনি তাঁর কিতাব আল-কুরআনের মাধ্যমে তা মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. ইন্দ্রিয়পূজা মানুষকে এতটা নীচে নামিয়ে দেয় যে, সে জড় পদার্থ দিয়ে তৈরি করা মূর্তির উপাসনা করে। অথচ যে মহাশক্তিমান আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করে সমস্ত নেয়ামতের মধ্যে রেখে দিয়েছেন তার কথা ভুলে যায়।
২. শিরক যেমন পার্থিব জীবনে মানুষের কোনো উপকারে আসে না, তেমনি কিয়ামতের দিনও তাদের কোনো কাজে আসবে না।
৩. আল্লাহ ছাড়া আর যে বস্তু বা ব্যক্তিরই উপাসনা মানুষ করুক না কেন কিয়ামতের দিন সে বস্তু ও ব্যক্তিরা তাদের উপাসনাকারীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।
৪. আসমানি কিতাবে বর্ণিত আয়াত ছাড়া কিয়ামতের ঘটনাবলী অন্য কোনো স্থান থেকে জানা সম্ভব নয়।
এবারে সূরা ফাতিরের ১৫ থেকে ১৭ নম্বর পর্যন্ত আয়াতের দিকে দৃষ্টি দেব। এই তিন আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ (15) إِنْ يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ (16) وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزٍ (17)
“হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী। আর আল্লাহ; তিনি অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।” (৩৫:১৫)
“তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে বিলুপ্ত করে এক নতুন সৃষ্টির উদ্ভব করবেন।” (৩৫:১৬)
“এবং এ কাজ আল্লাহর পক্ষে কঠিন নয়।” (৩৫:১৭)
আগের আয়াতগুলোতে আল্লাহর একত্ববাদ ও একমাত্র তাঁর ইবাদত করার আহ্বান জানানোর পর এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: তোমরা ভেবো না যে, তোমাদের ইবাদত আল্লাহর কোনো কাজে আসবে। বরং, তিনি সর্বাবস্থায় অভাবমুক্ত কিন্তু তোমরা প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর মুখাপেক্ষী। যখন তোমরা ছিলে না তখনও আল্লাহ ছিলেন এবং যখন তোমরা থাকবে না তখনও তিনি থাকবেন। তোমাদের ইবাদত তো দূরের কথা তোমাদের অস্তিত্বেরই কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। যদি তিনি নামাজের আদেশ দিয়ে থাকেন তা দিয়েছেন এজন্য যে, নামাজের মাধ্যমে তোমাদের তাঁর কাছে নিজেদের প্রয়োজন বর্ণনা করে তা তাঁর কাছে চাইতে পারো। এমন কারো কাছে চাইতে যেও না যাদের পক্ষে কিছু দেয়া সম্ভব নয়।
উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীকে বাড়ির কাজ করে আনতে বলেন তখন এর অর্থ এই নয় যে, এই বাড়ির কাজ শিক্ষকের প্রয়োজন। বরং তিনি চান শিক্ষার্থী কিছু শিখে নিজের জ্ঞান বৃদ্ধি করুক। মহান আল্লাহও সেরকম আমাদের ভালোবাসেন বলে আমাদের আত্মিক সমৃদ্ধির জন্য তিনি নামাজের ব্যবস্থা রেখেছেন। আল্লাহ চান আমরা যেন পার্থিব জীবনের ঘূর্ণাবর্তে আটকে না গিয়ে আত্মিক দিক দিয়ে উন্নতি সাধন করি। সেজন্য তিনি নামাজসহ অন্যান্য ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশ প্রদানের মাধ্যমে তিনি বরং আমাদের প্রতি দয়া করেছেন।
আমাদের অস্তিত্ব সৃষ্টির পাশাপাশি পৃথিবীর বুকে টিকে থাকার জন্য পদে পদে আমরা আল্লাহ তায়ালার মুখাপেক্ষী। কাজেই প্রকৃতিগতভাবে আমরা নিঃস্ব ও অসহায় এবং আল্লাহ সব ধরনের প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে। তিনি সম্পূর্ণ স্বনির্ভরশীল এবং আমাদের নির্ভরতা পুরোপুরি তাঁর ওপর। একমাত্র তিনিই প্রশংসা ও ইবাদতের যোগ্য। কাজেই ইবাদতের মাধ্যমে আমরা তাঁকে কিছু দিতে পারি না উল্টো ইবাদতের মাধ্যমে আমরাই তাঁর নূরের আলোয় উদ্ভাসিত হতে পারি।
কেউ যদি সূর্যের দিকে পেছন ফিরিয়ে ঘর তৈরি করে তাহলে সে সূর্যের কোনো ক্ষতি করতে পারে না বরং এর ফলে সে নিজেই সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত হয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি জানালা খুলে দিয়ে ঘরে সূর্যের আলো প্রবেশ করায় সে এই আলোর সুবিধা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। এতে করে সূর্যের কোনো উপকার হয় না।
পরের আয়াতে আল্লাহর স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং মানুষের মুখাপেক্ষিতার আরেকটি কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলে অন্য কোনো সৃষ্টিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন। এ কাজ তাঁর জন্য মোটেই কঠিন নয়।
এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- আল্লাহ তায়ালা তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ দেয়ার মাধ্যমে আমাদেরকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী সত্ত্বার কাছে আশ্রয় নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।
২- মানুষ যদি নিজেকে স্বনির্ভর মনে করে তখনই সে আল্লাহর সামনে আত্মম্ভরিতা দেখায়। এ কারণে পবিত্র কুরআন মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে সে পুরোপুরি আল্লাহর মুখাপেক্ষী।
৩- মানুষের মধ্যে যারা ধনিক শ্রেণির তারা পরস্পরকে হিংসা করে এবং প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এ কারণে তারা একে অপরের চক্ষুশূল। পক্ষান্তরে প্রকৃত ধনবান আল্লাহ তাঁর সব ধনকে মানব সেবায় নিয়োজিত করেছেন। কাজেই তিনিই একমাত্র প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।
৪- আমাদেরকে সব সময় মনে রাখতে হবে, আমাদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার অপার ও অসীম ক্ষমতা রয়েছে এবং তাঁর কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। সঠিক উপায়ে ইবাদত করে আল্লাহর কাছ থেকে প্রয়োজনগুলো চেয়ে নিতে হবে মাত্র।#