ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (পর্ব-৮২): কারবালা-৫ অভিযানের অর্জন ও ক্ষয়ক্ষতি
গত আসরে আমরা ইরাকের বসরা নগরীর পূর্বে ইরাকি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যুহের ওপর ইরানি যোদ্ধাদের নজিরবিহীন হামলা নিয়ে কথা বলেছি।
ইরাকের অভ্যন্তরে ইরান যেসব অভিযান চালিয়েছে কারবালা-৫ নামের ওই অভিযান ছিল সেগুলোর অন্যতম। ইরানি যোদ্ধাদের মুহূর্মুহূ আক্রমণের মুখে বসরা নগরী পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। এই অভিযানের পরিকল্পনা করেছিল ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এবং এ ঘটনায় এই বাহিনীর উচ্চ মাত্রার সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। ইরাকি বাহিনীকে হতচকিত করে দিয়ে ইরানি যোদ্ধাদের এ অভিযান শুরু হয়।
কারবালা-৫ অভিযানে আরো প্রমাণ হয়েছিল, জটিল ও কঠিন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার ও শত্রু সেনাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহ তছনছ করে দেয়ার সক্ষমতা আইআরজিসি’র রয়েছে। এই অভিযানে ইরাকের ১৫০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা ইরানি যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কারবালা-৫ অভিযানে ইরাকের ৪০ জন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা ও ৪০ জন মধ্যম সারির কর্মকর্তাসহ দুই হাজার ৬৫৫ জন সেনা ইরানের হাতে বন্দি হয়। ইরানের হামলায় ইরাকের ৫৫টি ব্রিগেডের ক্ষতি হয়, ৮৭০টি ট্যাংক, ১৮০টি ফিল্ড কামান ও এক হাজার গাড়ি ধ্বংস হয়। প্রায় ৯০ হাজার ইরাকি সেনা হতাহত হয় এবং ৩০টি বিমান ও সাতটি হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়। ৪৫ দিনের লড়াইয়ের পর আর কোনো ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন যাতে হতে না হয় সেজন্য যুদ্ধ থেকে ইরাকি বাহিনী নিজেদের গুটিয়ে নেয়। কারবালা-৫ অভিযানের ফলে ইরাকের ২৩০টি ট্যাংক, ২০টি কামান, ২০০টি গাড়ি গনিমতের মাল হিসেবে গ্রহণ করে ইরান।
কারবালা-৫ অভিযান ছিল ইরাক-ইরান আট বছরের যুদ্ধে সবচেয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধ এবং এই অভিযানে প্রায় ১২ হাজার ইরানি যোদ্ধা শহীদ ও অপর প্রায় ১৫ হাজার জন আহত হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সাল ছিল ইরাক-ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছর। ওই বছর ইরানের বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধা মিলে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ শাহাদাতবরণ করেন। এই অভিযানে আইআরজিসির নানা স্তরের অফিসারসহ প্রায় ৩৫০ সেনা কমান্ডার শাহাদাতবরণ করেন। এসব অকুতোভয় যোদ্ধার মধ্যে ছিলেন মেজর জেনারেল হোসেইন খাররাজি, ইয়াদুল্লাহ কোহলোর, ইসমাইল দাকায়েকি, হাশেম এ’তেমাদি, হাজি কাসেম মির-হোসেইনি, মোহাম্মাদ ফোরুমান্দিসহ আরো অনেক কমান্ডার।
কারবালা-৫ অভিযান শুরুর আগে শহীদ মেজর জেনারেল খাররাজি এক বৈঠকে সব ইরানি কমান্ডারের কাছ থেকে এই শপথ নেন যে, তারা প্রয়োজনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবেন কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে এক পা-ও পিছু হটবেন না। তিনি বলেন, যাদের শহীদ হওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই তারা যেন এই অভিযানে অংশ না নেয়। কারণ, এতে অনেক বেশি মানুষ মারা পড়বে এবং এর সঙ্গে অতীতের অন্য কোনো অভিযানের মিল থাকবে না। অভিযান শুরু হওয়ার পর জেনারেল খাররাজির ডিভিশনটি ইরাকি বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষতি করে শত্রু সীমান্তের অনেকখানি ভেতরে চলে যায়। রণকৌশলে সিদ্ধহস্ত হওয়া ছাড়াও হোসেইন খাররাজির সাহসিকতাও ছিল নজিরবিহীন। আগের একটি অভিযানে একটি হাত হারিয়ে তিনি বিকলাঙ্গ হয়ে যান। কিন্তু বাকি একটি হাত নিয়ে তিনি ইরাক-ইরান যুদ্ধের বেশ কয়েকটি অভিযানে বীরোচিত যুদ্ধ করেন এবং কখনোই নিজের দুর্বলতা প্রদর্শন করেননি।
কারবালা-৫ অভিযানের পর ১৯৮৬ সালের ৯ এপ্রিল কারবালা-৮ অভিযান চালায় ইরান। পাঁচদিন ব্যাপী ওই অভিযানেরও সম্মুখযোদ্ধা ছিল ইসলামি বিপ্লবী গার্ডবাহিনী বা আইআরজিসি। ওই অভিযানে শত্রু সেনাদের ৬০টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানসহ তাদের অসংখ্য অস্ত্রসস্ত্র ও গোলাবারুদ ধ্বংস হয়ে যায়। এ সময় আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর পাঁচ হাজারেরও বেশি সেনা হতাহত হয় এবং ইরানি যোদ্ধারা বিপুল পরিমাণ গনিমতের মাল হস্তগত করেন।
ইরাকের সাদ্দাম সরকারের প্রতি আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা সত্ত্বেও বসরা নগরীর পূর্বাঞ্চলে চালানো এসব অভিযানে ইরানের অভাবনীয় সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেহরানের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করে। কারবালা-৫ অভিযানে ইরানের শক্তিমত্তা প্রদর্শিত হওয়ার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে আগ্রাসী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে ৫৯৫ নম্বর প্রস্তাব অনুমোদন করে।
কারবালা-৫ অভিযানে বসরা নগরীর পতন অনেকাংশে অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছিল। পশ্চিমা অনেক বিশ্লেষক এ মন্তব্য করেছিলেন যে, ইরান তাৎক্ষণিকভাবে আরেকটি বড় অভিযান চালাতে পারলেই ইরাকি বাহিনীর প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে এবং ইরান এ যুদ্ধে বিজয়ীর বেশে ঘরে ফিরবে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা পেন্টাগনের যেসব বিশ্লেষক যুদ্ধের গোটা সময়টাকে ইরানের যেকোনো অর্জনকে খাটো করে দেখে এসেছিলেন তারাও এবার ইরানের বিজয়কে অত্যাসন্ন বলে ভাবতে শুরু করেন। সাদ্দামের প্রধান পৃষ্ঠপোষক আমেরিকার জন্য এ যুদ্ধে ইরানের বিজয় মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। এ কারণে ইরানের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়ার জন্য মার্কিন সরকার সাদ্দামের প্রতি সহযোগিতা বাড়িয়ে দেয়। কারবালা-৫ অভিযানে আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হয়। তা হচ্ছে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সহযোগিতা ছাড়া ইরাকি বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করাই সম্ভব নয়।
অবশ্য এই অভিযানে বড় ধরনের সাফল্য অর্জিত হলেও ইরান যে লক্ষ্য নিয়ে এটি শুরু করেছিল তা অর্জিত হয়নি। ইরান এই অভিযানে ইরাকি বাহিনীর বড় রকমের ক্ষতি করে যুদ্ধের ইতি টানতে চেয়েছিল যা সম্ভব হয়নি। এই অভিযানে ইরান যে বিষয়টি উপলব্ধি করে তা হলো, দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে ইরাকের বিরুদ্ধে আর কোনো বড় অভিযান চালানো যাবে না। এ কারণে এরপরের দু’টি অভিযান চালানো হয় পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে। ইরানি যোদ্ধারা যখন বায়তুল মুকাদ্দাস-২ ও ওয়ালফাজর-১০ নামের ওই দুই অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন ইরাকের সহযোগী আমেরিকা পারস্য উপসাগরে নয়া খেলায় মেতে ওঠে। তৎকালীণ সোভিয়েত ইউনিয়নও সাদ্দামকে সম্ভাব্য পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে বাগদাদকে এস-১২ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেয়।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ২৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।