আসমাউল হুসনা (পর্ব-৩৪)
মহান আল্লাহর আসমাউল হুসনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম গাফুর। এর অর্থ যিনি অত্যন্ত দয়ালু ও ক্ষমাশীল এবং পাপী পাপ করার পর তওবা করলে তিনি তাকে ক্ষমা করেন।
মহান আল্লাহর গাফুর নাম তার গাফ্ফার নামের খুব কাছাকাছি। গাফ্ফার নামের অর্থ অত্যন্ত ক্ষমাশীল। আর গাফুর অর্থও অত্যন্ত ক্ষমাকারী, তবে তা আরও ব্যাপক ও গভীর মাত্রা বোঝায়। গাফুর নামের সুবাদে মহান আল্লাহ অনুতপ্ত ও তওবাকারী পাপীকে এত ভালবাসেন যে তিনি পাপীকে ক্ষমা তো করেনই ও তাকে খোদায়ি রহমতের দরিয়ায় স্থান দেন এবং এমনকি তার পাপগুলোকেও পুণ্যে রূপান্তর করেন। সুরা ফুরক্বানের ৭০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ নিজেকে গাফুরুর রাহিম হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন:
যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে এবং দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -
গাফুর শব্দের মূল হচ্ছে গাফার যার অর্থ আচ্ছাদিত থাকা বা ঢাকা থাকা, সুরক্ষিত ও নিরাপদ থাকা। অবশ্য পাপ বা ত্রুটি গোপনকারী আল্লাহর সাত্তার নামের অনুগ্রহে দোষ ও পাপ যদি ঢাকাও থাকে তবুও তা নির্মূল হয়ে যায় না। কিন্তু গাফুর নামের সুবাদে পাপ যখন ঢাকা হয় তখন পাপের আর কোনো প্রভাব বা চিহ্নও বাকি রাখা হয় না। এমনকি যে ফেরেশতা বান্দাহ'র পাপাচার দেখেছেন তাঁর স্মরণ থেকেও সেসবই মুছে যায় যাতে বান্দা বিচার দিবসে কলঙ্কিত না হন। এ ছাড়াও তওবাকারীর জন্য গাফুর হিসেবে মহান আল্লাহ তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ ও নেয়ামত প্রদানের ধারা চালু করেন যাতে তার ভেতরকার দোষ-ত্রুটি ও পাপ তথা গোপন দোষ-ত্রুটি ও পাপ লুপ্ত হয়ে যায় এবং সে অগ্রগতি ও পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
মহান আল্লাহ সুরা ফাত্হ্-এর প্রথম দুই আয়াতে বলেছেন, হে নবী! নিশ্চয়ই আমি আপনার জন্যে এমন একটা বিজয় এনে দিয়েছি, যা সুস্পষ্ট। যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যৎ পাপ ও ত্রুটিগুলোর যেসব অপবাদ আপনাকে দেয়া হয়েছে ও হবে সেসবই মার্জনা করে দেন তথা ঢেকে দেন এবং আপনার পরিপূর্ণ সততা ও সত্য ধর্মের বিষয়টি প্রমাণ হয়ে আপনার প্রতি আল্লাহর নেয়ামত পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। - অর্থাৎ যত অপবাদ ও মন্দ কথা মহানবীকে দেয়া হয়েছে বা শোনানো হয়েছে সেসবই মহান আল্লাহ বিলুপ্ত করবেন। যেমন, কাফিররা বলত মুহাম্মাদ যাদুকর, আরবদের প্রথাগুলো অগ্রাহ্যকারী, কবি, পাগল-এসব কথাকেই অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য করে চিরতরে বিলুপ্ত করবেন মহান আল্লাহ। আল্লাহ গাফুর হিসেবে কেবল পাপই নয় মন্দ কথা, গালি ও অপবাদ জাতীয় এসব কিছুকেও ঢেকে ফেলেন।
পবিত্র কুরআনে গাফুর নাম ৯১ বার এসেছে। এর মধ্যে ৭২ বারই এসেছে আল্লাহর রাহিম নামের সঙ্গে। এ বিষয়টি আমরা যারা পাপী তাদের সবার জন্যই অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক সুসংবাদ। গাফুর ও রাহিম তথা ক্ষমাশীল ও দয়াময় পরস্পরের পরিপূরক। কারণ ক্ষমা হচ্ছে দয়ারই মাধ্যম। আল্লাহর ক্ষমাশীলতা না থাকলে দয়াও থাকতো না। আবার দয়া না থাকলে ক্ষমারও কোনো পথ থাকতো না।
মহান আল্লাহ সুরা জুমার-এর ৫৩ নম্বর আয়াতে নিজের ওপর জুলুমকারী ও অপচয় বা বাড়াবাড়ির পাপে জড়িতদের ক্ষমা করবেন বলে সুসংবাদ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তাঁর রহমতের ব্যাপারে হতাশ না হতেও নিষেধ করেছেন তা বান্দাহ যত বেশি পাপই করুক না কেনো। মহান আল্লাহ ছোট-বড় প্রকাশ্য ও গোপন সব পাপই ক্ষমা করবেন। তবে শর্ত হল পাপের ব্যাপারে আন্তরিকভাবেই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং তওবার পর থেকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মান্য করে পাপ বর্জন করতে হবে। সুবহানআল্লাহ মহান আল্লাহ কত বেশি ক্ষমাশীল!
মহান আল্লাহর ক্ষমাশীলতা আমাদের ভাগ্যে রয়েছে এমন আশা পোষণকারীর উচিত অন্যদের ভুল-ত্রুটি ও অন্যায় আচরণগুলো ক্ষমা করে দেয়া। পবিত্র কুরআনে ক্ষমাশীলতাকে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। নিজেকে গাফুরুর রাহিম হিসেবে উল্লেখ করে মহা আল্লাহ বলছেন:
তোমাদের মধ্যে যারা উচ্চমর্যাদা ও আর্থিক প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন কসম না খায় যে, তারা আত্মীয়-স্বজনকে, অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর পথে হিজরতকারীদেরকে কিছুই দেবে না। তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং দোষক্রটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি কামনা কর না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। (সুরা নুর:২২/ ২৪:২২)
হযরত ইউসুফ নবী তার প্রতি ব্যাপক এবং নিকৃষ্টতম জুলুমকারী ও হিংসা পোষণকারী ভাইদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তার ভাইয়েরা যখন মিশরের গভর্নরে পরিণত হওয়া ইউসুফের কাছে ক্ষমা চায় তখন তিনি তাদের বললেন: আজ তোমাদের জন্য কোনো তিরস্কার করব না, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু।
মহানবী (সা) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতও ছিলেন আত্মসমর্পিত ও পরাস্ত শত্রুদের প্রতি আরও অনেক বেশি দয়ালু ও ক্ষমাশীল।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/১৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।