ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (১৬ পর্ব): ইরানের সুসাংগের্দ শহর দখলমুক্ত করার ঘটনা
গত আসরে আমরা ইরানে গেরিলা যুদ্ধের কমান্ড সেন্টার স্থাপন সম্পর্কে কথা বলেছি এবং এ ব্যাপারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর স্মৃতিচারণও শুনেছি।
আজকের আসরে আমরা গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে আগ্রাসী বাহিনীর হাত থেকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সুসাংগের্দ শহর দখলমুক্ত করার ঘটনা বর্ণনা করব।
গত কয়েকটি আসরে আমরা শহীদ ড. মোস্তফা চামরানের পক্ষ থেকে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীকে রুখে দেয়ার পাশাপাশি ইরানের কুর্দিস্তান এলাকার বিপ্লব বিরোধী তৎপরতা দমন করার জন্য গেরিলা বাহিনী গঠন সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি, একটি আগ্রাসী বাহিনীকে রুখে দেয়ার জন্য দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে যে ঐক্যবদ্ধ ও সংহত অবস্থান থাকা প্রয়োজন নানা কারণে ইরানে তা ছিল না। ইসলামি বিপ্লবের মাত্র ১৯ মাসের মাথায় ইরাকের সাদ্দাম সরকার ইরানে আগ্রাসন চালিয়েছিল। তখনও ইরানের অনেক শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা দেশ ও ইসলামি বিপ্লবের ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেননি। ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানে যে বিপ্লব হয়েছিল তার ভিত্তি ছিল ইসলামি মূল্যবোধ। কিন্তু বিপ্লবের পর নয়া ইসলামি শাসনব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষ এমনকি ইসলাম বিদ্বেষী অনেক রাজনৈতিক নেতাও বিপ্লবীদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছিল।
এ ধরনের একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রথম প্রেসিডেন্ট বনি সদর। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী পদে এরকম দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তির উপস্থিতির ফলে বিদেশি আগ্রাসনের মোকাবিলায় ইরানের পক্ষ থেকে শক্ত কোনো অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। পক্ষান্তরে শহীদ মোস্তফা চামরানের মতো বিপ্লবের প্রতি অনুগত ব্যক্তিত্ব এসব মতপার্থক্যের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে আগ্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মনযোগী হন। তিনি সারা ইরান থেকে যুদ্ধ করার জন্য খুজিস্তান প্রদেশে আগত যুবকদের সংগঠিত করে তাদেরকে গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি ও সেনাবাহিনীর সম্মুখ সমরের পাশাপাশি এই গেরিলা বাহিনী গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল খুজিস্তান প্রদেশের প্রধান শহর আহওয়াজের পতন ঠেকানো এবং ইরাক সীমান্তবর্তী যেসব ছোট ছোট শহর ইরাকি বাহিনী দখল করে নিয়েছিল সেগুলো শত্রুমুক্ত করা।
আমরা এর আগে খোররামশাহরে ইরানি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অকুতোভয় সংগ্রামের কাহিনী বর্ণনা করেছি। এই শহর ছাড়া আরো দু’টি শহরে ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই বীরত্বগাঁথা তৈরি করেছিলেন ইরানি জওয়ানরা। ওই দু’টি শহর ছিল যথাক্রমে সুসাংগের্দ ও হোভেইজে। সুসাংগের্দ মুক্ত করার লড়াইয়ে শহীদ মোস্তফা চামরান এবং হোভেইজে শহরের পতন ঠেকানোর ঘটনায় শহীদ হোসেইন আলাম আল-হুদা’র অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শহীদ চামরান একদিকে গেরিলা বাহিনীকে ব্যবহার করে ইরাকি বাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখে দিচ্ছিলেন এবং অন্যদিকে ছোট ছোট শহর শত্রুমুক্ত করে ইরানের সেনাবাহিনীকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এরকম পরিস্থিতিতে সুসাংগের্দ শহর মুক্ত করা ছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। সাদ্দাম বাহিনী ইরানে আগ্রাসন চালানোর প্রায় দু’মাস পর ১৯৮০ সালের ১৭ নভেম্বর ওই শহর মুক্ত করার অভিযান শুরু হয়।
এ সম্পর্কে ড. চামরান তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “আমাদের অভিযান শুরু হয়ে যায়। সুসাংগের্দ শহরে আটকে পড়া বন্ধুদের দেখার জন্য আমার মন আকুল হয়ে উঠেছিল। ইরাকি বাহিনীর দখলে থাকা শহরে তারা যে কি দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে রয়েছেন তা ভেবে আমার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। আমার মনে পড়ে সুসাংগের্দ শহরের ভেতরে লড়াইরত সেনা সদস্যদের কথা। লেফটেন্যান্ট ফারাজি ও লেফনেন্যান্ট আখাভান সেখানে জীবন বাজি রেখে লড়াই করছেন। তারা দু’জন আহত অবস্থায় আমার সঙ্গে বেতার সংযোগের মাধ্যমে কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, তিন দিন ধরে তাদের ভাগ্যে খাবার জোটেনি।”
ড. চামরান আরো বলেন: “আমরা তিন দিক দিয়ে সুসাংগের্দ মুক্ত করার অভিযান শুরু করি। সেনাবাহিনী, আইআরজিসি এবং গেরিলা বাহিনী আলাদা আলাদাভাবে তিন দিক দিয়ে শহরের দিকে এগিয়ে যায়। আমি আমার বাহিনীসহ সবার আগে শহরে ঢুকে পড়ার সংকল্প করি। ফলে আমরা গতি বাড়িয়ে দেই। হঠাৎ টের পাই শহরের উত্তর দিকে কারখে নদীর দিক থেকে একটি ট্যাংক আমাদের লক্ষ্য করে গোলা নিক্ষেপ করছে। এ অবস্থায় আমি আমার সহযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দেই। একজন যোদ্ধাকে একটি আরপিজি দিয়ে ট্যাংক ধ্বংস করতে পাঠিয়ে দেই। টের পাই, ট্যাংকটি কিছুক্ষণের জন্য তার গতি কমিয়ে দিয়েছে। হয়তো বুঝতে পেরেছে শহরে ইরানি সৈন্য ঢুকে পড়েছে। হঠাৎ করে ট্যাংকটি তার গতি পরিবর্তন করে দ্রুততার সঙ্গে শহরের দক্ষিণ অভিমুখে চলে যায়। আমরা আরপিজি নিয়ে যাকে পাঠিয়েছিলাম সে ট্যাংকে আঘাত করার সময়ই পায়নি।
উচ্চপদস্থ কমান্ডার ফাল্লাহির কাছে শহীদ চামরান যুদ্ধ করার অনেক অস্ত্র ও গোলাবারুদ চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি একটি ১০৬ এমএম বন্দুক ছাড়া আর কিছু দিতে পারেননি। চামরানের গেরিলা বাহিনী সেই বন্দুক দিয়ে ইরাকি বাহিনীর ছয়টি ট্যাংকে হামলা চালায়। শহীদ চামরানের গেরিলা বাহিনীর কাছে ট্যাংক ধ্বংস করার জন্য কিছু আরপিজি ক্ষেপণাস্ত্রও ছিল। এ অবস্থায় ইরানি যোদ্ধারা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে শত্রুর ওপর হামলা চালাচ্ছিল। এই সম্মুখ যুদ্ধে ড. চামরান আহত হন। কৌতুকপ্রিয় এই সমরবিদ আহত অবস্থায়ও তার রসবোধ হারাননি। তিনি এ সময় তার পায়ের সঙ্গে কথা বলেন। “হে আমার প্রিয় পা, তুমি তো সারাজীবন আমার দেহটাকে বহন করেছো। পাহাড়, পর্বত, মরুভূমি সমতলভূমি, সড়ক-মহাসড়ক কত জায়গাই না মাড়িয়ে আমাকে টেনে নিয়ে গেছো। এখন আমার এই অন্তিম মুহূর্তে আমাকে অক্ষম করে রেখো না। আমার এই আহত দেহটাকে আগের মতোই টেনে নিয়ে যাও, যুদ্ধের ময়দানে আমাকে শত্রুর সামনে অপমানিত করো না।”
এই হাতাহাতি যুদ্ধ শেষে ইরাকি বাহিনী পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। ইরাকিরা পিছু হটে যাওয়ার পর ড. চামরানের অবস্থার অবনতি হয়। ইরাকিদের কাছ থেকে গনিমত হিসেবে পাওয়া একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ফ্রন্ট থেকে পেছনে নিয়ে আসা হয়। ইরানি যোদ্ধারা সুসাংগের্দ শহরে প্রবেশ করেন এবং শহরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দেন। এতদিন ধরে আটকে পড়া সৈন্যদের তখন বাঁধভাঙা উচ্ছাস। শহরটি প্রায় দু’মাস পর আগ্রাসী বাহিনীর হাত থেকে দখলমুক্ত হয়। ড. চামরান মনে করেন সেনাবাহিনী, আইআরজিসি ও গেরিলা বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করার কারণেই সুসাংগের্দ শহরটি শত্রুমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এর যেকোনো একটি বাহিনীর একার পক্ষে এই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব ছিল না। প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে আনাড়ি গণবাহিনীর সমন্বয়েও যে যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের বিজয় অর্জন সম্ভব তা এই যুদ্ধে প্রমাণিত হয়।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ২২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।