ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ ১৬:৩৮ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ৫০ থেকে ৬১ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ৫০ থেকে ৫৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ (50) قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ إِنِّي كَانَ لِي قَرِينٌ (51) يَقُولُ أَئِنَّكَ لَمِنَ الْمُصَدِّقِينَ (52) أَئِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَعِظَامًا أَئِنَّا لَمَدِينُونَ (53)

 “অতঃপর তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।” (৩৭:৫০)

“তাদের একজন বলবে, (দুনিয়ার জীবনে) আমার এক সঙ্গী ছিল।” (৩৭:৫১)

“সে বলত, তুমি কি (সত্যি সত্যি কিয়ামতে) বিশ্বাস করো?” (৩৭:৫২)

“আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড়ে পরিণত হব, তখনও কি আমরা (আবার জীবিত হবো এবং) প্রতিফল প্রাপ্ত হব? (৩৭:৫৩)

এই আয়াতগুলোতে পরকালে জান্নাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এই বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন যে, পার্থিব জীবনে এমন অনেক বন্ধু থাকবে যাদের কেউ কেউ কিয়ামতের দিন জান্নাত যাবে এবং বাকিরা যাবে জাহান্নামে। দুনিয়ায় তারা পরস্পরের বন্ধু ছিল বলে পরকালেও বন্ধু হিসেবে থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এখানে আরো বলা হচ্ছে: জান্নাতবাসীরা জান্নাতে বসে দুনিয়ার জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করবেন। প্রত্যেকে অন্যের কাছে তার জীবনের ঘটনাবলী বর্ণনা করবেন। একজন বলবেন, আমার এক বন্ধু ছিল যে মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে বিশ্বাস করত না। সে সব সময় বিস্ময়ের সুরে আমার কাছে জিজ্ঞাসা করত: তুমি সত্যিই এসবে বিশ্বাস করো? তুমি কি মনে করো মৃত্যুর পরে আমাদেরকে দুনিয়ার কাজকর্মের হিসাব দিতে হবে?

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ধর্মহীন ও দুর্বল ঈমানের লোকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে যদি ঈমানদার ব্যক্তির ঈমান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা না থাকে তাহলে ইসলাম সে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেনি। বরং এ ধরনের বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করে তাদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়া যেতে পারে। অন্তত, ধর্ম সম্পর্কে তাদের প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়ে তাদেরকে চিন্তার খোরাক যোগানো যেতে পারে।

২. পরকালে অবিশ্বাসী লোকেরা কোনো প্রমাণ দেখাতে পারে না। তারা বিস্ময় প্রকাশ করে মাত্র।

৩. পরকালে মানুষের স্মৃতি থেকে দুনিয়ার জীবনের ঘটনাবলী মুছে যাবে না বরং সেদিন দুনিয়ার সব কথা তার মনে পড়বে।

সূরা সাফফাতের ৫৪ থেকে ৫৭ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  قَالَ هَلْ أَنْتُمْ مُطَّلِعُونَ (54) فَاطَّلَعَ فَرَآَهُ فِي سَوَاءِ الْجَحِيمِ (55) قَالَ تَاللَّهِ إِنْ كِدْتَ لَتُرْدِينِ (56) وَلَوْلَا نِعْمَةُ رَبِّي لَكُنْتُ مِنَ الْمُحْضَرِينَ (57)  

“(এরপর সে তার জান্নাতি বন্ধুদের বলবে) তোমরা কি তাকে (অর্থাৎ দুনিয়ার সেই বন্ধুর অবস্থা কি তা) উকি দিয়ে দেখতে চাও?” (৩৭:৫৪)

“অতপর সে উকি দিয়ে দেখবে এবং তাকে জাহান্নামের মাঝখানে দেখতে পাবে।” (৩৭:৫৫)

“সে বলবে, আল্লাহর কসম, তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংসই করে দিয়েছিলে।” (৩৭:৫৬)

“এবং আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ না থাকলে (নিশ্চিতভাবে) আমিও (জাহান্নামে) তলব করা ব্যক্তিদের অন্তর্ভূক্ত হতাম।” (৩৭:৫৭)

ওই জান্নাতি ব্যক্তি জান্নাতে বসে গল্প করার সময় বলবেন: পার্থিব জীবনে থাকতে পরকালে বিশ্বাস করার জন্য আমাকে আমার যে বন্ধু ভর্ৎসনা করত সে আজ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আপনাদের যদি ইচ্ছা হয় তাহলে তাকে এখন দেখতে পারেন। অবশ্য আজ তার যে পরিণতি হয়েছে তার সাহচার্যের কারণে আমারও সেই পরিণতি হতে পারত। তার সঙ্গে আমিও আজ জাহান্নামে থাকতে পারতাম। কিন্তু আমার ঈমান ও নেক আমলের জন্য আল্লাহ তায়ালা আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেছেন।

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট আয়াত অনুযায়ী, জান্নাতবাসীরা জাহান্নামবাসীদের সম্পর্কে সবকিছু জানতে পারবেন, এমনকি তাদের সঙ্গে কথাও বলতে পারবেন। কিন্তু জাহান্নামবাসীরা জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে পারবে না।

২. পরকালে অবিশ্বাসী লোকদের সঙ্গে ওঠাবসা নিষেধ না হলেও কাজটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, আল্লাহ তায়ালার বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ না থাকলে ওই খোদাদ্রোহী ব্যক্তি যেকোনো সময় ঈমানদার ব্যক্তিকে জাহান্নামের পথে টেনে নিয়ে যেতে পারে। কাজেই এ ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে।

এই সূরার ৫৮ থেকে ৬১ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

أَفَمَا نَحْنُ بِمَيِّتِينَ (58) إِلَّا مَوْتَتَنَا الْأُولَى وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ (59) إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (60) لِمِثْلِ هَذَا فَلْيَعْمَلِ الْعَامِلُونَ (61)   

“(এরপর সে তার জান্নাতি বন্ধুদের বলবে): এখন কি আমাদের আর মৃত্যু হবে না?” (৩৭:৫৮)

“(দুনিয়াতে) আমাদের প্রথম মৃত্যু ছাড়া (আর আমাদের মৃত্যু হবে না) এবং আমরা কোনোদিন শাস্তি প্রাপ্তও হব না।” (৩৭:৫৯)

“নিশ্চয় এটিই হচ্ছে সেই মহা সাফল্য (যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ দিয়েছিলেন)।” (৩৭:৬০)

“কাজেই, এমন সাফল্যের জন্য পরিশ্রমীদের পরিশ্রম করা উচিত।” (৩৭:৬১)

যিনি জান্নাতে প্রবেশ করেছেন তিনি নিশ্চিতভাবে একথা জানেন যে, তাকে আর জাহান্নামের শাস্তি পেতে হবে না; যদি শাস্তি পেতেই হতো তাহলে জান্নাতে প্রবেশ করানোর আগে সে শাস্তি দেয়া হতো। কিন্তু তারপরও কুরআন মজিদে তার মুখ থেকে এ সম্পর্কে এই প্রশ্ন উল্লেখের দু’টি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, তিনি একথা বারবার স্মরণ করে আল্লাহ তায়ালার শোকরগুজারি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চান। দ্বিতীয়ত, মানুষ যখন চরম সুখের সন্ধান পায় তখন সে তা বারবার বলতে ভালোবাসে। জান্নাত হচ্ছে এমন এক স্থান যেখানে রোগ-বালাই ও বিপদ আপদ বা মৃত্যু আসবে না। সেই পরম সুখের জীবন হবে চিরকালের জন্য।

আলোচ্য চার আয়াতের শেষের আয়াতে জান্নাতবাসীদের মুখ থেকে দুনিয়ার মানুষদের জন্য এই বার্তা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে যে, যারা এখনো দুনিয়ায় বসবাস করছ এবং পরিশ্রম করার সুযোগ আছে তারা যত পারো আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য পরিশ্রম করে নাও।  আখেরাতের পুঁজি সঞ্চয় করার জন্য প্রতি মুহূর্তে তোমার সুযোগ কমে আসছে। টাকা-পয়সা ও ধন-দৌলত শুধুমাত্র দুনিয়ার কাজে আসবে কিন্তু কিয়ামতের বাজারে এসব অর্থসম্পদ কোনো কাজে আসবে না। সেই বাজারে মানুষের একমাত্র পুঁজি হবে নেক আমল। যার নেক আমল যত বেশি হবে কিয়ামতের দিন তার মর্যাদা তত বেশি থাকবে।

এই চার আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১- জান্নাতে কারো মৃত্যু হবে না। কিন্তু জাহান্নামে আজাবের চোটে বারবার পাপী ব্যক্তিদের মৃত্যু হবে এবং বারবার তাদেরকে আবার জীবিত করে শাস্তি শুরু করা হবে।

২- দুনিয়ার চাকচিক্য ও মোহময়ী অসংখ্য ফাঁদের কবল থেকে যে ব্যক্তি নিজেকে রক্ষা করে ঈমান ও নেক আমল সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে পরকালের পরম সুখের জীবন তারই জন্য অপেক্ষা করছে।

৩- পার্থিব জীবনে আমরা যে কাজই করি না কেন পরকালের কথা স্মরণ রেখে করতে হবে। তা না হলে মৃত্যু পরবর্তী জীবনে অনুতাপ ও অনুশোচনা কোনো কাজে আসবে না।#