নভেম্বর ০৫, ২০২০ ১৬:৩০ Asia/Dhaka

আমরা বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানের সার্বিক অর্জন এবং এতে বিজয়ের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতি শত্রুর দৃষ্টিভঙ্গিতে যে পরিবর্তন আসে সে সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম। আজ আমরা ওই অভিযানের রাজনৈতিক অর্জন নিয়ে কথা বলব।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক-সামরিক ভারসাম্য ইরানের অনুকূলে চলে আসা ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানের সবচেয়ে বড় অর্জন। ইরানের ওপর ইরাকের চাপিয়ে দেয়া আট বছরের যুদ্ধে বায়তুল মুকাদ্দাসের চেয়ে বড়, বিস্তৃত ও গুরুত্বপূর্ণ অভিযান আর একটিও পরিচালিত হয়নি। এই অভিযানে ইরানের হাতে সর্বাধিক সংখ্যক ইরাকি সেনা বন্দি হয় এবং ইরানি যোদ্ধারা সবচেয়ে বেশি গনিমাতের মাল অর্জন করেন। ফলে যুদ্ধের দ্বিতীয় বছরেই ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা নব্য সামরিক শক্তির অধিকারী এক ইরানকে তাদের সামনে দেখতে পায়। 

তারা একথা ভেবে হতবিহ্বল হয়ে যায় যে, এত বড় সামরিক শক্তি ইরান কীভাবে অর্জন করল? ইরাকিরা দেখতে পায় সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধাস্ত্রের দিক দিয়ে ইরানের কোনো পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু তারপরও তারা যুদ্ধক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিমত্তা প্রদর্শন করছে। প্রকৃতপক্ষে ইরানের শক্তি বেড়ে যাওয়ার কারণ ছিল এদেশের স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীতে দলে দলে লাখ লাখ তরুণের যোগদান। ইমাম খোমেনী (রহ.) ইসলামি এই ভূখণ্ডকে শত্রু র আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

যুদ্ধের সময় তাৎক্ষণিকভাবে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীতে ভর্তি হওয়া লোকদেরকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি নিজস্ব তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ দেয়। এরপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকদের আইআরজিসি’র বিভিন্ন ইউনিটে পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং এসব স্বেচ্ছাসেবক সামরিক পোশাক পরে আগ্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন।  পাশাপাশি শুধুমাত্র দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করার জন্য গঠিত ‘জিহাদে সজান্দেগি’ সংস্থার কর্মীরাও দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ফলে ইরানের যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সীমিত থাকলেও লড়াই করার মতো যোদ্ধার অভাব ছিল না। পাশাপাশি ইরান যেসব অপ্রচলিত কৌশল অবলম্বন করে তা আগে থেকে আঁচ করা আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

ইরানি যোদ্ধারা আট বছরের প্রতিরক্ষা যুদ্ধে এমন কিছু কৌশল অবলম্বন করেন যা ইরাকি বাহিনী অসম্ভব বলে ধরে নিয়েছিল। যেমন বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করে খরস্রোতা কারুন নদী পার হওয়া, ফাতহুল মোবিন অভিযানে রোকাবিয়্যেহ প্রণালী ও তিশে পাহাড়ের দিক দিয়ে আক্রমণ চালানো এবং ‘ফাত্‌হ বাস্তান’ অভিযানে ইরানি যোদ্ধাদের বালুময় উপত্যকা অতিক্রম।

ইরানি কমান্ডাররা আরো যেসব কৌশল অবলম্বন করেন সেগুলোর মধ্যে ছিল রাতের অন্ধকারে হাজার হাজার সেনার পায়ে হেঁটে বহু কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়া এবং শত্রু সেনাদেরকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলা, যেসব দিক দিয়ে ইরাকি সেনারা তুলনামূলক শক্তিশালী ছিল সেইসব দিকে ওদের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে চলা, হঠাৎ করে ফ্রন্টের যোদ্ধাদেরকে শত্রু বাহিনীর পেছন দিকে নিয়ে গিয়ে দুইদিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালানো এবং নতুন নতুন যোদ্ধাদেরকে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের কাজে লাগানো। ইরানি কমান্ডারদের এসব অভাবনীয় কৌশল বুঝে ওঠার আগেই আগ্রাসী ইরাকি বাহিনী ইরানি যোদ্ধাদের হাতে ধরাশায়ী হয় এবং ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বিশাল অঞ্চল ছেড়ে পালিয়ে যায়।  সার্বিকভাবে এসব সাফল্যের পেছনে আইআরজিসি’র একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের কথা উল্লেখ করতেই হয়। আর তা হচ্ছে, শত্রুসেনাদের গতিবিধি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বিশেষ পারদর্শিতার পরিচয় দেয় এবং ইরানি যোদ্ধাদের বেশিরভাগ বিজয়ের মূল চাবিকাঠি ছিল এটি।

আমরা আগেই বলেছি, আট বছরের যুদ্ধের মধ্যে বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানেই ইরাকি বাহিনী সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হয়েছিল। এই অভিযানে দু’টি বড় শহর হোভেইজে ও খোররামশাহরের পাশাপাশি ‘হামিদ’ সেনা ঘাঁটিসহ প্রায় পাঁচ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনরুদ্ধার করেন ইরানি যোদ্ধারা।  প্রায় ১৬ হাজার ইরাকি সেনা হতাহত এবং প্রায় ১৯ হাজার সাতশ’ আগ্রাসী সেনা বন্দি হয়। ইরাকি বাহিনীর ব্যবহৃত ১০৫ টি ট্যাংক ও হাজার হাজার বন্দুক এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ গনিমতের মাল হিসেবে ইরানি যোদ্ধাদের হস্তগত হয়।  খোররামশাহর’সহ অন্যান্য স্থানের সেনা ঘাঁটিগুলোতে দখলদার ইরাকি সেনাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রের এত বিশাল ভাণ্ডার ছিল যে, সেগুলো সরিয়ে নিতে ইরানি যোদ্ধাদের প্রায় দুই মাস সময় লাগে। এ ছাড়া, পরবর্তী তিন পর্যন্ত পর্যন্ত ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হয়। বায়তুল মোকাদ্দাস অভিযানে শত্রুসেনাদের ২০ টি জঙ্গিবিমান ও দুইটি হেলিকপ্টার গানশিপ ভূপাতিত হয় এবং ৬১৮ টি ট্যাংক ধ্বংস হয়।

অবশ্য এই বিজয় অর্জন করতে গিয়ে ইরানের প্রায় ছয় হাজার যোদ্ধা শহীদ এবং ২৫ হাজার সৈন্য আহত হন। খোররামশাহর মুক্ত করা ছিল ইরাক-ইরান যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই অভিযানে ইরানের বিজয়ের ফলে দু’দেশের যুদ্ধ একটি নতুন মাত্রা অতিক্রম করে। খোররামশাহর পুনরুদ্ধারের আগে ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম ও তার বাথ পার্টি এই আকাঙ্ক্ষা পোষণ করত যে, তেহরান অচিরেই বাগদাদের সামনে নতজানু হয়ে আত্মসমর্পন করবে। কিন্তু সাদ্দাম যখন উপলব্ধি করে যে, সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে সে তার সবগুলো লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না তখন ইরানের খুজিস্তান প্রদেশের একাংশ দখল এবং আলজিয়ার্স চুক্তি বাতিল করাকে নিজের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে থাকে। কিন্তু খোররামশাহর পুনরুদ্ধারের পর বাগদাদের সকল পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে সাদ্দামের শক্তিমত্তা সম্পর্কে যেসব কল্পকাহিনী প্রচলিত ছিল সেসব হঠাৎ করে উধাও হয়ে যায়।  মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের চেতনা প্রভাব ফেলতে শুরু করে। এ অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য ইরানের অনুকূলে চলে আসে এবং রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের ভাবমর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি পায়। ইসলামি ইরানের স্থপতি ইমাম খোমেনেী (রহ.) বিশ্বের দরবারে একজন অপরাজেয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। লেবানন ও ফিলিস্তিনের জনগণ ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে ওঠে।

বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানে বিজয়ের ফলে ইরানি জনগণের মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস জন্মে যে, ঈমানের বলে বলীয়ান হলে এবং ইমামের মতো নেতা সঙ্গে থাকলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সকল শক্তির পৃষ্ঠপোষকতার অধিকারী সাদ্দামের মতো প্রতাপশালী শাসককেও পরাজিত করা সম্ভব। খোররামশাহর পুনরুদ্ধাদের ফলে সাদ্দাম বাহিনীর পরাজয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একটি শাসনব্যবস্থা যে বিশ্বের বুকে শক্তিমত্তা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে তা প্রমাণিত হয়। ইহুদিবাদী ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোনাচেম বেগিন সে সময় বলেন: ইরানি সৈন্যরা যদি দজলা নদী অতিক্রম করে তাহলে ইসরাইলি সেনারা তাদের মোকাবিলা করবে। কারণ, বেগিন ভেবেছিল, সাদ্দামের পতনের অর্থ হলো ইরানি যোদ্ধাদের বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে অগ্রসর হওয়া।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ০৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।