মে ২১, ২০১৯ ১৫:১৪ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ২২ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এ সূরার ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 وَمَا يَسْتَوِي الْأَحْيَاءُ وَلَا الْأَمْوَاتُ إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَنْ يَشَاءُ وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَنْ فِي الْقُبُورِ (22) إِنْ أَنْتَ إِلَّا نَذِيرٌ (23)

“আর জীবিত ও মৃত ব্যক্তিরা কখনো সমান নয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শ্রবণ করান।  যারা কবরে শায়িত আপনি তাদেরকে শোনাতে সক্ষম হবেন না।” (৩৫:২২)

“আপনি একজন সতর্ককারী ছাড়া আর কিছু নন।” (৩৫:২৩)

আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় এই দুই আয়াতে কাফিরদেরকে মৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে এবং মুমিনদেরকে জীবিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, কাফিরদের অন্তর মৃতদের মতো হয়ে গেছে। ফলে তারা যেমন দেখতে পায় না তেমনি শুনতেও পায় না। কুফর মানুষের চারপাশে একটি আবরণ ফেলে দেয় যার ফলে তার পক্ষে সত্য দেখা বা শোনা সম্ভব হয় না। প্রকৃতপক্ষে তারাই আল্লাহর বাণী গভীর মনযোগের সঙ্গে শোনে যাদের অন্তর সত্য গ্রহণের জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছে। কিন্তু অন্তর যদি সত্য গ্রহণে প্রস্তুত না থাকে তাহলে কানও আল্লাহর বাণী শুনতে রাজি হবে না। এটির উদাহরণ হচ্ছে সেই সময়ের মতো যখন আপনি বই পড়ছেন কিন্তু একইসঙ্গে টেলিভিশন চলছে। যদি আপনি টিভি উপস্থাপকের কথায় মনযোগ না দেন তাহলে তার প্রতিটি কথা আপনার কানে পৌঁছার পরও আপনি তার কথা কিছুই বুঝবেন না। কারণ, আপনি তার কথা শোনার ইচ্ছা করেননি বরং আপনার মনযোগ বইয়ের মধ্যে রয়েছে। কাফেরদের কানেও তেমনি সত্যের বাণী পৌঁছায়; কিন্তু যেহেতু এ কথা শোনার ইচ্ছা তাদের নেই তাই তারা তা শোনে না এবং উপলব্ধিও করতে পারে না।

আয়াতের পরবর্তী অংশে রাসূলুল্লাহ (সা.)কে উদ্দেশ করে আল্লাহ বলছেন: আপনার দায়িত্ব মানুষকে সতর্ক করে দেয়া। যাদের কান আছে তারা এ সতর্কবাণী শুনবে। কিন্তু মৃত ব্যক্তিদের মতো যারা অন্ধ ও বধির তাদের কানে এ সতর্কবাণী পৌঁছাবে না। আপনার বক্তব্য যত বেশি সমধুর ও যুক্তিপূর্ণই হোক না কেন কোনো ব্যক্তি যদি তা শোনা ও বোঝার চেষ্টা না করে তাহলে এ বাণী তার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ঈমান মানুষের অন্তরে প্রাণসঞ্চার করে এবং ব্যক্তি ও সমাজকে প্রাণবন্ত করে তোলে। অন্যদিকে কুফ্‌র ব্যক্তির পাশাপাশি সমাজকে মৃতপ্রায় বানিয়ে দেয়।

২. দ্বীন প্রচার ও মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করা একটি জরুরি বিষয়। কিন্তু মানুষের মধ্যে যদি সত্য গ্রহণের প্রস্তুতি না থাকে তাহলে এ বাণী তাদের অন্তরে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

সূরা ফাতিরের ২৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَإِنْ مِنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ (24)  

“নিশ্চয় আমি আপনাকে সত্যধর্মসহ পাঠিয়েছি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। এমন কোন সম্প্রদায় নেই যাদের মধ্যে কোনো সতর্ককারী আসেনি।”(৩৫:২৪)

আগের আয়াতগুলোতে মুমিন ও কাফিরদের ব্যাপারে আলোকপাত করার পর এই আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)-এর রিসালাতের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে পাওয়া সহাসত্যের ভিত্তিতে পুণ্যবানদের জন্য সুসংবাদ এবং পাপী ব্যক্তিদেরকে সতর্ক করা ছিল যুগে যুগে সব নবী-রাসূলের দায়িত্ব। তাঁরা সঠিক পথ প্রদর্শন করার পর পার্থিব জীবন ও পরকালে মানুষের কৃতকর্মের পুরস্কার ও শাস্তির বিধান সবাইকে জানিয়ে দেন। মানুষকে সৎকাজে উৎসাহিত করা এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখা ছিল এ মহান কাজের উদ্দেশ্য।

বিশ্বনবী (সা.) যাদের মাঝে দ্বীন প্রচার করেছেন তাদের মধ্যে বহু উগ্র, গোঁয়ার ও আত্মম্ভরী ব্যক্তি ছিল বলে আগের আয়াতে এবং এই আয়াতের পরবর্তী অংশে নবী-রাসূলদের সতর্ক করার পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে: মহান আল্লাহ মানুষকে খারাপ কাজ ও ভ্রান্ত পথ পরিহার করার জন্য সব সময় সব জাতির মধ্যে সতর্ককারী নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। এসব নবী রাসূল মানুষকে ভালো কাজের পুরস্কার ও খারাপ কাজের ভয়াবহ পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১.  উৎসাহ ও ভর্ৎসনা এবং আশা ও ভয় পরস্পরের সঙ্গে থাকলেই কার্যকর হয়। এর যেকোনো একটি অন্যটি ছাড়া অর্থহীন। শুধুমাত্র ভয় দেখালে কিংবা শুধুমাত্র পুরস্কারের কথা বললে মানুষকে সঠিক পথে হেদায়েতের কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

২. যে সমাজের সব মানুষ ধর্ম থেকে দূরে গিয়ে পাপাচারে লিপ্ত রয়েছে সে সমাজকে শুধু পুরস্কারের বাণী শোনালে হবে না বরং তাদেরকে পরকালে কঠিন শাস্তির ভয় দেখাতে হবে।

সূরা ফাতিরের ২৫ ও ২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  وَإِنْ يُكَذِّبُوكَ فَقَدْ كَذَّبَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ وَبِالزُّبُرِ وَبِالْكِتَابِ الْمُنِيرِ (25) ثُمَّ أَخَذْتُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَكَيْفَ كَانَ نَكِيرِ (26)

“তারা যদি আপনার প্রতি মিথ্যারোপ করে থাকে, তবে তাদের পূর্ববর্তীরাও (তাদের নবীদের প্রতি) মিথ্যারোপ করেছিল। তাদের কাছে তাদের রাসূলগণ স্পষ্ট নিদর্শন, সহীফা এবং ব্যাখ্যাকারী কিতাবসহ এসেছিলেন।” (৩৫:২৫)

“অতঃপর আমি কাফেরদেরকে (তাদের কৃতকর্মের দায়ে) পাকড়াও করেছিলাম। সুতরাং কেমন ছিল আমার আযাব!” (৩৫:২৬)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: মক্কার মুশরিকরা যদি আপনার দাওয়াতের বাণী প্রত্যাখ্যান করে থাকে তাহলে আপনি উদ্বিগ্ন বা আশ্চর্য হবেন না। কারণ, যুগে যুগে বহু মানুষ মূর্খতা ও গোঁড়ামির কারণে তাদের নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। অথচ সেসব নবী-রাসূলের কাছে যেমন মুজিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা ছিল তেমনি তারা সুস্পষ্ট যুক্তি ও দলিলসহ তাদের বক্তব্য পেশ করেছিলেন।  কোনো কোনো নবীর কাছে আবার আসমানি কিতাবও ছিল এবং তারা শরিয়তের বিধান নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা মানুষের সামনে ঐশী শিক্ষা ও বিধিবিধান বর্ণনা করেছেন। কিন্তু যারা অন্ধত্ব ও গোঁড়ামির কারণে নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করেছে তাদেরকে এই দুনিয়াতেই পাকড়াও করা হয়েছে এবং তাদের প্রতি ঐশী শাস্তি পাঠানো হয়েছে যাতে তাদের পরিণতি দেখে পরবর্তী যুগের মানুষরা শিক্ষা নিতে পারে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. নবী-রাসূলগণ সুস্পষ্ট বক্তব্য নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন এবং অকাট্য যুক্তি ও দলিল দিয়ে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছেন। তাঁরা মনগড়া কোনো কথা বলেননি।

২. মহাসত্য উপলব্ধি করার পরও তা প্রত্যাখ্যান করলে আল্লাহ তায়ালার ক্রোধের শিকার হতে হয়। যে ব্যক্তি জেনেবুঝে সত্য প্রত্যাখ্যান করে এক সময় তার উপলব্ধি ক্ষমতা আল্লাহ কেড়ে নেন।

৩. আল্লাহ যে শুধু পরকালেই শাস্তি দেবেন তা নয়। কখনো কখনো তিনি এই পার্থিব জীবনেই মানুষকে শাস্তি দিয়ে থাকেন। #