মার্চ ২৭, ২০২১ ২০:৫৯ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, আমাদের অনেক অনেক আদর, ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা নাও। আশাকরি পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালো ও সুস্থ আছো। আজকের আসরে তোমাদের সঙ্গে আছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।

আকতার জাহান: বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, বর্তমান পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো পরিবারে বাস করে। সব পরিবারই যে আদর্শ পরিবার এ কথা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও বিশ্বের সকল মুসলমান ও আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও আদর্শ পরিবার হচ্ছে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পরিবার।

গাজী আবদুর রশিদ:  নবী পরিবারের প্রতিটি সদস্য ছিলেন মানুষের আদর্শ। মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য ওই পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিজেদের সম্পদ, সময়, মেধা ও যোগ্যতাকে ব্যয় করে গেছেন। রাসূলেখোদা তাঁর পরিবারের যেসব সদস্যকে আমাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ এবং যাদের নেতৃত্ব মেনে চলতে বলেছেন তাদেরকে ‘আহলে বাইত’ বলা হয়। আহলে বাইতে প্রথম ইমাম ছিলেন আমীরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ.) এবং শেষ ইমাম হচ্ছেন ইমাম মাহদী (আ.)।

আকতার জাহান: আহলে বাইতের মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মহানবী বলেছেন, “আমার আহলে বাইতের উদাহরণ হযরত নুহ (আ.)-এর নৌকার মত। যারা নৌকায় আরোহন করল, তারাই রক্ষা পেল। আর যারা তা থেকে বিরত থাকল তারাই ডুবে মরল। 

গাজী আবদুর রশিদ: রাসূলেখোদা আরও বলেন, “আমি তোমাদের জন্য অতি মূল্যবান দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি। একটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব, অপরটি হচ্ছে আমার রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়, আমার আহলে বাইত। তোমরা যদি এ দুটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধর তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।

আকতার জাহান: বন্ধুরা, এ হাদিসে যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা হলো, পবিত্র কুরআন যেভাবে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত মানব জাতির মাঝে টিকে থাকবে, মহানবীর পবিত্র আহলে বাইতও তেমনি মানব জাতির মাঝে কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে। এ হাদিসে আরও একটি বিষয় বলা হয়েছে, আর তাহলো- মানুষ যদি আহলে বাইতের আনুগত্য করে এবং তাদের কথা মেনে চলে, তাহলে কখনোই তারা পথভ্রষ্ট হবে না। কেননা তারা সর্বদাই সত্যের সাথে অবস্থান করছেন।

গাজী আবদুর রশিদ: বন্ধুরা, আহলে বাইতের মর্যাদা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা জানলে। আজকের আসরে আমরা ‘মানুষের জীবনে তাঁর বংশের প্রভাব’ সম্পর্কে একটি গল্প শোনাব। আর গল্প শেষে থাকবে একটি কবিতা ও গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।

আকতার জাহান: অনেক দিন আগে ততকালীন পারস্যে এক বাদশাহ বাস করতেন। তার হাতিসালে হাতি, ঘোড়াসালে ঘোড়া, অসংখ্য লোক-লস্কর, বিশাল সেনাবাহিনী কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। রাজভাণ্ডারে অজস্র ধনরত্ন। মন্ত্রিসভার মন্ত্রীরাও প্রত্যেকেই যথেষ্ট জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিত ব্যক্তি। রাজ্যের প্রজারা বাদশাহর প্রতি নরম কৃতিজ্ঞ। এভাবে সবাইকে নিয়ে বাদশার দিন ভালোই যাচ্ছিল।

গাজী আবদুর রশিদ: একদিন সে রাজ্যে এক মহাজ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তির আগমন ঘটল। তিনি ধন বা নাম নয়; গুণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আলোকে মানুষকে বিচার করেন। পণ্ডিত ব্যক্তিটি বেশিদিন এক স্থানে থাকেন না। তিনি পৃথিবীময় ঘুরে বেড়ান এবং নানারকম বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে মানুষকে সহযোগিতা করেন। এতে জনগণ খুশি হয়ে এই পণ্ডিতকে যা কিছু উপহার দেয় তাই দিয়ে তার জীবিকা নির্বাহ হয়ে যায়।

আকতার জাহান: একদিন প্রধানমন্ত্রী বাদশাহকে বললেন, বাদশাহ নামদার! আমাদের রাজ্যে এক মহাজ্ঞানী ব্যক্তির আগমন ঘটেছে এবং তিনি আপনার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছেন।

গাজী আবদুর রশিদ: বাদশাহ বললেন: এ তো খুব খুশির কথা। মন্ত্রী মহোদয় আপনি কাল সকালেই জ্ঞানী ব্যক্তিটিকে আমার রাজসভায় নিয়ে আসুন।

আকতার জাহান: যেই কথা সেই কাজ। পরদিন সকালেই জ্ঞানী ব্যক্তিটি বাদশাহর দরবারে হাজির হয়ে বাদশাহকে সালাম জানালেন। বাদশাহ জ্ঞানী ব্যক্তিটির সঙ্গে কথা বলে খুব খুশি হলেন এবং রাজপ্রাসাদের অতিথি মহলে তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন।

গাজী আবদুর রশিদ: একদিন সকালে বাদশাহ প্রাতঃভ্রমণ শেষে প্রাসাদে ফেরার পথে একটি সাদা পাথর সঙ্গে নিয়ে এলেন এবং পাথরটি রাজ সিংহাসনের এক পাশে রেখে দিলেন। তারপর রাজসভায় সবার সামনে জ্ঞানী ব্যক্তিটিকে ডেকে বললেন: ‘আচ্ছা পণ্ডিত মহাশয়! বলুনতো, এই সাদা পাথরটির মাঝখানে একটি চিকন সবুজ দাগ কেন?

আকতার জাহান: এ কথা শুনে পণ্ডিত ব্যক্তিটি বললেন, মহারাজ ভয়ে বলব না নির্ভয়ে বলব?

গাজী আবদুর রশিদ: বাদশাহ বলেন: আপনি নির্ভয়ে বলেন। তবে পাথরটি ভাঙার পর যদি আপনার কথা ঠিক না হয় তাহলে আমি কিন্তু আপনার গর্দান নেব। আপনি এ প্রস্তাবে রাজি আছেন তো?

আকতার জাহান: জ্ঞানী ব্যক্তিটি বললেন, জী মহারাজ, আমি রাজি।

গাজী আবদুর রশিদ: এবার জ্ঞানী ব্যক্তিটি বললেন: ‘পাথরের ভেতর একটি সবুজ রঙের পোকা আছে।

আকতার জাহান: এমন কথা কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। সঙ্গে সঙ্গে সেই সাদা সুন্দর পাথরটিকে ভেঙে দুই ভাগ করা হলো। আর সত্যি সত্যি পাথরটির ভেতর থেকে একটি সবুজ রঙের পোকা বেরিয়ে এলো।

গাজী আবদুর রশিদ: বাদশাহ জ্ঞানী ব্যক্তিটির পাণ্ডিত্য দেখে অবাক হয়ে গেলেন এবং তিনি এর পুরস্কার হিসেবে পণ্ডিত ব্যক্তিটির খাবার তালিকায় ছয়টি রুটি বাড়িয়ে দিলেন। রাজদরবারের প্রত্যেকেই এতে খুশি হলেন এবং বাহবা দিলেন। এভাবে দিনে দিনে পণ্ডিত লোকটি বাদশাহর অনেক আশ্চর্যজনক প্রশ্নের জবাব দিয়ে বাদশাহকে অবাক করে দিলেন।

আকতার জাহান: একদিন পণ্ডিত ব্যক্তিটি বললেন: জাঁহাপনা, বহুদিন তো আপনার মেহমানখানায় ছিলাম, বেশ খাওয়া-দাওয়াও করেছি, এবার আমি অন্য দেশে যাব, কারণ দেশভ্রমণ আমার নেশা। এতে জ্ঞানের পরিধি বাড়ে এবং বিচিত্র মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়।

গাজী আবদুর রশিদ: বাদশাহ বললেন: ঠিক আছে, তবে যাওয়ার আগে আমার শেষ প্রশ্নের উত্তরটা আপনাকে দিয়ে যেতে হবে। জ্ঞানী ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গেই বাদশাহর কাছে শেষ প্রশ্নটি জানতে চাইলেন। তখন বাদশাহ বললেন, বলুনতো! আমি কার ছেলে?

আকতার জাহান: এবার জ্ঞানী লোকটি বললেন: হুজুর এ অনেক কঠিন প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর শুনলে আপনি আমার গর্দান কেটে নেবেন।

গাজী আবদুর রশিদ: বাদশাহ অভয় দিয়ে বললেন: কখনোই না। আপনি নির্ভয়ে বলুন।

আকতার জাহান: লোকটি বললেন, জাহাপনা, আপনি একজন রুটিওয়ালার ছেলে।

গাজী আবদুর রশিদ: এ কথা শুনে রাজার দরবারের লোকজন ভয়ে কেঁপে উঠল। রাজসভায় গুঞ্জন শুনে বাদশাহ দাঁড়িয়ে বললেন, থামুন আপনারা, আমার পূর্ব পুরুষ যে বাদশাহ ছিলেন- এ কথাতো আপনারা সবাই জানেন। তবে আমি জ্ঞানীর জ্ঞানকে শ্রদ্ধা করি, তাই আমি ভেবেচিন্তে আগামীকাল জানাব যে, জ্ঞানী ব্যক্তির গর্দান কাটা যাবে- কী যাবে না।

আকতার জাহান: এ কথা বলে বাদশাহ প্রাসাদের ভেতরে তার মায়ের ঘরের কাছে চলে গেলেন। অসময়ে নিজের ছেলের চিন্তাযুক্ত মুখচ্ছবি দেখে বাদশাহর মা চিন্তিত হলেন। বাদশাহ তার মায়ের পায়ের কাছে বসে বললেন, 'মা আমি আজ চরম পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছি।' এই বলে বাদশাহ মায়ের কাছে জ্ঞানী লোকটির সব কথা খুলে বললেন।

গাজী আবদুর রশিদ: তখন বাদশাহর মা নম্রভাবে বাদশাহকে বললেন, ‘হ্যাঁ বাবা! তুমি একজন রুটিওয়ালার ছেলে। আমাদের বংশ রক্ষা করার মতো কেউ ছিল না। এ নিয়ে আমাদের মনে খুব দুঃখ ছিল। একদিন আমাদের রাজ্যের এক রুটির দোকানদারের খুব সুন্দর ফুটফুটে একটি ছেলে হলো। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই সেই রুটিওয়ালা এবং তার বউ বজ্রপাতে মারা গেল, আর অসহায় অবস্থায় সেই ছোট্ট শিশুটি বাড়ির এক কোণে পড়ে রইল। তুমিই সেই অসহায় শিশু। সেই রুটিওয়ালার কথা সবাই ভুলে গেল এবং তুমি আমাদের রাজ বংশের পুত্রসন্তান হিসেবে পরিচিতি পেয়ে বড় হয়ে উঠলে।

আকতার জাহান: পরদিন বাদশাহ খুশি মনে রাজসভায় গিয়ে বসলেন। জ্ঞানী ব্যক্তিটিও বাদশাহকে সালাম জানিয়ে নিজ আসন গ্রহণ করলেন। তখন ঘটল এক অবাক কাণ্ড!

বাদশাহ সিংহাসন ছেড়ে জ্ঞানী ব্যক্তিটির কাছে উঠে এলেন এবং তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আপনার জ্ঞানকে আমি শ্রদ্ধা করি, কারণ সত্যিই আমি একজন রুটিওয়ালার ছেলে। কিন্তু আপনার কাছে এই মুহূর্তে আমার একটা প্রশ্ন, আপনি কিভাবে বুঝলেন আমি রুটিওয়ালার ছেলে?

গাজী আবদুর রশিদ: এ কথা শুনে জ্ঞানী ব্যক্তিটি মৃদু হেসে নম্রভাবে বললেন, আপনার উপহার দেয়ার ধরন দেখে। কারণ যতবার আমি আপনার বিভিন্ন প্রশ্নের সঠিক জবাব দিয়েছি ততবার উপহার হিসেবে আপনি আমাকে রুটি দিয়েছেন। কিন্তু বাদশাহ হিসেবে আপনি আমাকে অন্য কোনো উপহার দেননি। আর এ থেকে আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, আপনি একজন রুটিওয়ালার ছেলে।

আকতার জাহান: তারপর বাদশাহ জ্ঞানী ব্যক্তিটির সঙ্গে একমত হলেন এবং খুশিমনে তাকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। যাওয়ার সময় জ্ঞানী ব্যক্তিটি সবার উদ্দেশে বলে গেলেন- নামে নয়, গুণেই মানুষের আসল পরিচয়, কারণ নামে কখনো আভিজাত্য প্রকাশিত হয় না। মানুষের নিজের আচার-ব্যবহারের মাধ্যমেই তার বংশমর্যাদা ও আভিজাত্য ফুটে ওঠে।

গাজী আবদুর রশিদ: বন্ধুরা, এবারে রয়েছে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে একটি বিখ্যাত কবি। কবি শামসুর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছে ওয়াজিহা কাইউম। 

আকতার জাহান: ওয়াজিহা কাইউমের চমৎকার উচ্চারণে কবিতাটি শুনলে। বন্ধুরা, এবারে থাকছে একটি দেশে গান। ‘আমার দেশের স্বাধীনতা’ শিরোনামের গানটির কথা ও সুর: মতিউর রহমান খালেদের। আর গেয়েছে সিলেটের দিশারী শিল্পীগোষ্ঠীর শিশুশিল্পীরা। 

গাজী আবদুর রশিদ: ছোট্ট বন্ধুদের কণ্ঠে চমৎকার গানটি শুনলে। আশা করি তোমাদের ভালো লেগেছে।

আকতার জাহান: তো বন্ধুরা, তোমাদের সবাইকে মহান স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর। কথা হবে আবারো আগামী আসরে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।