ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (৯পর্ব): খোররামশাহর রক্ষায় একজন ইরানি নারীর অবদান
খোররামশাহর রক্ষার যুদ্ধে নারী-পুরুষ নির্বিশেষ ইরানের সব শ্রেণির মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন।
যে যেভাবে পেরেছেন সেভাবেই খোররামশাহরের পতন ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন। এদের মধ্যে ইরানি নারী ও তরুণীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও অবদানের কথা যেকোনো স্বাধীনচেতা মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবেন। এরকম একজন তরুণী ছিলেন ১৭ বছর বয়সি সাইয়্যেদা জাহরা হোসেইনি। ইরাক-ইরান আট বছরের যুদ্ধের ইতিহাসে যেসব ইরানি যোদ্ধার নাম উজ্জ্বল তারকার মতো জ্বলজ্বল করছে তাদের মধ্যে জাহরা হোসেইনি অন্যতম। যুদ্ধে তার অবদানের কথা স্মরণে রাখার জন্য ‘দা’ নামের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। কুর্দি ভাষায় ‘দা’ শব্দের অর্থ ‘মা’। বইটির লেখিকা সাইয়্যেদা আ’যাম হোসেইনি বইটি তার মাকে উৎসর্গ করেছেন বলে এর নাম দেয়া হয়েছে ‘দা’।
এমন এক তরুণীকে নিয়ে ‘দা’ বইটি লেখা হয়েছে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতায় যার জুড়ি মেলা ভার। জাহরা হোসেইনি নামের এই তরুণীর শৈশব কাটে ইরাকের বসরা শহরের কুর্দি অধ্যুষিত একটি মহল্লায়। সে সময় ইরাকের বাথ সরকার নিজ দেশের জনগণের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালাত। সরকার বিরোধী বলে সন্দেহ হলেই যেকোনো মানুষকে নিরাপত্তা বাহিনী ধরে নিয়ে যেত এবং তার ওপর নির্যাতন চালাত এবং কখনো কখনো হত্যা বা গুম করে ফেলত। জাহরা হোসেইনির বাবাকেও একদিন ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। এ অবস্থায় জাহরার মা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ইরানে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে তার বাবাও ইরাকের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে পালিয়ে ইরানে চলে আসেন। তাদের পরিবার ইরানে আসার কিছুদিনের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। তখন জাহরার বয়স ১৭ বছর। জাহরার বাবা ও ভাই খোররামশাহর রক্ষার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং পাঁচদিনের ব্যবধানে তারা দু’জন শহীদ হয়ে যান। জাহরা তার ১৪ বছর বয়সি ছোট বোন লায়লাকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
শহীদদের লাশ সংগ্রহ, যুদ্ধাহতদের চিকিৎসায় সহযোগিতা করা এবং শহীদ নারীদের লাশ গোসল করানো ছিল তাদের প্রধান কাজ। খোররামশাহর জামে মসজিদে স্থাপিত অস্থায়ী হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের সেবায়ও নিজেকে নিয়োজিত করেন জাহরা হোসেইনি। কখনো কখনো ফ্রন্টের যোদ্ধাদের কাছে খাবার ও যুদ্ধাস্ত্র পৌঁছে দেয়ারও দায়িত্ব পড়ে তার ওপর।
এরকম কর্মব্যস্ত অবস্থায় যুদ্ধের ভয়াবহ এক দিনে পিতাকে হারান জাহরা। পিতার মৃতদেহ দেখার মুহূর্তটি কেমন ছিল তা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন: “খোররামশাহরের করবস্থানের পাশেই শহীদ নারী ও পুরুষের লাশ গোসল করানোর জন্য আলাদা আলাদা বিশাল কক্ষ ছিল। আমি নারীদের কক্ষে কাজ শেষ করে সবেমাত্র বের হয়েছি। হঠাৎ দেখি একটু দূরে মধ্যবয়সী এক নারী মাটিতে বসে বিলাপ করছেন এবং মাঝেমধ্যেই মাটিতে গড়াগড়ি ও দাপাদাপি করছেন। কয়েকটি শিশু তার চারপাশে দাঁড়িয়ে তার এই বিলাপের দৃশ্য দেখছে।”
জাহরা হোসেইনি আরো বলেন, “ওই নারীর বিলাপের ধ্বনি আমার কাছে পরিচিত মনে হয়। ভয়ে আমি শিউরে উঠি। ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে যাই। যে নারী তার স্বজন হারানোর বেদনায় বুক ফাটানো চিৎকার দিয়ে বিলাপ করছিলেন তিনি ছিলেন ‘দা’, আমার মা। এমন দৃশ্যে নিজের মাকে দেখব একথা আমি কখনো কল্পনাও করিনি। আমি তখনো বুঝতে পারিনি কি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেছে। হে আল্লাহ! আমার মা এমন করে বিলাপ করছে কেন? হঠাৎ দেখি, উপস্থিত শিশুগুলো মাকে ফেলে একযোগে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তখনই আমি বুঝতে পারি এমন কোনো শোকে ‘দা’ কাঁদছে যে শোকের ভাগিদার আমিও। ততক্ষণে মাও আমাকে দেখে ফেলেছেন। আমাকে দেখে তার কান্নার রোল আরো বেড়ে যায়।
জাহরা আরো বলেন, “মা মাটি থেকে উঠে আমার দিকে দৌঁড়ে আসতে গিয়ে আবার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার শরীর ও মুখে এত বেশি মাটি ও ধুলোবালি লেগেছিল যে, কণ্ঠ না শুনলে তাকে চেনাই যেত না। মাকে পড়ে যেতে দেখে দৌড়ে গিয়ে তাকে মাটি থেকে তুলে ধরি। এবার তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে হৃদয় ভেঙে যাওয়া খবর: “শুনেছিস মা! তোর বাবা শহীদ হয়ে গেছেন। ওই দেখ তোর বাবার লাশ। ”
জাহরা হোসেইনি এরপর পিতার লাশের মুখোমুখি হওয়ার কথা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: “বাবার মরদেহের যত কাছে যাচ্ছিলাম ততই আমার শরীর কেঁপে উঠছিল। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। হঠাৎ মনে হলো, আমার চারদিক নিকষকালো অন্ধকারে ছেয়ে গেছে এবং আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। বুকের ধড়ফড়ানি আরো বেড়ে যায়। মনে হচ্ছিল আমি কোনো অন্ধকার কূয়ার মধ্যে পড়ে গিয়ে হাত-পা ছুঁড়ছি। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। একটি চিৎকার দিয়ে কাফনে মোড়ানো বাবার নিস্তেজ দেহ থেকে মাথাটি তুলে বুকের সঙ্গে চেপে ধরি। ডাকতে থাকি: বাবা, বাবা, আমার লক্ষ্মী বাবা শেষবারের মতো আমাকে কিছু বলে যাও। বাবা দেখো, মা তোমার শোকে কেমন পাগলপ্রায় হয়ে গেছে।”
ইরানের এই নারী যোদ্ধা আরো বলেন, “আমার চোখের পানিতে বাবার কাফনের কাপড় ভিজে যাচ্ছিল। আমি ঠিকমতো কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। বুক থেকে নামিয়ে দেখি, ইরাকি বাহিনীর গুলিতে বাবার মুখে একপাশ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ”
এই ঘটনার শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এর পাঁচদিন পর জাহরার ভাই আলীও খোররামশাহর রক্ষার যুদ্ধে শহীদ হয়। ভাইয়ের মরদেহের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে জাহরা বলেন: “বাবার মতোই ভাইয়ের লাশ জড়িয়ে ধরেছিলাম। আলী মাথার চুলে হাত বুলাচ্ছিলাম। শরীর থেকে ধুলোবালি পরিস্কার করে দিচ্ছিলাম একজন মা যেমন করে তার শিশু সন্তানকে পরিচ্ছন্ন করেন ঠিক সেভাবে। তার ক্ষতস্থান থেকে তখনো রক্ত ঝরছিল। সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম গুলিতে ঝাঝড়া হয়ে গিয়েছিল। এটি ছিল সেই পোশাক যা প্রথমদিন পরার পর আমরা সবাই বিস্ময়ভরা চোখে আলীর দিকে তাকিয়েছিলাম। কেন যেন সেদিনই আমার মাথায় আলীর শাহাদাতের চিন্তাটি এসেছিল।”
ভাইয়ের লাশ দাফন করে ফেরার পথে ইরাকি বাহিনীর নিক্ষিপ্ত গোলার আঘাতে আহত হন জাহরা হোসেইনি। তাকে আহত অবস্থায় ইরানের শিরাজ শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাহরা ইরাকি বাহিনীর হাতে খোররামশাহরের পতনের খবর শুনতে পান। না, জাহরা হোসেইনি নিজে যুদ্ধে শহীদ হননি। যুদ্ধাহত এই নারী এখনো বেঁচে আছেন খোররামশাহর রক্ষার বীরত্বগাঁথার সেই স্মৃতি বুকে ধারণ করে।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ২৫