সূরা ফাতির: আয়াত ৪২-৪৪ (পর্ব-১৩)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ৪২ থেকে ৪৪নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এই সূরার ৪২ ও ৪৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَئِنْ جَاءَهُمْ نَذِيرٌ لَيَكُونُنَّ أَهْدَى مِنْ إِحْدَى الْأُمَمِ فَلَمَّا جَاءَهُمْ نَذِيرٌ مَا زَادَهُمْ إِلَّا نُفُورًا (42) اسْتِكْبَارًا فِي الْأَرْضِ وَمَكْرَ السَّيِّئِ وَلَا يَحِيقُ الْمَكْرُ السَّيِّئُ إِلَّا بِأَهْلِهِ فَهَلْ يَنْظُرُونَ إِلَّا سُنَّةَ الْأَوَّلِينَ فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَحْوِيلًا (43)
“মুশরিকরা কঠোরতম শপথ করে বলত, তাদের কাছে কোন সতর্ককারী আগমন করলে তারা অন্য যে কোন সম্প্রদায়ের চেয়ে অধিকতর সৎপথে চলবে। অতঃপর যখন তাদের কাছে সতর্ককারী আগমন করল, তখন (সত্যের প্রতি) তাদের ঘৃণাই কেবল বেড়ে গেল।” (৩৫:৪২)
“পৃথিবীতে ঔদ্ধত্যের কারণে এবং কুচক্রের কারণে (সত্যের প্রতি তাদের ঘৃণা বেড়ে গেল)। কুচক্র শুধুমাত্র কুচক্রীদেরকেই ঘিরে ধরে। সুতরাং তারা কি পূর্ববর্তীদের (ব্যাপারে আল্লাহর) রীতি ছাড়া অন্য কিছুর অপেক্ষা করছে? যদিও আপনি আল্লাহর বিধানে পরিবর্তন পাবেন না এবং আল্লাহর রীতি-নীতিতে কোন রকম বিচ্যুতিও পাবেন না।” (৩৫:৪৩)
নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে, মক্কার মুশরিকরা যখন জানতে পারে অতীতে ইহুদিরা নবী-রাসূলদের শিক্ষা গ্রহণ করেনি, এমনকি কোনো কোনো নবীকে হত্যা করেছে তখন তারা এই শপথ নেয় যে, “আমাদের প্রতি কোনো নবী পাঠানো হলে আমরা তার শিক্ষা মেনে চলব এবং তার দাওয়াতে সাড়া দেব। আমরা অন্য যেকোনো জাতির চেয়ে বেশি হেদায়েত প্রাপ্ত হব।” কিন্তু যখনই মহানবী (সা.) মক্কার কাফেরদের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করেন, কুরাইশের নেতৃস্থানীয় লোকের তাঁকে অস্বীকার করে এবং তাঁর দাওয়াতের বাণী প্রত্যাখ্যান করে। তারা এ ব্যাপারে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু প্রদর্শন করেনি। কুরাইশ নেতারা দলে দলে মানুষের ইসলাম গ্রহণ ঠেকাতে নানা রকম কৌশল ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, কুরাইশ নেতারা কেন তাদের শপথ ভঙ্গ করেছিল? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, বিশ্বনবী (সা.) তৎকালীন আরব সমাজে প্রচলিত রীতিনীতি ও পাপকাজের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন যা কুরাইশ অধিপতিদের ভালো লাগেনি। তারা চেয়েছিল আল্লাহর নবী তৎকালীন সমাজে প্রচলিত সব কুপ্রথা ও অনাচার মেনে নিয়ে কাফের নেতাদের পক্ষে কথা বলবেন। কিন্তু ইসলাম যখন মহান আল্লাহর সামনে সব মানুষের সমান অধিকারের কথা বলতে শুরু করে তখন মুশরিক অধিপতিরা তাদের ক্ষমতার মসনদকে টালমাটাল দেখতে পায়। দরিদ্র ও মিসকিন ব্যক্তিরা নেতাদের সমান অধিকার পাবে- এটা মেনে নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এতদিন যাদেরকে ক্রীতদাস বলে পশুর মতো নির্দয় আচরণ করে এসেছে তারা কথিত প্রভুদের সমান মানবীয় মর্যাদা পাবে এটা তারা ভাবতেই পারছিল না। ইসলামের দৃষ্টিতে মনীব ও ক্রীতদাস নির্বিশেষে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তির মর্যাদা বেশি যার তাকওয়া বা খোদাভীতি বেশি। বিশ্বনবীর এই বক্তব্য কুরাইশ অধিপতিদেরকে সত্য মেনে নেয়া থেকে বিরত রেখেছিল।
কাজেই দেখা যাচ্ছে, আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মম্ভরিতা ও অহংকার দেখানোর কারণে কাফির ও মুশরিকরা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিতে পারেনি। যে ব্যক্তি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নিজের খেয়ালখুশিকে প্রাধান্য দেয় এবং আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পন করতে রাজি হয় না তাকে দাম্ভিকতায় পেয়ে বসে। এই দাম্ভিক ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনকে দুর্বল করে ফেলার জন্য নানারকম ফন্দি ও ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে এবং তারা নিজেরাই এ ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়বে। মানবজাতির ব্যাপারে এটাই আল্লাহ তায়ালার বিধান।
এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- যেকোনো ব্যক্তি শপথ করে কথা বললেই তা বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ এমন বহু শপথ করা হয় যেগুলো পরে ভেঙে ফেলা হয় এবং শপথকারী তার প্রতিশ্রুতির বিপরীত কাজ করে।
২- মানুষ যাতে সত্য পথে চলার ব্যাপারে উদাসীন হয়ে না যায় সেজন্য তাকে সতর্ক করার প্রয়োজন রয়েছে।
৩- সত্য না জানার কারণে বেশিরভাগ মানুষ কুফরি করে- বিষয়টি এমন নয়। বরং মহান আল্লাহকে চেনার পরেও তারা অহংকার ও আত্মম্ভরিতার কারণে তাঁর সামনে মাথানত করতে রাজি নয়।
৪- আল্লাহর সৃষ্টিজগত তাঁর নির্ধারিত নিয়মকানুন দ্বারা পরিচালিত হয়। জীবনে সৌভাগ্য অর্জন করতে চাইলে এই নিয়মকানুন জানা জরুরি।
সূরা ফাতিরের ৪৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَكَانُوا أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعْجِزَهُ مِنْ شَيْءٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ إِنَّهُ كَانَ عَلِيمًا قَدِيرًا (44)
“তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না যাতে এটা দেখতে পায় যে, যারা তাদের পূর্বে এসেছিল এবং তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী ছিল তাদের কি পরিণাম হয়েছে? আকাশ ও পৃথিবীতে এমন কোন কিছু নেই যা আল্লাহকে অক্ষম করে দিতে পারে। কারণ, তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান।” (৩৫:৪৪)
আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে কাফের ও সত্য অস্বীকারকারীদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: যদি পৃথিবীতে ভ্রমণ করো তাহলে তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর সঙ্গে আল্লাহ কেমন আচরণ করেছিলেন তা দেখতে পাবে। তাদের শক্তি তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদেরকে এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে যে, তাদের কোনো চিহ্নই আজ আর অবশিষ্ট নেই। ফেরাউন, নমরুদ ও তাদের পারিষদবর্গ যারা একসময় ধন-সম্পদ, শান-শওকত ও শৌর্যবীর্জের অধিকারী ছিল এবং পৃথিবীর একটা বিশাল অংশে রাজত্ব করত আজ তারা কোথায়? তারা বহু আগে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তারা কি আল্লাহর ইচ্ছার মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে জয়ী হতে পেরেছে? তারা কি আল্লাহ তায়ালাকে ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়েছে? তারা কি আল্লাহর মহারাজত্বের বাইরে গিয়ে নিজেদের মুক্তি দিতে পেরেছে?
যদি আমরা অতীত জাতিগুলোর ইতিহাস পড়ি তাহলে আল্লাহ তায়ালার অলঙ্ঘনীয় বিধান সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারব। আমরা উপলব্ধি করতে পারব যে, কুফর ও জুলুম করে পৃথিবীতে চিরকাল টিকে থাকা যায় না এবং এসব নাফরমানির পরিণতি শুভ হয় না। কাজেই আমাদেরকে অতীত জাতিগুলোর পাশাপাশি তাদের শাসকদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদেরকে নিজেদের জীবন এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে ওইসব দাম্ভিক মানুষের মতো করুণ পরিণতি ভোগ করতে না হয়।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- পবিত্র কুরআন পৃথিবীতে ভ্রমণ করতে এবং অতীত জাতিগুলোর ইতিহাস অধ্যয়ন করে সেসব থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার আহ্বান জানায়।
২- একইসঙ্গে বর্তমান সময়ের ইতিহাস যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মগুলো জানতে পারে সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলো সংরক্ষণেও উৎসাহিত করেছে ইসলাম।
৩- দাম্ভিক ও অহংকারী মানুষদের ক্ষমতা, সম্পদ ও চাকচিক্য যেন আমাদের ধোঁকা দিতে না পারে। এসব মানুষের জীবনের শেষ পরিণতির কথা চিন্তা করলে আমরা তাদের মতো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারব।
৪- আমরা যেন নিজেদের যা কিছু আছে তা নিয়ে অহংকার ও দর্প না করি। কারণ, অতীতে আমাদের চেয়ে শক্তিশালী বহু জাতিকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়েছেন।#