ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস ( ৮ পর্ব): দুই ইরানি কিশোরের বীরত্বগাঁথা
আমরা ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খোররামশাহরে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরানি তরুণ ও যুবকদের অকুতোভয় সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করছিলাম।
আমরা বলেছি, ন্যুনতম সমরাস্ত্র নিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত ইরাকি বাহিনীর সামনে টানা ৩৪ দিন ‘খোররামশাহরের’ পতন ঠেকিয়ে রাখেন ইরানি যোদ্ধারা। ওই শহর রক্ষার যুদ্ধ একদিকে যেমন বীরত্বগাঁথা তৈরি করেছিল তেমনি সেটি ছিল আট বছরের প্রতিরক্ষা যুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। ওই যুদ্ধ সম্পর্কে বার্তা সংস্থা এপি’র সাংবাদিক অ্যালেক্স আফনাই লিখেছেন, “খোররামশাহরে এমন কোনো বাড়ি পাওয়া যাবে না যেখানে গোলাগুলির আঘাতের চিহ্ন নেই। এখান থেকে বোঝা যায়, ইরানি যোদ্ধারা শহরের ঘরে ঘরে প্রতিরোধের দূর্গ গড়ে তুলেছিলেন। ইরানি যুবক ও তরুণরা খোররামশাহর রক্ষা করতে গিয়ে অকাতরে জীবন দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি।”
এই শহর রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দেয় ১৩ বছর বয়সি ইরানি কিশোর বেহনাম মোহাম্মাদি। ১৯৬৭ সালে এই খোররামশাহরেই তার জন্ম। ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে যখন ইরাকি বাহিনীর শহর আক্রমণের গুঞ্জন শুরু হয় তখন বেহনাম ভাবতেই পারেনি তাদের শহর হামলার শিকার হবে। কিন্তু এক সময় সত্যি সত্যি শহর রক্ষার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বেহনামের বয়সি শিশুদেরকে শহর থেকে সরিয়ে নেয়া হলেও সে যুদ্ধ করবে বলে জোর করে সেখানে থেকে যায়। যুদ্ধাহত ব্যক্তিদের সেবা সুশ্রূষা করার কাজ করতে থাকে সে। সেইসঙ্গে ইরাকি সেনারা কোনদিক থেকে আসছে সে খবর আনার কাজ করে বেহনাম। একবার ইরাকি সেনারা তাকে ধরে ফেলে কিন্তু বয়সে ছোট বলে চড়-থাপ্পড় মেরে তাকে ছেড়ে দেয়।
এদিকে, খোররামশাহরের একাংশের পতনের পর ইরাকি সেনারা ইরানিদের ঘরবাড়ি দখল করে সেখানে অবস্থান নেয়। কোনো কোনো বড় বাড়িকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। বেহনাম নিজের গায়ে কাদা মেখে মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়ায় এবং যে বাড়িতে ইরাকি সেনার সংখ্যা বেশি থাকে সে বাড়ির খবর ইরানি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেয়। প্রতিরোধ যোদ্ধারা তখন দূর থেকে ওই বাড়িতে গোলাবর্ষণ করে সেসব ইরাকি সেনাকে হত্যা করে। মাঝেমধ্যে দু’পক্ষের মধ্যে শহরের বিভিন্ন সড়কে হাতাহাতি লড়াইও হয়। এরকম এক লড়াইয়ের ক্রসফায়ারে পড়ে বুকে ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হয় বেহনাম। ইরানি প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাকে তুলে আনেন চিকিৎসা করানোর জন্য। কিন্তু ডাক্তারের কাছে পৌঁছার আগেই বেহনাম শাহাদাতবরণ করে।
ইরানের প্রতিরোধ যোদ্ধারা রণাঙ্গণে বসেই প্রত্যেকে ওসিয়তনামা লিখে রাখতেন। তাদের দেখাদেখি সেই ছোট্ট কিশোর বেহানামও ওসিয়তনামা লিখে গিয়েছিল। তার ওসিয়তনামার একাংশে লেখা রয়েছে, “আমি প্রতি মুহূর্তে শহীদ হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় আছি। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কাছে আমার আবেদন তারা যেন ইমামকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে না যায়। তারা যেন আল্লাহকে ভুলে না যায় বরং তাঁরই ওপর যেন পরিপূর্ণ নির্ভরতা রাখে। আমি সকাল পিতামাতার প্রতি আহ্বান জানাই তারা যেন তাদের সকল সন্তানকে বীর যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলেন।” বেহনামের এই ওসিয়তনামা থেকে বোঝা যায়, ইরাকি বাহিনীর আগ্রাসনের সময় ইরানকে রক্ষার কাজে যেসব যোদ্ধা অংশ নিয়েছিলেন তাদের সবাই ছিলেন গভীর ঈমানি বলে বলীয়ান। তাদের কাছে পরাজয় বলে কোনো শব্দ ছিল না। হয় জয় অথবা শাহাদাত। এই চেতনার কারণেই তারা ইরাকি বাহিনীর তুলনায় সামান্য অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে দেশ প্রতিরক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ৫৮টি দেশ ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে অর্থ, অস্ত্র, সেনা ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা সত্ত্বেও ঈমানি বলে বলীয়ান ইরানি যোদ্ধারা আট বছরের যুদ্ধ শেষে তাদের এক ইঞ্চি ভূমিও ইরাকের পদতলে রাখতে দেননি।
আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আরেকজন কিশোরের নাম মোহাম্মাদ হোসেইন ফাহমিদে। খোররামশাহর রক্ষার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এই বীর যোদ্ধার বয়সও ছিল মাত্র ১৩ বছর। তবে বেহনাম মোহাম্মাদির জন্ম এই শহরে হলেও মোহাম্মাদ হোসেইন ফাহমিদে খোররামশাহরের অধিবাসী ছিল না। তার জন্ম হয়েছিল ইরানের রাজধানী তেহরানের নিকটবর্তী কোম নগরীতে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর ইমাম খোমেনী (রহ.)’র নির্দেশে বাসিজ বা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠিত হলে মোহাম্মাদ হোসেইন ওই বাহিনীতে যোগ দেয়। পরবর্তীতে যুদ্ধ শুরু হলে সে আগ্রাসী বাহিনীকে রুখে দিতে দক্ষিণ ইরানের খোররামশাহরের ফ্রন্টে চলে যায়। কিন্তু বয়স কম হওয়ার কারণে ফ্রন্টের দায়িত্বে থাকা কমান্ডার মোহাম্মাদ হোসেইনকে ফেরত পাঠিয়ে দেন। তবে দেশরক্ষার নেশায় মত্ত এই কিশোর আবার ফিরে যায় ফ্রন্টে। ইরাকি সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে মোহাম্মাদ হোসেইন তার বন্ধু মোহাম্মাদ রেজা শামসের সঙ্গে একই দুর্গে অবস্থান নেয়। একদিন দু’পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড গোলাগুলিতে শামস আহত হলে মোহাম্মাদ হোসেইন বহু কষ্টে তাকে ঘাঁটিতে নিয়ে আসে।
এরপর আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীকে ট্যাংকসহ এগিয়ে আসতে দেখে কয়েকটি গ্রেনেড নিজের কোমরে বেঁধে ট্যাংকের দিকে এগিয়ে যায়। এ সময় তার পায়ে গুলি লাগে কিন্তু দৃঢ়প্রত্যয়ী মোহাম্মাদ হোসেইন আহত অবস্থায়ই অগ্রসরমান ইরাকি বাহিনীর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। আগ্রাসী বাহিনীর মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণের মধ্যেই সে ট্যাংকের একেবারে কাছে চলে যায় এবং নিজের শরীরে থাকা গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটায়। ফলে ট্যাংক ধ্বংস হয়ে বহু আগ্রাসী সেনা নিহত হয় এবং মোহাম্মাদ হোসেইনের ছোট্ট দেহটিও ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সামনের ট্যাংকটি বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরাকি বাহিনী মনে করে, তারা হয়ত মাইন পেতে রাখা কোনো ভূমিতে এসে পড়েছে। ফলে তারা মাইন থেকে বাঁচতে বাকি ট্যাংকগুলো ফেলে রেখে দৌড়ে পালিয়ে যায়। এভাবে খোররামশাহরের অবরোধ সাময়িকভাবে উঠে যায় এবং ততদিনে সেখানে সাহায্যকারী সেনারা পৌঁছে যায়।
মোহাম্মাদ হোসেইন ফাহমিদের শাহাদাতের পর ইমাম খোমেনী (রহ.) ইসলামি বিপ্লবের দ্বিতীয় বিজয় বার্ষিকীর বাণীতে বলেন, “আমাদের নেতা হচ্ছে ১৩ বছরের ওই শিশু যার ক্ষুদ্র হৃদয়টি শত শত বক্তৃতা ও লেখনীর চেয়ে দামী। সে গ্রেনেড হাতে শত্রুর ট্যাংকের নীচে নিজেকে সঁপে দিয়ে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেছে।” ইমামের এই বাণীর মাধ্যমে মোহাম্মাদ হোসেইন ফাহমিদের আত্মত্যাগ ইরানের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। আজ ইরানের প্রতিটি নাগরিক তাদের ওই কিশোরের আত্মত্যাগের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ২৫