ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (পর্ব-৮৭): ইরাক-ইরান যুদ্ধের ভারসাম্যে পরিবর্তনের কারণ
যুদ্ধের শেষভাগে এসে ইরানের কয়েকটি সফল অভিযানে পর্যুদস্ত হয়ে ইরাকের শাসক সাদ্দাম ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে অপ্রচলিত অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
ইরাকি বাহিনীর নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্রের হামলায় ইরানের হাজার হাজার যোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের তৎকালীন দুই পরাশক্তির মদদে এসব হামলা চালায় আগ্রাসী বাহিনী। সাদ্দাম বাহিনীকে কোন কোন দেশ রাসায়নিক অস্ত্র সরবরাহ করেছিল সে তথ্য পরবর্তীতে প্রকাশ পায়। ২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ ইরাকের কাছে থাকা রাসায়নিক অস্ত্রকে গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি ঘোষণা করে দেশটির ওপর আগ্রাসন চালানোর নির্দেশ দেন। কারণ, ওয়াশিংটনের জানা ছিল, তাদের কাছ থেকে পাওয়া বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক অস্ত্রের পুরোটা ইরাক-ইরান যুদ্ধে ব্যবহার করেনি বাগদাদ।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকের প্রতি আন্তর্জাতিক অকুণ্ঠ সমর্থন যদিও ওই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছিল কিন্তু তারপরও ইরান যুদ্ধের ময়দানে নিজের ভাগ্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বসরার পূর্ব প্রান্তে ইরানি যোদ্ধারা সাফল্যের সঙ্গে কারবালা-৫ অভিযান চালান। ওই অভিযানে ইরাকি বাহিনী বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হলে বাগদাদের প্রধান মিত্র আমেরিকার ইরানবিরোধী বক্তব্য আরো প্রখর হয়ে ওঠে। স্বয়ং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ইরানের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় বক্তব্য রাখেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের এসব বক্তব্যের জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেনী (রহ.) ১৯৮৭ সালের ২৯ মে এ ভাষণে বলেন, “আপনারা নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন ইরান সরকার বন্য আচরণ করছে। বন্য যদি এই অর্থে হয় যে, ইরান তোমাদের পোষ মানছে না এবং তোমাদের নির্দেশমতো কাজ করছে না তাহলে তোমরা এই আচরণের বিশেষণ যা খুশি তাই দিতে পারো। ”
ইমাম খোমেনী আরো বলেন, “মার্কিনীদের দৃষ্টিতে তাদের পোষ না মানা যে কাউকে তারা সন্ত্রাসী বলতেও দ্বিধা করে না। আপনারা দেখেছেন, ইরাক যতদিন আমেরিকার কথা মেনে চলেনি ততদিন বাগদাদ তাদের দৃষ্টিতে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ছিল। যখনই সাদ্দাম সরকার পোষ মানতে শুরু করেছে তখনই তাকে সন্ত্রাসবাদের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে আমেরিকা।” ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা আরো বলেন, “এটি হচ্ছে রিগ্যানদের মতো ব্যক্তিদের যুক্তি ও দর্শন। এই দর্শন ব্যবহার করে আমেরিকা সারাবিশ্বে লুটপাট চালাচ্ছে এবং নির্যাতিত জনগোষ্ঠীগুলোকে পায়ের তলায় পিষে মারছে। কাজেই হে ইরানি জনগণ, আমেরিকার বিরুদ্ধে সামান্যতম দুর্বলতা দেখালে কিন্তু তোমাদেরকে পায়ের তলায় পিষ্ট হতে হবে। ”
আমেরিকা ১৯৮৭ সালে পারস্য উপসাগরে ইরাকের সমর্থনে সরাসরি নৌ উপস্থিতি জোরদার করে। ইরাক যাতে নির্বিঘ্নে ইরানের তেল ট্যাংকারগুলোর পাশাপাশি ইরানি নৌবন্দরগুলোতে হামলা চালাতে পারে সে ব্যবস্থা করে দেয় মার্কিন সেনারা। তারা পারস্য উপসাগরে ইরানের নৌ ও বিমান বাহিনীর তৎপরতা সীমিত করে দেয়। এর মাধ্যমে প্রকারান্তরে আমেরিকা সরাসরি ইরাক-ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। ফলে ইরাকি স্বৈরশাসক সাদ্দাম এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক রূপ দেয়ার যে চেষ্টা করছিল তা অনেকাংশে সফল হয়।

এ সময় ইরাকি সেনারা যেসব স্থানে কঠিন আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে ছিল সেসব স্থান দিয়ে দেশটির ওপর হামলা চালানো সহজসাধ্য ছিল না। এ কারণে ইরানি সেনা কমান্ডাররা ইরাকের দুর্বল অবস্থানগুলো চিহ্নিত করে আকস্মিক আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেন। এই কৌশল অবলম্বন করে ‘হোর’ এলাকায় ‘খায়বার’ ও ‘বাদর’ অভিযান চালানো হয়। ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় ‘ফাও’ উপত্যকা দখল ছিল ইরানের এই কৌশলের সবচেয়ে বড় সাফল্য যা যুদ্ধের মোড় ইরানের পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে সহায়তা করে। এর আগ পর্যন্ত ইরানের পক্ষে এতবড় বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়নি। ইরানের এই বিশাল বিজয়ের ফলে ইরাক নড়েচড়ে বসে এবং এতদিন ইরানের সামরিক শক্তিকে অবহেলাকারী সাদ্দাম সরকার নিজের সমরসজ্জাকে ঢেলে সাজাতে বাধ্য হয়।
তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর বিশেষজ্ঞ কর্নেল আলেক্সান্ডার কুলিকো ১৯৮৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইরানের হাতে ইরাকের ফাও উপত্যকা দখলের গুরুত্ব বর্ণনা করেন। তার দৃষ্টিতে এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ড দখল করা ছিল না বরং এর মাধ্যমে একটি সামরিক বার্তা দেয়া হয়েছিল। আর বার্তাটি ছিল এই যে, ইরানের পক্ষে ইরাককে পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দেয়া সম্ভব না হলেও যদি তেহরানকে সুযোগ দেয়া হয় তাহলে সে ইরাকের সমরশক্তির ধার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে দিতে সক্ষম হবে।
কারবালা-৫ অভিযানে ইরানের হাতে দখল হয়ে যাওয়া ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে হতাশ হয়ে ইরাকি শাসক সাদ্দাম তার শীর্ষস্থানীয় সেনা কমান্ডারদের নিয়ে এক বৈঠকে বসেন যা পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হয়।
বৈঠকে রিপাবলিকান গার্ড রেজিমেন্টকে আরো শক্তিশালী করা, পাল্টা হামলা চালানোর জন্য বিমান বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি, তেল ট্যাংকারগুলোতে হামলা বৃদ্ধি এবং আরো বেশি রাসায়নিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দুই পরাশক্তিও এ সময় ইরাকের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের আধুনিকতম সমর সম্ভার বাগদাদের জন্য উন্মুক্ত দেয় দেয়। মাত্র দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ফ্রান্স ইরাকের কাছে ৫৬০ কোটি ডলারের এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ৯৩০ কোটি ডলারের সমরাস্ত্র বিক্রি করে। সেইসঙ্গে সাদ্দাম বাহিনীর কাছে আমেরিকা ও জার্মানি থেকেও বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র পৌঁছে যায়। পক্ষান্তরে ইরানের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাখে পরাশক্তিগুলো। ইরানের তেল বিক্রির ওপরও নানারকম সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ /০৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।