সূরা ফাতির: আয়াত ৪৫ (পর্ব-১৪)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা ফাতিরের ৪৫ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করা হবে। এই আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِمَا كَسَبُوا مَا تَرَكَ عَلَى ظَهْرِهَا مِنْ دَابَّةٍ وَلَكِنْ يُؤَخِّرُهُمْ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِعِبَادِهِ بَصِيرًا (45)
“যদি আল্লাহ মানুষকে তাদের কৃতকর্মের কারণে পাকড়াও করতেন, তবে ভুপৃষ্ঠে চলমান কেউ ছাড়া পেত না। কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত মানুষকে অবকাশ দেন। অতঃপর যখন সে নির্দিষ্ট মেয়াদ এসে যায় (তখন তাদেরকে শাস্তি দেন) সুতরাং, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সব বান্দার দিকে দৃষ্টি রাখেন।” (৩৫:৪৫)
গত আসরে আমরা দাম্ভিক ব্যক্তিদের কূটকৌশল এবং তাদের করুণ পরিণতি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। তারই ধারাবাহিতায় এই আয়াতে বলা হচ্ছে: মহান আল্লাহ অসীম ধৈর্যের মালিক। কেউ গুনাহ করলে বা কোনো অপরাধ করে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে তাকে তিনি শাস্তি দেন না। বরং সব মানুষকে তিনি পার্থিব জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খারাপ কাজ থেকে ফিরে এসে তওবা করার জন্য সুযোগ দেন। বান্দা যাতে অনুতপ্ত হয়ে জাহান্নামের কঠিন আজাব থেকে মুক্তি পেতে পারে সেজন্যই এই অবকাশ দেন আল্লাহ তায়ালা। কিন্তু মানুষ যখন মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং সে মৃত্যুর ফেরেশতাকে দেখতে পায় তারপর আর তার তওবা কবুল হয় না। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষকে সুযোগ দিয়ে মানবজাতির প্রতি নিজের মহানুভবতা ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। সেইসঙ্গে তিনি অপরাধ করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে শাস্তি না দিয়েও তার প্রতি অনেক বড় সদয় আচরণ করেছেন।
তিনি যদি এই পন্থা অবলম্বন না করতেন তাহলে মানুষের গুনাহ করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হতো এবং সে বাধ্য হয়ে পাপের পথ পরিহার করত। আল্লাহ মানুষকে বাধ্যগতভাবে সৎকাজ করা কিংবা অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখতে চাননি। তিনি মানুষকে কর্মের স্বাধীনতা দিয়ে সত্য ও মিথ্যার পথ চিনিয়ে দিয়ে দেখতে চেয়েছেন কে তার ভয়ে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে। তিনি যদি মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দিতেন তাহলে উদাহরণস্বরূপ যদি দেখা যেত মিথ্যা কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বোবা হয়ে যায় তাহলে আর কেউ মিথ্যা বলার সাহস পেত না।
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এমনটি চাননি। বরং তিনি যে বিধান দিয়েছেন তাতে ভালোমন্দের বিচারের জন্য কিয়ামতের দিন নির্ধারিত থাকার কারণে পার্থিব জীবনে যারা মুত্তাকি বা খোদাভীরু তারা নিজেদের প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির জোরে পাপের পথ ত্যাগ করে সৎকর্মশীল হন। অন্যদিকে পরকালের প্রতি যাদের বিশ্বাস নেই বা বিশ্বাসে দুর্বলতা রয়েছে তারা আল্লাহর আনুগত্য করার পরিবর্তে তাদের ইচ্ছা ও খেয়ালখুশির আনুগত্য করে খারাপ কাজে লিপ্ত হন। এই দুই পথের মানুষের কেউই কখনো নিজেকে বাধ্য মনে করেন না।
এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- পার্থিব জীবনের পরিবর্তে আখিরাতে শাস্তির বিধান রাখার অন্যতম কারণ হচ্ছে, পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। যদি পার্থিব জীবনে মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে পাপের শাস্তি দেয়া হতো তাহলে কেউ রেহাই পেত না এবং এক সময় পৃথিবীর বুক থেকে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।
২- আল্লাহ তায়ালা বিশাল ধৈর্যশক্তির অধিকারী। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং মানুষকে বারবার ক্ষমা করে তাকে তওবা করার সুযোগ দেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বারবার সুযোগ পাওয়ার পরও যদি কেউ তওবা না করে পাপের পথে অটল থাকে তাহলে তার পক্ষে এক সময় আর ফিরে আসার সুযোগ থাকে না। পাপকাজে লিপ্ত থাকা অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়।
৩- আমরা যেন কখনো এটা না ভাবি যে, খারাপ কাজ করার পরও যখন শাস্তি হয়নি তখন আল্লাহ তায়ালা হয়ত আমাকে দেখতে পাননি। বিষয়টি মোটেও এমন নয়। তিনি প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের দেখছেন এবং আমাদের প্রতিটি কাজ প্রত্যক্ষ করছেন। আল্লাহ তায়ালা চান আমরা সবাই জান্নাতে যাই। সেজন্যই তিনি আমাদের খারাপ কাজগুলো বারবার উপেক্ষা করে তওবা করার সুযোগ দেন।
তো পাঠক, আজকের এ আয়াতের মধ্য দিয়ে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা ফাতিরের আলোচনা শেষ হলো। #