সূরা ফাতির: আয়াত ২৭-৩০ (পর্ব-৯)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ২৭ থেকে ৩০ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এই সূরার ২৭ ও ২৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ أَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجْنَا بِهِ ثَمَرَاتٍ مُخْتَلِفًا أَلْوَانُهَا وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌ بِيضٌ وَحُمْرٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيبُ سُودٌ (27) وَمِنَ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالْأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ (28)
“তুমি কি দেখনি আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টিবর্ষণ করেন, অতঃপর তদ্দ্বারা আমি বিভিন্ন বর্ণের ফল-মূল সৃষ্টি করি। পর্বতসমূহের মধ্যে (সৃষ্টি করি) বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথ- সাদা, লাল ও নিকষ কালো।” (৩৫:২৭)
“অনুরূপভাবে (আমি সৃষ্টি করেছি) বিভিন্ন বর্ণের মানুষ, জন্তু ও চতুস্পদ প্রাণী। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাময়।” (৩৫:২৮)
এই দুই আয়াতে আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতা বর্ণনার পাশাপাশি তাঁর একত্ববাদের প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে: বিভিন্ন ধরনের জড় পদার্থ, উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষকে বিভিন্ন বর্ণ দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। বর্ণের এই প্রকারভেদ আল্লাহর সৃষ্টিজগতকে সুষমামণ্ডিত করেছে। পৃথিবীর বিখ্যাত চিত্রশিল্পীরা প্রাকৃতিক দৃশ্য অঙ্কন করেই খ্যাতিলাভ করেছেন এবং তাদের প্রচেষ্টা ছিল একটাই- এমনভাবে চিত্র আঁকবেন যাতে প্রকৃতির সঙ্গে তার চিত্রটির পার্থক্য করা না যায়। যেসব চিত্রশিল্পী মানুষের মুখায়ব আঁকেন তাদের চেষ্টা থাকে এমনভাবে মুখচ্ছবি আঁকবেন যেন তার চিত্রকর্মটিকে ক্যামেরায় তোলা ছবি মনে হয়। অন্য কথায়, আল্লাহ তায়ালা মানুষ ও প্রকৃতিকে এতটা সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন যে, মানুষ তুলির সাহায্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েও তার হুবহু চিত্রায়ন করতে সক্ষম নয়।
মহান আল্লাহ শুধু যে বৈচিত্রময় রঙ দিয়েই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তা নয় তিনি বিভিন্ন ফসল ও ফলমূলের স্বাদ আলাদা আলাদা করে দিয়েছেন যদিও এগুলো সব একই মাটি ও পানি থেকে উৎপাদিত। বৃষ্টির পানির যেমন কোনো রঙ নেই তেমন কোনো গন্ধও নেই। অথচ এই পানি যখন এক একটি গাছের মধ্যে প্রবাহিত হয় তখন তা এক এক রকম রঙ ও স্বাদ তৈরি করে মানুষকে উপহার দেয়। মানুষের পক্ষে কোনো অবস্থায় এতসব নেয়ামতের শোকর আদায় করা সম্ভব নয়।
পরের আয়াতে জ্ঞানী ব্যক্তিদের গুরুদায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে: যারা আল্লাহর সৃষ্টির বিশালত্ব উপলব্ধি করার পাশাপাশি তাঁর অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন তারাই আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত হন এবং ইবাদত ও শুকরিয়া আদায় ঠিকমতো হলো কিনা তা নিয়ে ভয়ে অস্থির থাকেন।
এখানে প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি তাকে বলা হয়েছে যিনি আল্লাহ এবং তার সৃষ্টিজগতকে চিনতে পেরেছেন এবং সারাক্ষণ তাঁর ভয়ে অস্থির থাকেন। যারা পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের গুরুত্বপূর্ণ থিওরি আবিস্কার করেছেন জ্ঞানী বলতে এখানে তাদের কথা বলা হয়নি। কারণ, এ ধরনের থিওরি আবিস্কারকরা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম নাও হতে পারেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, যে জ্ঞান মানুষকে প্রকৃতি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করার মাধ্যমে এক আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেয় এবং তার ঈমান শক্তিশালী করে সেটিই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞান। যে ব্যক্তি পার্থিব জ্ঞান আহরণ করে নিজের ভাণ্ডারকে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করে কিন্তু বিশ্বজগত সৃষ্টির উদ্দেশ্য, পরকালে আল্লাহর কাছে মানুষের জবাবদিহীতা- ইত্যাদি বিষয়ে কোনো ধারণা রাখে না সে আসলে মুর্খের জগতেই বসবাস করছে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- এক মাটি ও পানি থেকে বিভিন্ন রঙ ও স্বাদের শস্য ও ফলমূল উৎপাদন আল্লাহ তায়ালার অসীম ক্ষমতার নিদর্শন।
২- ধর্ম সৌন্দর্যের বিরোধী নয়। সমস্ত সৌন্দর্যের সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন মহান আল্লাহ। তিনি পাহাড়, জঙ্গল ও সাগরবক্ষে সুন্দরতম প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো রচনা করেছেন এবং এগুলোকে নিজের অস্তিত্বের নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
৩- মানুষের বর্ণের প্রকারভেদ আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ; মানুষ যেন একের বিরুদ্ধে অন্যের বড়ত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার কাজে বর্ণকে ব্যবহার না করে।
৪- সৃষ্টিজগত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহকে চেনার মাধ্যমে অন্তরে তাঁর সম্পর্কে ভয় ও বিনয় তৈরি করা। অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও আমিত্ব প্রকাশের জন্য জ্ঞানী হওয়া যাবে না।
সূরা ফাতিরের ২৯ ও ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً يَرْجُونَ تِجَارَةً لَنْ تَبُورَ (29) لِيُوَفِّيَهُمْ أُجُورَهُمْ وَيَزِيدَهُمْ مِنْ فَضْلِهِ إِنَّهُ غَفُورٌ شَكُورٌ (30)
“যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, নামায কায়েম করে এবং আমি যা দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করে, যাতে কখনও লোকসান হবে না।” (৩৫:২৯)
“পরিণামে তাদেরকে আল্লাহ তাদের পুরস্কার পুরোপুরি দেবেন এবং (সেই সঙ্গে) নিজ অনুগ্রহে (তা) আরও বাড়িয়ে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও গুণগ্রাহী।” (৩৫:৩০)
আগের আয়াতে আল্লাহর প্রতি জ্ঞানী ব্যক্তিদের ভয় ও বিনয় সম্পর্কে আলোকপাত করার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহর প্রতি ভয় ও বিনয়ের সঙ্গে তাঁর দয়ার প্রতি আশাবাদী থাকার অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক রয়েছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে অতীতের গোনাহ ক্ষমা করে দেয়ার পাশাপাশি মহা পুরস্কার লাভের আশা মানুষকে তার প্রতি ভীত ও বিনয়ী করে তোলে। অবশ্য মনে রাখতে হবে, নেক আমল না করেই যদি কেউ আল্লাহর দয়া আশা করে তাহলে সে বোকার স্বর্গে বাস করছে। এ কারণে এই আয়াতে বলা হচ্ছে: দুনিয়া ও আখেরাতে তারাই আল্লাহর রহমতের প্রতি আশাবাদী হতে পারে যারা নেক আমল করে। তারা যেমন আল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখে, নামাজ কায়েম ও কুরআন তেলাওয়াত করে তেমনি আল্লাহ অসহায় বান্দাদের খোঁজখবর নেয় এবং সাধ্যমতো দান-খয়রাত করে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করাই যথেষ্ট নয় সঙ্গে ইবাদত বন্দেগীও করতে হবে।
২- আল্লাহ তায়ালা নিশ্চিত লাভ হওয়ার মতো যে ব্যবসার কথা বলেছেন তা হচ্ছে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা অর্থাৎ অসহায় ব্যক্তিদের সাহায্য করা। জান, মাল, জ্ঞান, সম্মান ইত্যাদি দিয়ে এই সাহায্য করা যেতে পারে।
৩- দানবিহীন নামাজ কিংবা নামাজবিহীন দান কোনোটিই কাজে আসবে না।
৪- আমাদের যা কিছু আছে তা যদি আল্লাহর দান মনে করে থাকি তাহলে তা দিয়ে অন্যকে সাহায্য করার সময় কার্পন্য আসবে না এবং নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত মনে হবে না। #