জুলাই ২৬, ২০২০ ১৫:৩২ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদ নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। পবিত্র কুরআনের ৩৮তম এই সূরায় ৮৮টি আয়াত রয়েছে। আজকের পর্বে ১ থেকে ৪ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। প্রথমেই এ সূরার এক ও দুই নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

ص وَالْقُرْآَنِ ذِي الذِّكْرِ (1) بَلِ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي عِزَّةٍ وَشِقَاقٍ (2)

“সোয়াদ। শপথ উপদেশপূর্ণ কোরআনের,” (৩৮:১)

“বরং যারা কাফের, তারা অহংকার ও বিরোধিতায় লিপ্ত।” (৩৮:২)

পবিত্র কুরআনের আরো ২৮টি সূরার মতো এই সূরাটিও হুরুফে মুকাত্তায়াত দিয়ে শুরু হয়েছে। এর আগে আমরা সূরা বাকারার প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছি, সাধারণভাবে মুকাত্তায়াত হুরুফের পরে পবিত্র কুরআনের বিশালত্ব বর্ণনা করা হয়। কারণ, সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিতি এই ‘আলিফ-বা’ অক্ষরগুলোর সমন্বয়ে পবিত্র কুরআন লিপিবদ্ধ হয়েছে। অথচ এই কুরআন আল্লাহ তায়ালার এমন এক অলৌকিক নিদর্শন যার একটি আয়াতের সমকক্ষ আয়াত রচনা করা কোনো মানুষের পক্ষ এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না।

এই সূরায়ও ‘সোয়াদ’ অক্ষরটি বর্ণনা করার পর পবিত্র কুরআনের পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে বলা হচ্ছে: এই কুরআনের আগাগোড়া পুরোটাই মানুষের জন্য উপদেশবাণীতে পূর্ণ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আল্লাহ তায়ালার দেয়া সহজাত প্রবৃত্তি ও বিবেক-বুদ্ধির মাধ্যমে মানুষ নিজে থেকেই অনেক কিছু জানতে, বুঝতে ও উপলব্ধি করতে সক্ষম। কিন্তু উদাসিনতা, ঋপুর তাড়না, কুপ্রবৃত্তির লালসা এবং বাইরে থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণার কারণে মানুষ নিজস্ব সেই উপলব্ধি ক্ষমতাকে ভুলে গিয়ে পাপের পথে ধাবিত হয়। তবে মানুষ কুরআনে তেলাওয়াত করলে এবং এর আয়াতগুলোর গভীর অর্থের দিকে মনোনিবেশ করলে সে উদাসিনতার অন্ধকার থেকে বের হয়ে সঠিক পথের দিশা পাওয়া সম্ভব।

এ ছাড়া, কুরআনের সংস্পর্শে না আসলে পরকাল ও কিয়ামতের মতো যে বিষয়গুলোর প্রতি মানুষ ঈমান এনেছিল তাও এক সময় সে ভুলে যেতে পারে। এ কারণে পবিত্র কুরআনের বিশাল অংশ জুড়ে পরকালে সংঘটিত হতে যাওয়া ঘটনাগুলো বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে মানুষকে উদাসীনতার অন্ধকার থেকে মুক্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১- আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কুরআনের শপথের মাধ্যমে এই মহাগ্রন্থের বিশালত্ব ও গভীরতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

২- পবিত্র কুরআন মানুষের সুপ্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি ভুলে যাওয়া মহাসত্যকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।

৩- কুরআন মানুষকে উপদেশ ও সঠিক পথের দিশা দিতে এসেছে। কিন্তু কিছু মানুষ ঔদ্ধত্ব ও অহংকারের কারণে এই মহাগ্রন্থের উপদেশবাণী প্রত্যাখ্যান করে।

এবারে সূরা সোয়াদের ৩ ও ৪ নম্বর আয়াতের দিকে দৃষ্টি দেব। এই দুই আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেছেন:

كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِنْ قَرْنٍ فَنَادَوْا وَلَاتَ حِينَ مَنَاصٍ (3) وَعَجِبُوا أَنْ جَاءَهُمْ مُنْذِرٌ مِنْهُمْ وَقَالَ الْكَافِرُونَ هَذَا سَاحِرٌ كَذَّابٌ (4)

“তাদের আগে আমি কত জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছি, অতঃপর তারা (সাহায্য চেয়ে) আর্তনাদ করতে শুরু করেছিল কিন্তু তাদের নিষ্কৃতি লাভের সময় ছিল না।” (৩৮:২)

“এবং তাদেরই মধ্যে থেকে তাদের কাছে একজন সতর্ককারী আগমন করেছেন বলে তারা বিস্ময়বোধ করে এবং কাফেররা বলে এ-তো এক মিথ্যাচারী যাদুকর।” (৩৮:৩)

মক্কার কাফেরদের উদ্দেশ করে এই আয়াতগুলো বর্ণিত হয়েছে। তাদেরকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলা হচ্ছে, তোমরা ধন-সম্পদ ও বংশমর্যাদার কারণে অহংকার ও উদ্ধত আচরণ করো না। কারণ, তোমাদের আগে  আরো বহু জাতি গত হয়ে গেছে যারা তাদের কুফর ও শিরকের কারণে আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়েছিল এবং বেঁচে থাকার জন্য তাদের আর্তচিৎকার কোনো কাজে আসেনি। পরের আয়াতে বলা হচ্ছে, কিন্তু যখন আল্লাহর নবী তাদের সামনে কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করে তাদেরকে সতর্ক করেন তখন তারা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর পরিণতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সত্য মেনে নেয়ার পরিবর্তে উল্টো আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যাবাদী ও যাদুকর বলে আখ্যায়িত করে।

হাদিসে এসেছে, মক্কার কুরাইশ অধিপতিরা বিশ্বনবী (সা.)’র চাচা আবু তালিবের কাছে গিয়ে বলে: তোমার ভাতিজা আমাদের সন্তানদেরকে আমাদের বাপ-দাদার ধর্ম থেকে পথভ্রষ্ট করছে। এমনকি সে আমাদের দেবতাগুলোকে প্রত্যাখ্যান করছে। সে যদি সম্পদ বা সুখ্যাতি অর্জন করতে চায় তাহলে তাকে আমরা কুরাইশ বংশের সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তিতে পরিণত করে দেব। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, সে যেসব নতুন নতুন কথা বলছে সেগুলো বলা বন্ধ করতে হবে। আবু তালিব মুশরিক নেতাদের এ বক্তব্য নিজের ভাতিজা বিশ্বনবী (সা.)’র কাছে পৌঁছে দিলে আল্লাহর রাসূল বলেন: ওরা যদি আমার ডান হাতে সূর্যকে এবং বাম হাতে চাঁদকেও তুলে দিতে সক্ষম হয় তাহলেও আমি আমার দাওয়াতের কাজ বন্ধ করব না। আমি হয় আল্লাহ প্রদত্ত এ বক্তব্যগুলো সমাজে প্রতিষ্ঠা করব অথবা শহীদ হয়ে যাব। চাচা আবু তালিব যখন ভাতিজার দৃঢ় প্রত্যয় দেখলেন তখন তিনি আর তাকে কাফেরদের কথা মেনে নিতে বাধ্য করলেন না। বরং তিনি বিশ্বনবী (সা.)কে বললেন: তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যাও। আমি তোমাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেব এবং তোমার কোনো ক্ষতি হতে দেব না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- গোঁয়ার্তুমি ও অহংকারের কারণে যদি মানুষ কুফর ও শিরকের পথে অটল থাকে তাহলে পার্থিব জীবনেই তাকে চরম পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়।

২- আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসূলগণকে আমাদের মতো মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এর ফলে নবী-রাসূলগণ মানুষের যেসব প্রয়োজন ও সহজাত প্রবৃত্তি রয়েছে সেগুলো তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা অবস্থায়ই মানুষের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ স্থাপন করে গেছেন।

৩- কেউ আল্লাহ তায়ালার ক্রোধের শিকার হলে তার আর কোনো আশ্রয়স্থল থাকে না। তবে কেউ অনুশোচনা করে আল্লাহর কাছে তওবা করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন কিন্তু শর্ত হচ্ছে আজাব বা মৃত্যু আসার আগেই ক্ষমা চাইতে হবে। মৃত্যু বা আজাবকে প্রত্যক্ষ করার পর তওবা করলে তা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে না।

৪- নবী-রাসূল ও ঈমানদার ব্যক্তিদের প্রতিহত করার জন্য কাফেরদের বহুল ব্যবহৃত পন্থাটি হলো অপমান করা ও মিথ্যা অপবাদ দেয়া। কাফেররা অতীতে যখন নবী-রাসূলদেরকে মিথ্যাবাদী ও যাদুকর অপবাদ দিতে ছাড়েনি তখন বর্তমানেও ঈমানদার মানুষকে বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের অপবাদ ও অপমানজনক কথা শোনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং এ ধরনের পরিস্থিততে পড়লে ধৈর্যচ্যুতি ঘটানো যাবে না।#