আগস্ট ২১, ২০২০ ১৬:১৪ Asia/Dhaka

রংধনুর আজকের আসরের শুরুতেই রয়েছে এক কবুতর দম্পতির গল্প। গল্পের পর থাকবে কবুতর সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য। আর সবশেষে রয়েছে ভারতের এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন সহকর্মী আশরাফুর রহমান। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।

একটি খামারে একজোড়া কবুতর পরম আনন্দে বাস করত। তখন ছিল বসন্তকাল। জানোই তো বসন্তে মাঝে মাঝে বৃষ্টিপাতও হয়। এরকম একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। তুমুল বৃষ্টি। পুরুষ কবুতরটি তখন তার স্ত্রীকে বলল: আমাদের বাসাটা তো ভিজে গেল। এখানে তো আর বাস করার মতো অবস্থা নেই।

স্ত্রী কবুতরটি জবাব দিল: দেখ! আর তো মাত্র কটা দিন। তারপরই তো গ্রীষ্মকাল আসবে। তখন গরম পড়বে। তাই বলছিলাম কী..এখুনি না গেলে হয় না! ভেবে দেখ! তুমি কতো কষ্ট করে এই বাসাটা বানিয়েছ! দেখ না, কত বড়সড় বাসা। খাবার জমিয়ে রাখার জন্যে গুদামের মতো ছোট্ট আরেকটি ঘরও বানিয়েছ। এক্ষুণি যদি এখান থেকে চলে যাও এরকম আরেকটি বাসা কি বানাতে পারবে?

পুরুষ কবুতরটি তার স্ত্রীর কথায় একটু চিন্তা করল। কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে বলল: তুমি মন্দ বলনি! ঠিক আছে। তাহলে নাইবা গেলাম।

এই সিদ্ধান্তের পর কবুতর জুটি তাদের সেই আগের বাসাতেই থেকে গেল গ্রীষ্মকাল আসা পর্যন্ত। গ্রীষ্মকাল যখন এল সূর্যতাপে তাদের বাসাটা একেবারে শুকিয়ে গেল। ফলে তারা আবারো আগের মতো সুখে শান্তিতে এই খামারের বাসাতেই বাস করতে লাগল।

কবুতর জুটি ছিল বেশ দূরদর্শী। ক্ষেত খামারে তো আর ফসলের অভাব ছিল না। তারা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার খেত। সেইসাথে ভবিষ্যতের চিন্তা করে কিছু ধান, চাল, যব, ভুট্টা বা গমের মতো দানাদার খাবার জমিয়ে রাখত। বিশেষ করে শীতকালে তো এগুলোর চাষ কম হয় বা হয় না বললেই চলে। তখন এই জমানো খাবার খেয়ে জীবন বাঁচাতে হয়।

তো এভাবে জমাতে জমাতে একদিন তারা দেখল যে, জমানোর জায়গাটা পূর্ণ হয়ে গেছে অর্থাৎ সেখানে আর খাবার রাখার মতো অবস্থা নেই। গুদামভর্তি খাবার দেখে কবুতর দম্পতি খুশি হয়ে গেল। একজন আরেকজনের দিকে দিকে তাকিয়ে আনন্দের প্রকাশ ঘটাল। তারপর বলল: এখন তো গুদাম ভর্তি খাবারের মজুদ আছে। সুতরাং আসছে শীতেও না খেয়ে মরতে হবে না, বেঁচে থাকতে পারব।

এই বলে তারা গুদামের দরজা বন্ধ করে দিল। গ্রীষ্মকাল যতদিন ছিল ওই গুদামের দরজা আর খুলল না। প্রয়োজনই পড়েনি খোলার। পুরুষ কবুতরটা দূর দূরান্তে উড়ে উড়ে গিয়ে খাবার খেত এবং স্ত্রীর জন্যও নিয়ে আসত। স্ত্রী কবুতরটি খুব বেশি উড়তে পার না বলেই পুরুষ কবুতরটি একা গিয়ে খাবার নিয়ে আসত। নারী পাখিটি বাসাতেই শুয়ে বসে থাকত, বিশ্রাম নিত। এভাবে দিন যেতে যেতে গ্রীষ্মকালও শেষের দিকে এসে গেল।

গ্রীষ্ম ঋতু শেষ হয়ে এলে ক্ষেতে আর শস্যদানা দেখতে পাওয়া গেল না। শরৎ ঋতুতে বৃষ্টিপাতের সূত্রপাত হয়। ওই বৃষ্টি ভেদ করে কবুতর দম্পতি আর খামারে গিয়ে খাদ্যশস্য কুড়োতে গেল না। যাবেই বা কেন, তাদের তো খাবারের মজুদ আছেই। বৃষ্টি উপেক্ষা করে খাবারের সন্ধানে না গিয়ে বাসায় থাকতে থাকতে যখন খিদে লাগল পুরুষ কবুতরটি তখন গেল জমানো শস্য ভাণ্ডারের দরজা খুলতে। দরজা খুলে তো কবুতর হতবাক হয়ে গেল। পুরো একটা গুদাম ভর্তি শস্যদানা রাখা হয়েছিল এখন দেখা যাচ্ছে অর্ধেক নেই। শস্যদানা না দেখে বিরক্ত হলো তার স্ত্রীর ওপর। তার সঙ্গীর কাছে তাড়াতাড়ি করে এসে জিজ্ঞেস করল: আজব এক খাই খাই স্বভাব তোমার। ভবিষ্যতের কোনো চিন্তা নেই। আমরা এই শস্যদানাগুলো তো শীতকালের জন্যে জমিয়েছিলাম। অথচ তুমি কিনা....

আমি কিনা কী...? জিজ্ঞেস করল স্ত্রী কবুতর।

কবুতর বলল: কী করনি তুমি! মাত্র ক'টা দিন আমি বাসায় ছিলাম না। তোমার জন্য খাবার আনতে দূর দূরান্তে গিয়েছি। আর তুমি এই ক'টা দিনে গুদামের অর্ধেক খাবার খেয়ে শেষ করে দিলে? একবারও তোমার শীতকালের কথাটা মনে পড়েনি। মনে পড়েনি যখন বরফে ঢেকে যাবে চারদিক তখন কোত্থেকে খাবার কুড়াবে? খাবার পেয়ে সব ভুলে গেলে?

স্ত্রী কবুতর ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলল: “আমি গুদামের খাবার খাইনি এবং জানি না গুদামের অর্ধেক খাদ্যশস্য কোথায় গেল, কেন অর্ধেক গুদাম খালি হয়ে গেল, কিছুই জানি না।”

এই বলে সে নিজেও গুদামের দিকে গেল এবং অর্ধেক গুদাম খালি দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। বিরক্তির সাথে বলল: শপথ করে বলছি যেদিন আমরা এই গুদামটা শস্যদানা দিয়ে ভর্তি করে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম, তারপর থেকে এই গুদামের শস্য খাওয়া তো দূরের কথা এদিকে একবার ফিরেও তাকাইনি। খাবই বা কীভাবে? কিন্তু ভীষণ অবাক লাগছে আমার কাছে গুদাম ভর্তি শস্যদানা কী করে এরকম কমে গেল!

একটু থেকে স্ত্রী কবুতর আবার বলল: শোন! উদ্বিগ্ন হয়ো না, টেনশন কর না। বিরক্ত হয়ে লাভ নেই। আমাকেও খামোখা দোষ দেয়ার কোনো মানে হয় না। তারচে বরং ধৈর্য ধর। অপেক্ষা কর। গুদামে এখন যে খাবারগুলো অবশিষ্ট আছে সেগুলো আমরা খাব। এমনও তো হতে পারে গুদামের মেঝেটা মাটির ভেতর দেবে গেছে। কিংবা ইঁদুরেরা গুদামের খোঁজ পেয়ে ধীরে ধীরে খেয়ে এই অবস্থা করেছে। এমনও তো হতে পারে অন্য কেউ আমাদের গুদামের অর্ধেক শস্য চুরি করে নিয়ে গেছে। হতে পারে, যে কোনোটাই হতে পারে। তাই এতো তাড়াহুড়া করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার মানে হয় না। হুট করেই আমার ওপর দোষ চাপিয়ে দিও না। শান্ত হও! ধৈর্য ধরো! দেখব সত্য ঘটনাটা বেরিয়ে আসবে।

পুরুষ কবুতরটা বিরক্তির সাথে বলল: হয়েছে! অনেক বকেছ তুমি। এবার একটু থাম! তোমার কথায় কান দেয়ার কোনো মানে হয় না। আর তুমি আমাকে উপদেশ দিতে এস না। তুমি পুরোপুরি নিশ্চিত এখানে তুমি ছাড়া আর কেউ আসে নি। কেউ যদি এসেও থাকে তাহলে তুমি ভালো করেই জানো- কে এসেছিল। তুমি যদি নাই খেয়ে থাকো তাহলে তোমার উচিত সত্য করে বলা। আমি অপেক্ষা করতে পারব না এবং তোমার যা খুশি তাই করবে- এটা আমি সহ্য করব না। তুমি যদি কিছু জেনেই থাকো কিংবা যদি চাও এখন না বলে পরে বলবে, তাহলে তোমার উচিত এক্ষুণি বলে ফেলা।

বেচারা নারী কবুতরটি তো আসলেই জানত না কেন গুদামের খাদ্যশস্য এভাবে কমে গেল। নিরুপায় হয়ে তাই কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল: আমি গুদামের খাবারে হাত দেইনি, কী হয়েছে কিছুই জানি না আমি। তুমি অপেক্ষা করো। অন্তত কেন খাদ্যশস্য কমে গেল সেটা প্রমাণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো।

কিন্তু পুরুষ কবুতরটি কিছুতেই তার স্ত্রীর কথা মানল না। উল্টো বরং আরো রেগে গিয়ে স্ত্রী কবুতরটিকে বাসা থেকে বের করে দিল।

নারী কবুতরটি বলল: রাগের মাথায় এতো দ্রুত আমাকে দোষারোপ করাটা তোমার উচিত হয়নি। উচিত হয়নি আমাকে না জেনে অভিযুক্ত করা। তুমি যা করেছ তার জন্যে তোমাকে দ্রুতই পস্তাতে হবে দেখ! তখন হয়ত অনেক দেরিও হয়ে যেতে পারে।

এই বলে সে খামারের উদ্দেশ্যে উড়াল দিল এবং সেখানে এক শিকারির ফাঁদে আটকা পড়ে গেল। এদিকে, পুরুষ কবুতরটি একা একা তার বাসায় বাস করতে লাগল। মনে মনে সে খুশি এজন্যে যে, তার স্ত্রী তাকে ধোঁকা দিতে পারেনি।

কিছুদিন পরই আবহাওয়া আবারো পরিবর্তিত হয়ে গেল। বৃষ্টিপাত শুরু হলো। আর্দ্রতা বাড়ল। গুদামের শস্যগুলো ওই আবহাওয়ায় ফুলে উঠতে শুরু করল এবং খাদ্য গুদাম আবারো সেই প্রাথমিক অবস্থায় ফিরে গেল। পূর্ণ হয়ে গেল গুদাম। কবুতরটি গুদামের এই অবস্থা দেখে বুঝল তার স্ত্রীর ব্যাপারে যে সিদ্ধান্তটা সে নিয়েছে সেটা একেবারেই ঠিক ছিল না। ভীষণ অনুতপ্ত হলো সে। কিন্তু এখন আর তওবা করে কী হবে। স্ত্রীকে হারিয়ে এবং তার কৃতকর্মের জন্যে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে অনুতাপ করে গেল।*

কবুতর

কবুতর সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য

  • কবুতর- পায়রা বা কপোত বা পারাবত নামে পরিচিত। এটি এক প্রকারের জনপ্রিয় গৃহপালিত পাখি। মানুষ খুব মজা করে কবুতরের গোশত খায়।
  • প্রাচীনকালে কবুতরের মাধ্যমে চিঠি আদান-প্রদান করা হতো। কিন্তু বর্তমানে এটি পরিবারের পুষ্টি সরবরাহ, সমৃদ্ধি, শোভাবর্ধনকারী এবং বিকল্প আয়ের উৎস হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কবুতর ওড়ানোর প্রতিযোগিতা প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রচলিত আছে। 
  • পৃথিবীতে প্রায় ২০০ জাতের কবুতর পাওয়া যায়। বাংলাদেশে প্রায় ৩০ প্রকার কবুতর রয়েছে। বাংলাদেশে কবুতরের জাতের মধ্যে গিরিবাজ সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়া, জালালী, শিরাজী, গিরিবাজ, সোলা, লোটন, সিলভার কিং ও হোয়াইট কিং কবুতরও পরিচিত।
  • পৃথিবীতে ২০০ জাতের কবুতর থাকলেও সব কবুতর কিন্তু তথ্য আদান-প্রদানের কাজে ব্যবহার করা হয় না। সাধারণত হোমার জাতীয় কবুতর তথ্য আদান প্রদানের কাজে ব্যবহার করা হয়। এসব কবুতরের ডানা মাংসল ও শক্ত। এরা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে এবং তার বাসস্থল থেকে ১৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়ে ফেরত আসতে পারে।
  • কবুতর প্রতিপালন এখন শুধু শখ ও বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং তা এখন একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। কবুতর বাড়ি ও পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা ছাড়াও অল্প খরচে এবং অল্প ঝামেলায় প্রতিপালন করা যায়।
  • অল্প স্থান ও কম খরচে কবুতর পালন করা যায়। কবুতর ছয় মাসে ডিম দেয়, বার মাসে তের জোড়া বাচ্চা দেয়, ১৮ দিনে বাচ্চা ফুটে, চার সপ্তাহে বাচ্চা খাওয়া যায়, বাচ্চা সুস্বাদু ও পুষ্টকর, খনিজ ও ভিটামিনসমৃদ্ধ, খাদ্য খরচ কম, রোগ-বালাই নেই ও কবুতর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
  • ডিম পাড়ার বাসা তৈরির জন্য ধানের খড়, শুকনো ঘাস, কচি ঘাসের ডগাজাতীয় উপাদান দরকার হয়। খোপের ভেতর মাটির সরা বসিয়ে রাখলে কবুতর সরাতে ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ফুটায়।
  • সাধারণত একটি ভালো জাতের কবুতর বছরে ১২ জোড়া ডিম দিতে সক্ষম। এই ডিমগুলোর প্রায় প্রতিটি থেকেই বাচ্চা পাওয়া যায়। এই বাচ্চা ৪ সপ্তাহের মধ্যেই খাওয়া বা বিক্রির উপযোগী হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ বয়সের কবুতর ডিম দেবার উপযোগী হতে ৫ থেকে ৬ মাস মাস লাগে।
  • কবুতরের জীবনকাল প্রায় ১৫ বছর।
সাবিনা খাতুন

কবুতর সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্যের পর এবারে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার ছোট্টবন্ধু সাবিনা খাতুনের সাক্ষাৎকার।

 

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।