কুরআনের আলো
সূরা আয-যুমার: আয়াত ৫৯-৬৩ (পর্ব-১৬)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আয-যুমারের ৫৯ ও ৬৩ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৫৯ ও ৬০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
بَلَى قَدْ جَاءَتْكَ آَيَاتِي فَكَذَّبْتَ بِهَا وَاسْتَكْبَرْتَ وَكُنْتَ مِنَ الْكَافِرِينَ (59) وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ تَرَى الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى اللَّهِ وُجُوهُهُمْ مُسْوَدَّةٌ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْمُتَكَبِّرِينَ (60)
“হ্যাঁ! তোমার কাছে আমার নিদর্শনাবলী এসেছিল; কিন্তু তুমি সেগুলোকে মিথ্যা বলেছিলে, অহংকার করেছিলে এবং কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিলে।” (৩৯:৫৯)
“যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে, কেয়ামতের দিন আপনি তাদের মুখমণ্ডলকে কৃষ্ণকায় দেখতে পাবেন। অহংকারীদের আবাসস্থল জাহান্নামে নয় কি?” (৩৯:৬০)
গত আসরে আমরা সেসব লোকের কথা বর্ণনা করেছিলাম যারা আল্লাহর আজাব দেখার পর সম্বিত ফিরে পায় এবং পার্থিব জীবনের উদাসীনতার জন্য অনুশোচনা করতে থাকে। তারা দুনিয়ার জীবনে ফিরে এসে তাদের অতীত ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা করতে থাকে। কিন্তু তাদেরকে সে সুযোগ দেয়া হয় না।
এরপর আজকের এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: তোমাদের কাছে আল্লাহ তায়ালা সত্যের দাওয়াত পৌঁছে দিতে কার্পণ্য করেননি বরং তোমাদেরকে সত্য পথ প্রদর্শনের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছিলেন। পৃথিবীর জীবনে তোমাদেরকে হেদায়েত করার জন্য কিতাবসহ নবী-রাসূল পাঠানো হয়েছিল। যদি তোমরা নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজ লাগাতে তাহলে সত্য উপলব্ধি করতে পারতে এবং হেদায়েতের বাণী তোমাদের কাজে আসত।
কিন্তু দম্ভ ও অহংকার করার কারণে তোমরা সত্য ধর্ম প্রত্যাখ্যান করেছ এবং নবী-রাসূলদের দাওয়াতে বাণী গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছ। এর পরিণতিতে আজ তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ করো। পার্থিব জীবনের পাপাচারের কারণে জাহান্নামের অধিবাসীদের মুখমণ্ডল কৃষ্ণকায় হয়ে যাবে এবং তারা পরস্পরের প্রতি ত্যক্ত-বিরক্ত থাকবে।
নিঃসন্দেহে আল্লাহর বাণী প্রত্যাখ্যানকারীদের এই কালো রূপ কিয়ামতের দিন তাদেরকে চরম অপমানকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেবে। পার্থিব জীবনে মানুষ যেসব কাজ ও আচরণ করে এবং যা কিছু বলে তার পরিণতি কিয়ামতের দিন তার সামনে প্রতিভাত হয়ে উঠবে। পৃথিবীর জীবনে যারা কালো অন্তরের অধিকারী এবং যাদের কর্মও কালোর মতো অন্ধকার কিয়ামতের দিন সেসব মানুষের অন্তরের এই কালিমা মুখমণ্ডলে প্রকাশ পাবে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- মহান আল্লাহ মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তি দান করার পাশাপাশি তার কাছে ওহীর মাধ্যমে হেদায়েতের বাণী পৌঁছে দেয়ার আগ পর্যন্ত তাকে আজাব দেন না।
২- সত্যবাণী প্রত্যাখ্যান ও কুফরের মূল উৎস হচ্ছে অহংকার ও আত্মম্ভরী মনোভাব।
৩- কিয়ামতের দিন মানুষের অন্তর ও বাহির সমানভাবে প্রকাশ হয়ে পড়বে। তার অন্তরে যা কিছু আছে তা তার মুখণ্ডলে প্রকাশ পাবে।
সূরা যুমারের ৬১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَيُنَجِّي اللَّهُ الَّذِينَ اتَّقَوْا بِمَفَازَتِهِمْ لَا يَمَسُّهُمُ السُّوءُ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (61)
“আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করত আল্লাহ তাদেরকে তাদের সাফল্য অর্জনকারী কর্মের মাধ্যমে মুক্তি দেবেন; তাদেরকে কোনো অনিষ্ট স্পর্শ করবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না।” (৩৯:৬১)
আগের দুই আয়াতে অপরাধী ব্যক্তিদের শাস্তির কথা শোনানোর পর এই আয়াতে কিয়ামতের দিন মুক্তির উপায় হিসেবে তাকওয়া বা খোদাভীতি অবলম্বনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তিকে মুক্তি দেবেন এবং সৌভাগ্যবানদের সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। সৌভাগ্য হচ্ছে চিরস্থায়ী শান্তি ও তৃপ্তি। পার্থিব জীবনে আমরা যখন অনেক মজাদার খাবার খাই ও সুস্বাদু পানীয় পান করি তখন আমরা তৃপ্তি পাই। কিন্তু এটি সৌভাগ্যের লক্ষণ নয়। কারণ, এ ধরনের তৃপ্তি স্থায়ী হয় না বরং কিছুক্ষণ পরই আবার ক্ষুধার অনুভূতি জেগে ওঠে। পার্থিব জীবনের যেকোনো তৃপ্তিদায়ক বিষয়ই ক্ষণস্থায়ী। যুক্তির খাতিরে যদি ধরেও নেই যে, কারো জীবনে পার্থিব সুখ দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকে তারপরও পরকালীন চিরস্থায়ী জীবনের তুলনায় তা অনেক বেশি ক্ষণস্থায়ী। এ দুটি জীবন তুলনাযোগ্যই নয়। কাজেই কিয়ামতের দিন যে সৌভাগ্যবান হবে সেই প্রকৃত সুখী এবং সেই চিরস্থায়ী জীবনে তার কোনো ভয়, দুঃখ বা উদ্বেগ থাকবে না।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- পার্থিব জীবনে তাকওয়া অবলম্বন পারলৌকিক জীবনে সৌভাগ্যের চাবিকাঠি।
২- তাকওয়া দুনিয়ার জীবনে মানুষকে গুনাহ, অশ্লীলতা ও অপবিত্রতা থেকে রক্ষা করে। নিজেকে গোনাহমুক্ত রাখার এই অনুশীলনের কারণে কিয়ামতের দিন মুত্তাকি ব্যক্তি সব ধরনের আজাব ও কষ্ট থেকে রক্ষা পাবে।
এই সূরার ৬২ ও ৬৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ (62) لَهُ مَقَالِيدُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا بِآَيَاتِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ (63)
“আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি প্রতিটি জিনিসের রক্ষণাবেক্ষণকারী।” (৩৯:৬২)
“আসমান ও জমিনের চাবি তারই কাছে (রয়েছে)। আর যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে প্রত্যাখ্যান করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।” (৩৯:৬৩)
সূরা যুমারের বেশিরভাগ আয়াতে তৌহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ ও শিরক বা অংশীবাদ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই আয়াতে আবার তৌহিদ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, এই গোটা বিশ্বজগত পরিচালনা, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সেই সত্ত্বা পালন করছেন যিনি এই জগত সৃষ্টি করেছেন। তিনি এ জগত সৃষ্টি করার পর ক্লান্ত হয়ে পড়েননি বা এটি পরিচালনার দায়িত্বও অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করেননি। এই আয়াতের বক্তব্য বিশেষ করে মুশরিক ও মূর্তিপূজকদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে। অনেক মুশরিক আছে যারা সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করলেও তাদের কল্পিত দেব-দেবীকে জীবন পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত মনে করে তাদের পূজা করে।
পবিত্র কুরআনের এই আয়াত অনুযায়ী যারা বিশ্বজগত পরিচালনার পাশাপাশি মানুষের জীবন পরিচালনায় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ভূমিকা আছে বলে মনে করে তারাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। কারণ যে আল্লাহ গোটা সৃষ্টিজগতের মালিক এবং আসমান ও জমিনের চাবি যার হাতে রয়েছে তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে দুর্বল ও অক্ষম কল্পিত পালনকর্তাদের কাছে গেলে কোনো লাভ নেই। এসব কল্পিত স্রষ্টা এতটাই অক্ষম যে নিজেদের ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতাও তাদের নেই। কাজেই তাদের পক্ষে তাদের উপাসনাকারীদেরকে বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার করা বা ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব নয়।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:
১- বিশ্বের সমস্ত সৃষ্টি বাঁচা ও টিকে থাকার জন্য আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী। অন্য কথায়, তিনি একইসঙ্গে বিশ্বজগতের স্রষ্টা এবং পালনকর্তা। এই দুই বিষয়ের যেকোনো একটিতে আল্লাহর পাশে অন্য কাউকে বসালেই সেটি শিরক বলে বিবেচিত হবে এবং শিরকের গুনাহ তওবা ছাড়া মাফ হবে না।
২- তৌহিদ এমন একটি বিষয় যা মানুষের জীবনের প্রতিটি অংশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এবং এর কোনো অংশ থেকেই তৌহিদকে আলাদা করা সম্ভব নয়।#
পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/১৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।