জুন ০৩, ২০১৯ ১৬:০৮ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ৩১ থেকে ৩৫ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এই সূরার ৩১ ও ৩২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ هُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ إِنَّ اللَّهَ بِعِبَادِهِ لَخَبِيرٌ بَصِيرٌ (31) ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَابَ الَّذِينَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِنَفْسِهِ وَمِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ بِإِذْنِ اللَّهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَضْلُ الْكَبِيرُ (32)  

“আমি আপনার প্রতি যে কিতাব প্রত্যাদেশ করেছি, তা সত্য এবং পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর সত্যায়নকারী।  নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে সব জানেন, দেখেন।” (৩৫:৩১)

“অতঃপর আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে যাদেরকে মনোনীত করেছি তাদেরকে কিতাবের অধিকারী করেছি।  তাদের কেউ কেউ নিজেদের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী এবং কেউ কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণের পথে এগিয়ে গেছে। এটাই মহা অনুগ্রহ।” (৩৫:৩২)

আগের আয়াতগুলোতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত এবং এই মহাগ্রন্থের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। এরপর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: কুরআনের বাণী হিসেবে যেসব বক্তব্য রাসূলে আকরাম (সা.)-এর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে তা সত্য। কারণ, এগুলো মহাসত্য অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে ওহী হিসেবে এসেছে এবং মানুষের যুক্তি, বুদ্ধি ও বিবেকের সঙ্গেও এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের কাছে পাঠানো কিতাবের সঙ্গে এই কুরআনের মিল রয়েছে। এই গ্রন্থে পূর্ববর্তী নবী-রাসূল ও তাঁদের কিতাবকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তাঁদের প্রতি ঈমান আনাকে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমানের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

পরের আয়াতে বলা হচ্ছে, গোটা মুসলিম উম্মাহ- যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে তারা অন্য মানুষদের চেয়ে শ্রেয়তর। কাজেই তাদেরকে এই কুরআন অনুধাবন করে সে অনুযায়ী আমল করার পাশাপাশি তা প্রচারে সচেষ্ট হতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু মানুষ নিজেদের প্রতি জুলুম করার মাধ্যমে পবিত্র কুরআন থেকে দূরে সরে গেছে, আরেক দল কুরআনের শিক্ষা অনুসরণ করছে এবং তৃতীয় দল আমল ও প্রচারের কাজে সবার চেয়ে এগিয়ে গেছে। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইত বা ইমামগণ হচ্ছেন সেই অগ্রগামী দল। সাধারণ মানুষ তাদেরকে অনুসরণ করবে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- পবিত্র কুরআনে মিথ্যা বা অসত্য বক্তব্য নেই। এই গ্রন্থের সব আয়াত সত্য ও বাস্তব। এ কারণে এই বাণীর বক্তব্য দৃঢ়, অটল ও অপরিবর্তনীয়।

২- আসমানি কিতাবগুলোর পাশাপাশি নবী-রাসূলগণ সবাই একই লক্ষ্যে কাজ করতেন। এ কারণ তারা পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

৩- পবিত্র কুরআন এবং এর শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে নিজের প্রতি জুলুম বা অত্যাচার করা। এর ফলে আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের কোনো ক্ষতি হবে না।

৪- যারা ভালো কাজে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন তারাই কুরআনের জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হন। অন্য কথায় কুরআনের জ্ঞানের অধিকারী হতে হলে ভালো কাজ ও পরোপকারের দিক দিয়ে অন্যদের চেয়ে অগ্রগামী হতে হবে।

সূরা ফাতিরের ৩৩ থেকে ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক বলেছেন:

جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ (33) وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ إِنَّ رَبَّنَا لَغَفُورٌ شَكُورٌ (34) الَّذِي أَحَلَّنَا دَارَ الْمُقَامَةِ مِنْ فَضْلِهِ لَا يَمَسُّنَا فِيهَا نَصَبٌ وَلَا يَمَسُّنَا فِيهَا لُغُوبٌ (35)

“(পুরস্কার হিসেবে) তারা প্রবেশ করবে চিরস্থায়ী আবাস জান্নাতে। তথায় তারা স্বর্ণনির্মিত, মোতি খচিত কংকন দ্বারা অলংকৃত হবে। সেখানে তাদের পোশাক হবে রেশমের।” (৩৫:৩৩)

“আর তারা বলবে- সমস্ত কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের দূঃখ দূর করেছেন। নিশ্চয় আমাদের পালনকর্তা ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী (ও কৃতজ্ঞ)।” (৩৫:৩৪) 

“যিনি স্বীয় অনুগ্রহে আমাদেরকে (এমন) চিরস্থায়ী আবাসে স্থান দিয়েছেন, যেখানে কষ্ট আমাদেরকে স্পর্শ করে না এবং স্পর্শ করে না ক্লান্তি।”  (৩৫:৩৫)

আগের আয়াতে বলা হয়েছে, মুসলিম উম্মাহ তিন ভাগে বিভক্ত- জালিম বা অত্যাচারী, আল্লাহর অনুগত বান্দা এবং ইমামগণ। আর এই তিন আয়াতে তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীকে পুরস্কারের সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে। কিয়ামতের দিন চিরস্থায়ী আবাসস্থল জান্নাতে প্রবেশ করানোর মধ্যদিয়ে সে পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে। জান্নাত শুধু একটি সুন্দর ও মনোরম স্থানই নয় পাশাপাশি সেখানকার অধিবাসীদের এমনভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে দেয়া হবে যাতে তাদের মনে কোনো দুঃখ বা ক্লান্তি না থাকে। সেখানে কেউ ভয় বা দুঃখ পাবে না এবং পরিশ্রম বা ক্লান্তিকর কোনো কাজ করারও প্রয়োজন থাকবে না।

পার্থিব জীবনে দু’টি কারণে মানুষ ক্লান্ত বা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। প্রথমত, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পাওয়া একই নেয়ামত ভোগ করতে করতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, এই নেয়ামত আল্লাহ আবার কেড়ে নেন কিনা সেই ভয়ে মানুষ তটস্থ থাকে।  কিন্তু জান্নাতে এত বেশি নেয়ামত আল্লাহ দেবেন যে, তা ভোগ করতে মানুষের ক্লান্তি আসবে না। সেইসঙ্গে এই বিচিত্র নেয়ামতরাজি আল্লাহর পক্ষ থেকে কেড়ে নেয়ারও কোনো আশঙ্কা থাকবে না।

জান্নাতে যাওয়ার পর এত সুন্দর ও অতুলনীয় বসবাসের স্থান পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মুখ থেকে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা বেরিয়ে পড়বে। তারা মহান দয়ালু আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবে। তারা উপলব্ধি করবে, শুধুমাত্র দুনিয়ার জীবনে তারা যেসব নেক আমল করেছে তার প্রতিদান হিসেবে এত বিশাল নেয়ামত পাওয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা তাদের গোনাহ ক্ষমা করে এবং তাদের অপরাধগুলো ঢেকে দিয়ে তাদেরকে এই জান্নাত দান করেছেন। আল্লাহর যদি রহমত, দয়া ও অনুগ্রহ না থাকত তাহলে এই চিরস্থায়ী আবাসস্থল পাওয়া সম্ভব হতো না।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- যারা এই দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেদেরকে কিছু পার্থিব ভোগসম্ভার থেকে বঞ্চিত রাখেন আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন চিরস্থায়ী জীবনে তাদের এই ক্ষতি পুষিয়ে দেবেন। যেমন- পার্থিব জীবনে পুরুষের জন্য স্বর্ণ ও রেশমি পোশাক পরিধান করা হারাম হলেও কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে স্বর্ণালঙ্কার ও রেশমি পোশাক দিয়ে সুসজ্জিত করে দেবেন।

২- জান্নাতে মানুষ শারিরীক ও মানসিক উভয় দিক দিয়ে তৃপ্তি লাভ করবে। কিন্তু পার্থিব জীবন এমন নয়। পৃথিবীর জীবনে ধন-সম্পদের অধিকারী প্রচুর মানুষ আছে যারা শারীরিক অথবা মানসিক অথবা উভয় দিক দিয়ে পেরেশানির মধ্যে রয়েছে।

৩- মহান আল্লাহ মানুষের অপরাধের ব্যাপারে ক্ষমাশীল এবং তার নেক আমলের উত্তম প্রতিদানকারী। আমাদেরকে আল্লাহ তায়ালার এই গুণ অর্জনের জন্য সচেষ্ট হতে হবে।

৪- পার্থিব জীবনে কেউ যদি সারাজীবন আল্লাহর ইবাদত করে থাকে সে তুলনায় কিয়ামতের দিন তাকে যে বিশাল প্রতিদান দেয়া হবে তার তুলনা চলে না। তাই জান্নাতবাসীর মনে হবে, নেক আমলের কারণে নয় বরং আল্লাহ তায়ালা নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে এই বিশাল নেয়ামতরাজী দান করেছেন।#