সূরা ফাতির: আয়াত ৩৬-৩৮ (পর্ব-১১)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ৩৬ থেকে ৩৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এই তিনি আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقْضَى عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ مِنْ عَذَابِهَا كَذَلِكَ نَجْزِي كُلَّ كَفُورٍ (36) وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيهَا رَبَّنَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُمْ مَا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ نَصِيرٍ (37) إِنَّ اللَّهَ عَالِمُ غَيْبِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ (38)
“আর যারা কাফের হয়েছে, তাদের জন্যে রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদেরকে মৃত্যুর আদেশও দেয়া হবে না যে, তারা মরে যাবে এবং তাদের থেকে শাস্তিও লাঘব করা হবে না। আমি প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে এভাবেই শাস্তি দিয়ে থাকি।” (৩৫:৩৬)
“এবং সেখানে তারা আর্ত চিৎকার করে বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে (এখান থেকে) বের করুন যাতে আমরা সৎকাজ করতে পারি, পূর্বে যা করতাম তা (আর) করব না। (এর জবাবে আল্লাহ বলবেন) আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দেইনি, যাতে (সেই সময়ের মধ্যে) যা কিছু চিন্তা করার বিষয় তা চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী আগমন করেনি? অতএব আস্বাদন কর। জালেমদের জন্যে কোন সাহায্যকারী নেই।” (৩৫:৩৭)
“নিশ্চয় আল্লাহ আসমান ও যমীনের অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত। তিনি অন্তরের বিষয় সম্পর্কেও সবিশেষ অবহিত।” (৩৫:৩৮)
গত আসরে আমরা মুমিন ও নেক আমলকারী ব্যক্তিকে প্রদেয় মহা পুরস্কারের কথা উল্লেখ করেছিলাম। আর আজকের প্রথম দুই আয়াতে কাফিরদের জন্য কঠিন ও মর্মন্তুদ শাস্তি প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়েছে। ইসলামি পরিভাষায় যে ব্যক্তি সত্য উপলব্ধি করার পরও তা অস্বীকার করেছে তাকে কাফির বলা হয়। এ ছাড়া, যার জন্য সত্যকে চেনার মতো উপযুক্ত পরিবেশ থাকার পরও সত্যকে চেনা বা জানার চেষ্টা করেনি সেও কাফির। প্রকৃতপক্ষে বস্তুগত স্বার্থ রক্ষা এবং খেয়াল-খুশি বা প্রবৃত্তির অনুসরণের কারণে যারা সত্য থেকে দূরে থাকে তারাই কাফির।
স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ উদ্ধারের জন্য যারা সত্যকে অস্বীকার করে তারা নিজেদের পাশাপাশি সমাজের প্রতি অবিচার করে এবং তারা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে শাস্তি পাওয়ার উপযুক্ত হয়ে যায়। কারণ, প্রবৃত্তি বা খেয়াল খুশির অনুসরণ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠাননি। তিনি বরং তাঁর নির্দেশিত পথে চলার জন্য মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। নির্ধারিত এই পথ থেকে সরে গেলে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য।
এরপর সত্য অস্বীকারকারীদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: তারা যেন না ভাবে যে, পার্থিব জীবনে তারা যা কিছু করবে তার জন্য তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না। আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার জীবন সৃষ্টি করেছেন পরকালের পাথেয় সঞ্চয় করার জন্য। এখানে মানুষকে ভালো ও মন্দ উভয় ধরনের কাজ করার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু মানুষ যে কাজই করুক না কেন সেজন্য তাকে পুরস্কার বা শাস্তি পেতে হবে। দুনিয়ার জীবনেই খারাপ কাজের কিছু শাস্তি মানুষকে পেতে হয়। কিন্তু এসব কাজের আসল শাস্তি পরকালে দেয়া হবে। দুনিয়ার জীবনে স্থান ও সময়ের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে পরকালে সেরকম কিছু থাকবে না এবং সেখানে মানুষের ভালো ও মন্দ কাজের পরিমাণ ও প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে তাদেরকে পুরস্কার ও শাস্তি দেয়া হবে।
চেঙ্গিস খান, হিটলার ও সাদ্দামের মতো নরপিশাচ পৃথিবীতে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। তাদেরকে যদি নরহত্যার জন্য গ্রেফতার করে শাস্তি দেয়া হয় তাহলে সর্বোচ্চ একবার তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলানো যাবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে বলছেন: পরকালীন জীবনে কারো মৃত্যু হবে না এবং প্রত্যেকে তার অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি পাবে। প্রয়োজনে তাদেরকে হাজার হাজার বছর ধরে জাহান্নামের আগুনে পোড়ানো হবে। আল্লাহর বিচার হবে তাঁর মহাজ্ঞান ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। কাজেই গোনাহগার বান্দাদের শাস্তি এতটুও কম বা বেশি করা হবে না। যার যতটুকু প্রাপ্য তাকে ততটুকু শাস্তি দেয়া হবে। একজন অপরাধী ব্যক্তি কতটুকু শাস্তি পাবে তা মহান আল্লাহ নিজে নির্ধারণ করবেন। কারণ, তিনি প্রত্যেকের জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর রাখেন। সে প্রকাশ্যে ও গোপনে যা কিছু করে এবং অন্তরে যা পোষণ করে তার কোনো কিছুই আল্লাহর অজানা নয়।
পরের আয়াতে পাপী ব্যক্তিদের একটি আবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা কিয়ামতের দিন শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর দুনিয়ার জীবনে ফিরে আসতে চাইবে। তারা বলবে, দুনিয়ার জীবনে ফেরত পাঠালে তারা আর পাপকাজ করবে না বরং নেক আমল করবে। যেসব কাজকে তারা দুনিয়ার জীবনে খারাপ মনে করা সত্ত্বেও করেছে সেগুলো আর না করার প্রতিশ্রুতি দেবে। সেইসঙ্গে যেসব খারাপ কাজকে তারা ভালো কাজ মনে করে করেছে কিন্তু কিয়ামতের দিন সে ভুল বুঝতে পেরেছে সেগুলিও আর করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেবে। কিন্তু সেদিন তাদের কোনো কথা শোনা হবে না। আল্লাহ তায়ালা এবং আজাবের ফেরেশতারা তাদেরকে বলবেন: পার্থিব জীবনে সত্য ও মিথ্যা সম্পর্কে তোমার যতটুকু জ্ঞান ছিল তা কি গোনাহর কাজ পরিহার করে নেক আমল করার জন্য যথেষ্ট ছিল না? নবী-রাসূল ও ওলি-আউলিয়াগণ আজকের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির ব্যাপারে কি দুনিয়াতে তোমাকে সতর্ক করেনি? পার্থিব জীবনে কি একবারও একথা উপলব্ধি করোনি, যে পথ বেছে নিয়েছ তার পরিণতি জাহান্নাম? যদি করে থাকো, তাহলে আজকের এই অনুশোচনা ও প্রতিশ্রুতির কি দাম আছে? তোমরা যে আবার দুনিয়ায় ফিরে গিয়ে পাপকাজে লিপ্ত হবে না তার নিশ্চয়তা আছে কি?
এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হলো:
১. কুফর যেমন আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করার সমতুল্য তেমনি আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করলে মানুষ কুফরের পথে পরিচালিত হয়।
২. দুনিয়ার সব অপরাধী ও দাম্ভিক ব্যক্তি কিয়ামতের দিন নিজের অক্ষমতা দেখতে পেয়ে গগণবিদারি চিৎকার করবে। কিন্তু সেদিনের অসহায়ত্ব ও অনুশোচনা তাদের কোনো কাজে আসবে না।
৩. অপরাধীদের সামনে সত্যের বাণী তুলে ধরার পরও যদি সে অপরাধ করেই যায় তাহলে তার ক্ষমার আবেদনের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তাকে প্রাপ্য শাস্তি দেয়া উচিত।
৪. আমোদ-ফুর্তিতে মেতে থাকার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে দুনিয়াতে পাঠাননি; বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর স্মরণ ও স্বীয় কর্তব্যের কথা মনে রাখতে হবে। তা না হলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের উদাসীনতা বাড়বে এবং আমরা ক্রমেই জান্নাত থেকে জাহান্নামের দিকে ধাবিত হব।
৫. আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া জীবনের মুহূর্তগুলোকে সঠিক পথে ব্যয় না করার অর্থ নিজের প্রতি জুলুম করা। এজন্য কাল কিয়ামতে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
৬. ইসলামের পরিভাষায় অন্যের প্রতি জুলুম এবং নিজের প্রতি জুলুমকে একই মাপকাঠিতে পরিমাপ করা হয়েছে। আমাদের নিয়ন্ত্রণে যা কিছু আছে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া আমানত। আমরা এগুলোর মালিক নই। এমনকি আমাদের এই দেহের মালিকও আমরা নই যে তাকে যথেচ্ছা ব্যবহার করব। #