সূরা ফাতির: আয়াত ৩৯-৪১ (পর্ব-১২)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ৩৯ থেকে ৪১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এই সূরার ৩৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
هُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ فِي الْأَرْضِ فَمَنْ كَفَرَ فَعَلَيْهِ كُفْرُهُ وَلَا يَزِيدُ الْكَافِرِينَ كُفْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ إِلَّا مَقْتًا وَلَا يَزِيدُ الْكَافِرِينَ كُفْرُهُمْ إِلَّا خَسَارًا (39)
“তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী করেছেন। অতএব যে কুফরী করবে তার কুফরী তারই ক্ষতি করবে। কাফেরদের কুফর কেবল তাদের পালনকর্তার ক্রোধই বৃদ্ধি করে এবং কাফেরদের কুফর কেবল তাদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।” (৩৫:৩৯)
এই আয়াতের শুরুতেই মহান আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষকে উত্তরাধিকারী করার কথা বলেছেন। এই বিষয়টিকে মুফাসসিরগণ দুইভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এক, পৃথিবীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে প্রতিনিধিত্ব দান এবং দুই, অতীত জাতিগুলোর পরে পরবর্তী জাতির উত্তরাধিকার প্রাপ্তি। দুই ধরনের ক্ষেত্রেই এই আয়াতে মানুষের প্রতি আল্লাহ তায়ালার দয়া ও অনুগ্রহ ফুটে উঠেছে। মহান আল্লাহ মানুষকে এই ভূপৃষ্ঠের ওপর কর্তৃত্ব দান করে গোটা প্রকৃতির সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করার অনুমতি দিয়েছেন। বুৎপত্তিসম্পন্ন মানুষ মাত্রই বলবেন, যিনি এই মহা অনুগ্রহ দান করেছেন তাকে সঠিকভাবে চিনতে এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ এই বিশ্বজগতের স্রষ্টাকে চেনে না এবং তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। এই অকৃতজ্ঞতা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকার বা তাঁর কুফরি করার শামিল। কিন্তু এই কুফরি করার ফলে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হয় না বরং যে কুফরি করে সে ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের কৃতজ্ঞতার মুখাপেক্ষী নন; এমনকি পৃথিবীর বুকে একজন বান্দা না থাকলেও আল্লাহর কিছু যায় আসে না। যেদিন পৃথিবীতে কোনো মানুষ ছিল না সেদিনও তিনি ছিলেন এবং যেদিন কেউ থাকবে না সেদিনও তিনি থাকবেন।
কিন্তু যারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, ঈমান আনবে ও নেক আমল করবে তারা দুনিয়া ও আখেরাতের আল্লাহর রহমত বা দয়া লাভ করবে এবং অকৃতজ্ঞ ও কাফির বান্দারা আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দু’টি দিক হচ্ছে:
১- আমরা যেমন অতীত জাতিগুলোর স্থলে বর্তমানে পৃথিবীতে অবস্থান করছি তেমনি একদিন আমাদের অনুপস্থিতিতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মগুলো এ পৃথিবীর নেয়ামত ভোগ করবে। কাজেই আমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে যেন অহংকার না করি এবং আল্লাহর অকৃতজ্ঞ বান্দা না হই।
২- কুফরি অনেক বড় গোনাহর ক্ষেত্র তৈরি করে এবং মানুষকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যায়।
সূরা ফাতিরের ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
قُلْ أَرَأَيْتُمْ شُرَكَاءَكُمُ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَرُونِي مَاذَا خَلَقُوا مِنَ الْأَرْضِ أَمْ لَهُمْ شِرْكٌ فِي السَّمَاوَاتِ أَمْ آَتَيْنَاهُمْ كِتَابًا فَهُمْ عَلَى بَيِّنَةٍ مِنْهُ بَلْ إِنْ يَعِدُ الظَّالِمُونَ بَعْضُهُمْ بَعْضًا إِلَّا غُرُورًا (40)
“বলুন, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যেসব শরীককে ডাকো তাদেরকে দেখেছ কি? (তাদের কথা কখনো ভেবেছ কি?) তারা পৃথিবীতে কিছু সৃষ্টি করে থাকলে আমাকে দেখাও। আসমান সৃষ্টিতে তাদের কোন অংশ (বা ভূমিকা) আছে কি? অথবা আমি কি তাদেরকে কোন কিতাব দিয়েছি যে, তারা তার দলিলের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে? (না, এর কোনটাই নেই) বরং জালেমদের কেউ কেউ একে অপরকে কেবল প্রতারণামূলক ওয়াদা দিয়ে থাকে।” (৩৫:৪০)
এই আয়াতে শিরক সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করে আল্লাহর কল্পিত শরীকদের সম্পর্কে মুশরিকদেরকে দলিল পেশ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, এসব কল্পিত শরিকরা পৃথিবীর বুকে কোনো কিছু সৃষ্টি করেছে কি? যদি করে না থাকে তাহলে তোমরা বিশ্বজগতের স্রষ্টার সঙ্গে তাদেরকে কিভাবে শরীক করো? যুক্তির বিচারে যে কোনোকিছু সৃষ্টি করেনি সে কি উপাসনার যোগ্য হতে পারে? কিংবা যুগে যুগে নবী-রাসূলদের কাছে পাঠানো কিতাবে কি এমন কোনো উপাস্যের কথা বলা হয়েছে যাদের উপাসনা তোমরা করছ? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর মুশরিকদের কাছে ছিল না বা এখনো নেই। তারা কেবল অলীক কল্পনার পেছনে ছোটে এবং এসব কল্পিত উপাস্য পরকালে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবে বলে পরস্পরকে ধোঁকা দেয়।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- ইসলামের দাওয়াত দেয়ার অন্যতম পদ্ধতি হলো- প্রশ্ন উত্থাপন করে শ্রোতার যুক্তি ও বিবেককে জাগিয়ে তোলা।
২- কুফর ও শিরকের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। ভুল চিন্তাদর্শনের ওপর ভিত্তি করে কাফির ও মুশরিকরা মানুষকে ধোঁকা দেয়।
সূরা ফাতিরের ৪১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ يُمْسِكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ أَنْ تَزُولَا وَلَئِنْ زَالَتَا إِنْ أَمْسَكَهُمَا مِنْ أَحَدٍ مِنْ بَعْدِهِ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا (41)
“নিশ্চয় আল্লাহ আসমান ও যমীনকে স্থির রাখেন, যাতে টলে না যায়। যদি এগুলো (নিজেদের অবস্থান থেকে) সরে যায় তবে তিনি ব্যতীত কে এগুলোকে স্থির রাখবে? অবশ্যই তিনি সহনশীল ও ক্ষমাকারী।” (৩৫:৪১)
আগের আয়াতে আসমান, জমিন ও এর উপরে বিদ্যমান সবকিছু সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করার পর এই আয়াতে বিশ্বজগত পরিচালনায় আল্লাহ তায়ালার একক কর্তৃত্বের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, তিনি ছাড়া আর কারো পক্ষে এসব পরিচালনা করা সম্ভব নয়। মক্কার মুশরিকরা সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আল্লাহকে স্বীকার করলেও তাদের জীবন ও বিশ্বজগত পরিচালনায় আল্লাহর সঙ্গে অনেককে শরিক করত। এ কারণে তাদের উদ্দেশ করে এই আয়াতে বলা হচ্ছে: সৃষ্টিতে যেমন আল্লাহর কোনো শরিক নেই তেমনি পরিচালনায়ও কেউ তার সমকক্ষ নয়। বিশ্বজগতের অস্তিত্ব রক্ষা ও তা পরিচালনা তিনি এককভাবে সম্পন্ন করেন।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- আসমান, জমিন এবং এর মধ্যে অবস্থিত চন্দ্র, সূর্য ও তারকারাজি’সহ সবকিছু সৃষ্টি ও নির্ধারিত কক্ষপথে পরিচালনা করছেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা।
২- এই বিশ্বজগত দৈবক্রমে ও উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করা হয়নি; বরং একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার আওতায় আল্লাহ তায়ালা এগুলো সৃষ্টি করেছেন।
৩- মহান আল্লাহ একইসঙ্গে সৃষ্টিকর্তা এবং পালনকর্তা। যেকোনো জীব বা জড়বস্তু সৃষ্টি ও তার অস্তিত্ব টিকে থাকার বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। তিনি ইচ্ছা না করলে কোনোকিছুর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায় না।
৪- আল্লাহ ক্ষমাকারী ও সহনশীল না হলে অপরাধী ও অত্যাচারী ব্যক্তিদের মাথার উপর সৃষ্টিজগত ভেঙে পড়ত। তিনি জালিমদের ভালো হওয়ার জন্য যে সুযোগ দেন তা তাঁর সহনশীল গুণের কারণে। এটাকে যেন কেউ আল্লাহর অক্ষমতা ভেবে ভুল না করে। #