রংধনু আসর: আশ্চর্য মণিরত্ন
রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছ তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছ ভালো ও সুস্থ আছ। আজকের আসরে তোমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।
খ) আজকের আসরের শুরুতেই রয়েছে একটি রূপকথার গল্প। গল্পের পর থাকবে এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।
ক) বহুকাল আগের কাহিনী। এক গ্রামে এক মা- তার এক ছেলেকে নিয়ে বসবাস করতো। ছেলে তখনো কোনো কাজকর্ম করতো না। মা যা জোগাড় করতো তা দিয়েই তাদের জীবন চলতো। ছেলের কোনো আয় রোজগার ছিল না। একদিন মা ছেলেকে বলল: বাবা! এই টাকাটা নাও। বাজারে গিয়ে কিছু রুটি কিনে আনো।
খ) ছেলে তো মায়ের অনুগত সন্তানের মতো টাকাটা হাতে নিয়েই পাড়ি জমালো বাজারের উদ্দেশ্যে। কিছুটা পথ গিয়েই দেখলো একদল দুষ্টু ছেলে কী নিয়ে যেন দুষ্টামি করছে। এগিয়ে যেতেই দেখে একটা নিরীহ বিড়ালকে দড়ি দিয়ে বেঁধে দুষ্টেরা খেলছে, মজা করছে, একবার এদিকে টানছে আবার অন্যদিকে, আর বিড়ালটা কষ্টে মিউ মিউ শব্দ করে কাঁদছে।
ক) ছেলেটার মন কেঁদে উঠল বিড়ালের জন্য। সে দুষ্টু ছেলেদের কাছে গিয়ে বলল: বাচ্চারা! তোমরা বিড়ালটাকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছো কেন। ওকে ছেড়ে দাও।
খ) দুষ্টুরা বলল: এমনিতেই ছেড়ে দেবো? তোর এতো মায়া লাগলে কিনে নিয়ে ছেড়ে দে!
ক) ছেলেটা বলল: তোমরা বিক্রি করবে বিড়ালটাকে? ওর দাম কতো?
খ) দুষ্টুরা বলল: হ্যাঁ, বিক্রি করবো। দাম খুব একটা বেশি না, সস্তাই। অর্ধেক রুটির দামের চেয়েও কম।
ক) ছেলেটা বলল: এই নাও টাকা।
খ) মায়ের দেওয়া সব টাকা দিয়ে সে বিড়ালটাকে কিনে নিল এবং ছেড়ে দিল। এরপর ভাবল টাকা তো শেষ, বাজারে গিয়ে তো আর লাভ নেই। রুটি কেনার পয়সা তো নেই। তাই সে ফিরে গেল বাসায়।
ক) মা ছেলেকে খালি হাতে বাসায় ফিরেছে দেখে জিজ্ঞেস করল: ঘটনা কী! রুটি কোথায়! খালি হাতে ফিরেছো কেন...?
খ) ছেলে তার মাকে পুরো ঘটনা খুলে বলল। মা ছেলের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ছেলে আস্তে করে বলল: মা! এক বেলা রুটি না খেলে কী আর এমন হবে! কিন্তু একটা নিরীহ প্রাণীর জীবন তো আমাদের এটুকু কষ্টের বিনিময়ে বাঁচল, তাই না?
ক) মা আর কিছু বলল না। পরদিন আবারও ছেলেকে টাকা দিয়ে বলল: ‘সোজা বাজারে গিয়ে কসাইর দোকান থেকে গোশত কিনে বাড়ি ফিরবি’।
খ) ছেলে মাথা নেড়ে টাকাটা হাতে নিয়ে বের হয়ে গেল। বাজারে যাওয়ার পথে আবারো দেখা হয়ে গেল ওই দুষ্টু ছেলেগুলোর সাথে। ওরা আজ একটা কুকুরকে নিয়ে খেলছিল। খেলা আর কি! কুকুরকে পিটিয়ে লাথি মেরে মেরে মজা নিচ্ছিল।
ক) কুকুরের কষ্ট দেখে ছেলেটার খুব খারাপ লাগছিল। সে দুষ্টু ছেলেদেরকে জিজ্ঞেস করল: তোমরা কুকুরটাকে বিক্রি করবে?
খ) দুষ্টুগুলো সাথে সাথে জবাব দিল: হ্যাঁ! বিক্রি করব, খুব কম দামে দেবো।
ক) ছেলেটা বলল: ঠিক আছে! বলো! কতো হলে বিক্রি করবে?
খ) দুষ্টু ছেলেরা বলল: একদম সস্তা। অর্ধেক রুটির দামে বিক্রি করব।
ক) ছেলেটা মায়ের দেওয়া টাকার পুরোটাই দিয়ে দিল দুষ্টুদেরকে। তারপর কুকুর কিনে নিয়ে ফিরে গেল বাড়ি।
খ) বাড়ি যাবার পর মা তাকে দেখেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল। বলল: তোকে নিয়ে তো আর পারছি না-বাপু। আমার কি ধনভাণ্ডার আছে যে কুত্তা কিনে মজা করবো!
ক) ছেলে মায়ের কথা শুনে বুঝতে পারল যে, মা রেগে গেছেন। তারপরও মাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে বলল: মা! আমরা যদি এক বেলা গোশত না খাই কী আর এমন ক্ষতি হবে! কিন্তু একটা প্রাণীর জান তো আমরা বাঁচাতে পারলাম, তাই না?
খ) মা আর কোনো জবাব দিল না। পরের দিনও মা ছেলের হাতে টাকা দিল। সেইসাথে বলে দিল- এবার সোজা বাজারে গিয়ে তেল কিনে আনবি।
ক) ছেলে এবারও মাথা নেড়ে মায়ের কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে বাজারের পথে পাড়ি জমাল। আজও সে পথে দেখতে পেল সেই দুষ্টু বালকদের। আজ তারা একটা ইঁদুরকে নিয়ে খেলছিল। ইঁদুরটাকে ধরে লেজে রশি বেঁধে আগুনে পোড়ানোর চেষ্টা করছে। তার মনটা ইঁদুরের জন্য কেঁদে উঠল।
খ) ছেলেটা মায়ের কথা ভুলে গিয়ে আজও দুষ্টু ছেলেদের কাছ থেকে ইঁদুরটাকে কিনে নিয়ে বাসায় ফিরে এলো। মা আজ ছেলের হাতে ইঁদুর দেখেও না দেখার ভান করলেন।
ক) এরপর কেটে গেল বহুদিন। ছেলে প্রায় প্রতিদিনই নদীর ধারে যায়। মাছ মারে। মাছ কেটে পরিষ্কার করে পরিত্যক্ত অংশগুলো কুকুর আর বিড়ালের সামনে দেয় আর বাকিটা নিয়ে যায় বাসায়।
খ) একদিন ছেলেটা বাসাতেই ছিল। তার কুকুর একটা মাছের মুখের ভেতর একটা পাথর পেল। পাথরটা সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করছিল। কুকুর ওই পাথরটা নিয়ে দিল মনিবের কাছে। মনিব মানে ছেলেটা জ্বলজ্বলে পাথর দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। মজা করার জন্য সে পাথরটাকে মুখে নিয়ে জিহ্বার নীচে রেখে বলল: হে রত্নমণি! আমার খিদে লেগেছে। মজার মজার খাবার নিয়ে এসে টেবিল ভর্তি করে দাও।
ক) আশ্চর্যরকমভাবে চোখের পলকেই তা ঘটে গেল। ছেলে নড়েচড়ে উঠে খাবারগুলো পরীক্ষা করার জন্য মুখে দিল। সে কি মজা রে বাবা! সে সবাইকে ডেকে ওই মজার মজার খাবার খাওয়ালো।
খ) এরপর একদিন ছেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল প্রান্তরের দিকে। পথিমধ্যে দেখতে পেল খানের সুন্দরী মেয়েকে। তার ভালো লেগে গেল। বাসায় ফিরে মাকে বলল তার জন্য যেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়। মা যতই চেষ্টা করল আজগুবি এই প্রস্তাব থেকে সরে আসার জন্য, ছেলে কিছুতেই মানল না। মাকে পাঠালোই খানের বাড়িতে। খান মহিলাকে দেখে বলল: কী চাও!
ক) মহিলা বলল: তোমার মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
খ) খান ভেবেচিন্তে বলল: এক শর্তে রাজি আছি। চল্লিশটি উটের পিঠ বোঝাই করা সোনা দিতে হবে মেয়ের মোহরানা।
ক) মহিলা খানের কথাটা ছেলেকে জানালো। ছেলে বলল: মা চিন্তা করো না।
খ) পরদিন সকালেই ছেলে খানের চাহিদা পূরণ করে চল্লিশ উটের পিঠ বোঝাই করা সোনা পাঠিয়ে দিল। খান এবার মহিলার দিকে তাকিয়ে বলল: এবার একটা প্রাসাদ বানাতে হবে সোনা দিয়ে। ওই প্রাসাদে আমার মেয়ে থাকবে।
ক) মহিলা আবারও খানের কথাটা ছেলেকে জানালো। ছেলে আজও বলল: চিন্তা করো না মা!
খ) পরদিন সকালে ছেলে ঠিকই নদীর তীরে সোনা দিয়ে একটা প্রাসাদ বানিয়ে ফেলল। খানকে বলার পর সে আশ্চর্য হয়ে ওই প্রাসাদ দেখতে গেল। প্রাসাদ দেখে তো খানের আর কোনো অজুহাত তৈরির সুযোগ থাকল না। বাধ্য হয়ে ওই ছেলের সাথে খান তার মেয়ের বিয়ে দিল।
ক) কিন্তু খানের মেয়ে একটা গ্রাম্য ছেলের সাথে জীবনযাপন করতে বিব্রত বোধ করল। সে তার বাবাকে বলল এমন কিছু একটা করতে যাতে সে ওই ছেলের কাছ থেকে চলে আসতে পারে। খান এক বৃদ্ধ মহিলাকে বলল এই অবস্থা থেকে তাকে মুক্তি দিতে।
খ) ওই বুড়ি জাদুকর খানকে কথা দিল সে কিছু একটা অবশ্যই করবে। বুড়ি শুনেছিল যে ওই ছেলে প্রতিদিন গরিব ফকিরদেরকে খেতে দেয়, জামা কাপড় দেয়। বুড়িও একদিন ফকিরের পোশাক পরে ছেলের ঘরে গেল।
ক) বৃদ্ধা মহিলাকে দেখে ছেলেটার মন কেঁদে উঠল। সে বুড়িকে তার প্রাসাদের একটা কক্ষে নিয়ে বিশ্রামের সুযোগ দিল। বুড়ি নরম সুরে আস্তে আস্তে তার উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করল এবং জেনেও গেল ছেলের নিশিদীপ রত্নের রহস্য। এখন কেবল সুযোগের অপেক্ষা। কী করে ছেলের মুখের ভেতর জিহ্বার নীচ থেকে রত্নটি চুরি করা যায় সে চিন্তাই করতে লাগল বুড়ি।
খ) একরাতে বুড়ি রত্নধর ছেলেকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিল। ছেলে অচেতন হয়ে পড়লে বুড়ি রত্নটা চুরি করে নীচের জিহ্বার নীচে রেখে বলল: ‘হে নিশিদীপ রত্ন! খানকে এই প্রাসাদে বসাও আর এই ছেলেকে বসাও মাটিতে’।
ক) নিমেষেই তা হয়ে গেল। ছেলের যখন ঘুম ভাঙল, দেখল তার জিহ্বার নীচে রত্নটা নেই। বেচারা কান্নাকাটি শুরু করে দিল, মাথা চাপড়াতে লাগল সে।
খ) বিড়াল, কুকুর এবং ইঁদুর তার কান্নাকাটি শুনে তাকে ঘিরে সমবেত হলো। তারা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল যে করেই হোক, এমনকি কঠিন পাথরের নীচে থাকলেও তারা ওই নিশিদীপ খুঁজে বের করে আনবে এবং ছেলের হাতে ফিরিয়ে দেবে।
ক) এই শপথ নিয়ে ওই তিন প্রাণী ছেলের প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পড়ল। তারা সোজা চলে গেল খানের প্রাসাদে। প্রাসাদের দেয়ালের নীচ দিয়ে টানেলের মতো সুড়ঙ্গ তৈরি করল ইঁদুর। ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে বিড়াল আর ইঁদুর প্রাসাদে ঢুকল। কুকুর বাইরে দাঁড়িয়েই পাহারা দিল। বিড়াল আর ইঁদুর খানের মেয়ের রুমে পৌঁছে গেল। বৃদ্ধা জাদুকর খানের কন্যার রুমের দরজার কাছে ঘুমিয়েছিল।
খ) রত্নটি ছিল ওই বুড়ির জিহ্বার নীচে। বিড়াল এবং ইঁদুর ভাবছিল কী করে বুড়ির মুখের ভেতর থেকে রত্নটি বের করা যায়। ইঁদুরের বুদ্ধিশুদ্ধি খারাপ না। সে বিড়ালকে ইঙ্গিতে কিছু একটা করতে বলল এবং প্রস্তুত থাকতে বলল। বিড়াল অমনি তার লেজ জাদুকর বুড়ির নাকে ঢুকিয়ে দিল।
ক) বুড়ি বিকট শব্দে হাঁচি দিতেই মুখের ভেতর থেকে মণিরত্নটা বেরিয়ে ছিটকে পড়ল বাইরে। সাথে সাথে বিড়াল রত্নটাকে মুখে পুরে নিল। বুড়ি জেগে উঠে বিড়ালের পিছু নিতেই বিড়াল এবং ইঁদুর একসাথে দিল দৌড়। যেদিক দিয়ে এসেছে সেদিক দিয়েই তারা পালালো। বিড়াল দেয়ালের বাইরে এসেই কুকুরের কাছে দিয়ে দিল রত্নটা। কুকুর আগের মতোই তার মুখের ভেতরে রত্নটা ঢুকিয়ে নিয়ে পাড়ি জমালো মনিবের বাড়ির দিকে।
খ) প্রাসাদে পৌঁছেই হারানো রত্ন মনিবের হাতে তুলে দিল তারা। ওই ছেলে তো কল্পনাই করেনি রত্ন আবারও ফিরে পাবে। এখন ফিরে পেয়ে খুশিতে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিড়াল কুকুর এবং ইঁদুরকে জড়িয়ে ধরে আদর করল। এবার ছেলেটি রত্নটিকে জিহ্বার নীচে রাখল এবং মা’কে বলল: আমাদের প্রাসাদকে এক্ষুণি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিচ্ছি!
ক) মা বলল: এই প্রাসাদ দিয়ে আমাদের কী লাভ!
খ) মায়ের কথা শুনে ছেলে একবার ভাবল বিষয়টা নিয়ে। ভেবেচিন্তে দেখল মা তো ঠিকই বলছেন। সুতরাং সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল প্রাসাদ ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দেবে এবং সেটাই করল সে। নিমেষেই তাদের প্রাসাদ মাটির সাথে মিশে গেল। সেই ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে গেল খান এবং তার কন্যা। এরপর ওই ছেলে এক মালির মেয়েকে বউ করে নিয়ে এলো সংসারে। ছেলে সারাদিন বাইরে কাজকর্ম করে আয় উপার্জন করতো। বৌ আর মাকে নিয়ে সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে লাগল।
ক) বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে তোমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবো বাংলাদেশের জামালপুর শহরের এক নতুন বন্ধুকে। ওর নাম তাসমিয়া তাহসিন।
ক) শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা ভালো ও সুস্থ থেকো আবারো এ কামনা করে গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর।
খ) কথা হবে আবারো আগামী আসরে।
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।