ইমাম হুসাইনের জন্য শোক প্রকাশ করেছিলেন ইমাম শাফিয়ি
শোক বিষয়ক প্রাচীন কবিতা ও ইসলামের সুন্নি ধারার শোক প্রকাশের ঐতিহ্য
আহলে সুন্নাত আল জামাআতের প্রখ্যাত চার মাজহাবের অন্যতম ইমাম ও শাফিয়ি মাজহাবের প্রধান ইমাম শাফিয়ি মহানবীর (সা) আহলে বাইতের দুঃখ ও মুসিবতের কথা স্মরণ করে এক শোক-গাঁথা বা শোকের কবিতা রচনা করেছিলেন। ওই কবিতায় তিনি লিখেছেন:
হৃদয় আমার ফুলে উঠেছে গভীর শোকে ও মনটা ভরে আছে বিষাদে,
চোখ আমার অশ্রু-সজল অনুভব করছি নিঃসঙ্গতা!
শোক ও দুঃখ ঘুম কেড়ে নিয়েছে আমার, আমাকে করেছে বৃদ্ধ!
এসবের কারণ কালের সেই বিবর্তন যা যা তাঁদের জন্য খুবই কষ্টদায়ক ছিল।
আলে মুহাম্মাদ তথা নবী-পরিবারের শোকে দুনিয়াটা কাঁপছে!
যেন গোড়া থেকেই গলে যাবে বা ধসে পড়বে পাথুরে পাহাড়গুলো!
নক্ষত্র ও তারকাগুলো ছিটকে পড়েছে এবং উল্কারাজি ডুবেছে!
(ইমাম হুসাইনের তথা নবী-পরিবারের) নারীদের পর্দার অসম্মান করা হয়েছে !
(শহীদদের) পোশাকগুলো ছিন্ন-ভিন্ন, বক্ষগুলো বিদীর্ণ হয়েছে!
কেউ কি আছে পৌঁছে দেবে হুসাইনের কাছে আমার বার্তা
একদল তাতে অসন্তুষ্ট হলেও পৌঁছে দেবে তা?
যাকে হত্যা করা হয়েছে বিনা অপরাধে!
তাঁর পোশাক যেন লাল গোলাপের রঙে রঞ্জিত !
অতএব, তলোয়ারের জন্যই বিলাপ ও আর্তনাদ এখন
এবং বর্শার জন্যই বেদনার দীর্ঘশ্বাস,
আর ঘোড়াগুলোর জন্যও এখন রয়েছে ক্রন্দন
যেসব আগে শুধু হ্রেষা করত।
আমরা পাঠাই দরুদ তাঁদের ওপর
যারা হাশেমি বংশের (নবী-পরিবার) নির্বাচিত ব্যক্তিত্ব!
অথচ তাঁদের সন্তান বা বংশধরদের হত্যা করে শোকার্ত করছি তাঁদের!
এ বড়ই অদ্ভুত বস্তুত!
নবী পরিবারের অনুরাগ যদি আমার হয়ে থাকে পাপ!
তবে এই পাপের জন্য আমি করব না কখনও তওবা বা অনুতাপ!
কারণ তারা তো বিচার দিবস বা কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশকারী!
অথচ কি করে হয় পাপ তাদের প্রতি আমার (আমি শাফিয়ির) অনুরাগ!
ইমাম শাফিয়ি তার কবিতা বা ক্বাসিদায় আরো লিখেছেন:
ওরা অভিযোগ করে: তুমি রাফেজি বা শিয়া নিশ্চয়!
আমি বলি: না আমি তা নই আমার ধর্ম বা বিশ্বাস তেমন নয়
তবে শিয়ার অর্থ যদি আলে মুহাম্মাদ বা নবী-বংশের প্রেম হয়
তাহলে সাক্ষী থাকুক জিন-ইনসান আমিও শিয়া সুনিশ্চয়!
[আরবি টেক্সট:
تاوب همی والفؤاد کئیب •••••• وارق عینی والرقاد غریب
ومما نفی نومی وشیب لمتی •••••• تصاریف ایام لهن خطوب
تزلزلت الدنیا لآل محمد •••••• وکادت لهم صم الجبال تذوب
وغارت نجوم واقشعرت ذوائب •••••• وهتک اسباب وشق جیوب
فمن مبلغ عنی الحسین رسالة •••••• وان کرهتها انفس وقلوب
قتیل بلا جرم کان قمیصه •••••• صبیغ بماء الارجوان خضیب
نصلی علی المختار من آلهاشم •••••• وتعزی بنوه ان ذا لعجیب
لئن کان ذنبی حب آل محمد •••••• فذلک ذنب لست عنه اتوب
نعم، شفعائی یوم حشری وموقفی •••••• وحبهم للشافعی ذنوب
ان ﮐﺎن رﻓﻀﺎ ﺣﺐ ﺁل ﻣﺤﻤﺪ
ﻓﻠﻴﺸﻬﺪ اﻟﺜﻘﻼن اﻧﯽ راﻓﻀﯽ
ইমাম শাফিয়ির কবিতার ইংরেজি অনুবাদ:
My heart sighed, for my innermost being was in dejection;
Sleep no longer came, and sleeplessness was bewildering.
O who shall be the bearer of a message from me to Husayn,
(Though the hearts and minds of some may disapprove!)
Slaughtered, though without sin himself,
His shirt as if dyed through with crimson.
Now the sword itself wails, and the spear shrieks,
And the horse which once only whinnied, laments.
The world quaked for the sake of the Family of Muhammad;
For their sake, the solid mountains might have melted away.
Heavenly bodies sunk, the stars trembled,
Oh veils were torn, and breasts were rent!
He who asks blessing for the one sent from the Tribe of Hashim,
But attacks his sons; truly, that is strange!
And if my sin is love of the Family of Muhammad:
Then that is a sin which I do not repent.
(Translator: Lynda Clarke, Elegy (Marthiya) on Husayn: Arabic and Persian)]
ইমাম শাফিয়ি তার আরেকটি কবিতায় আহলে বাইত –এর প্রতি তার ভালোবাসা এভাবে প্রকাশ করেছেন :
اذا ﻓﯽ ﻣﺠﻠﺲ ذﮐﺮوا ﻋﻠﻴﺎ
وﺷﺒﻠﻴﻪ و ﻓﺎﻃﻤﺔ اﻟﺰکیة
ﻳﻘﺎل: ﺗﺠﺎوزوا ﻳﺎ ﻗﻮم ﻋﻦ ذا
ﻓﻬﺬا ﻣﻦ ﺣﺪﻳﺚ اﻟﺮاﻓﻀﻴﻪ
هرﺑﺖ اﻟﻲ اﻟﻤﻬﻴﻤﻦ ﻣﻦ اﻧﺎس
ﻳﺮون اﻟﺮﻓﺾ ﺣﺐ اﻟﻔﺎﻃﻤﻴﻪ
ﻋﻠﻲ ﺁل اﻟﺮﺳﻮل ﺻﻠﻮة رﺑﻲ
وﻟﻌﻨﺔ ﻟﺘﻠﻚ اﻟﺠﺎهلیة
-’যখন কোনো মজলিসে লোকেরা আলীকে স্মরণ করলো, আর তার দুই সিংহ শাবককে (তার দু’পুত্রকে) ও পবিত্র ফাতিমাকে , বলা হল: হে লোকেরা! (সাবধান!) ওরা সীমালঙ্ঘন করেছে এ (ইসলামের সীমারেখা) থেকে,আর এ মত দেয়া হয় হাদিসে রাফেযিয়াহর ভিত্তিতে,(কিন্তু) আমি ঐসব লোক থেকে মুহাইমেনের (আল্লাহ তা’আলার) দিকে পালিয়ে গেলাম,ফলে (আমার মধ্যে) মুহাববাতে ফাতিমিয়াহ সুদৃঢ় হল, আমার রবের সালাওয়া আলে রাসূলের ওপর, আর লা’নত ঐ জাহেলিয়াতের ওপর।’
ইবনে হাজার মাক্কীও ইমাম শাফেয়ী থেকে নিম্নোক্ত পঙক্তি উদ্ধৃত করেছেন :
ﻳﺎ اهل ﺑﻴﺖ رﺳﻮل اﷲ ﺣﺒﻜﻢ
ﻓﺮض ﻣﻦ اﷲ ﻓﻲ اﻟﻘﺮﺁن اﻧﺰﻟﻪ
کفاکم ﻣﻦ ﻋﻈﻴﻢ اﻟﻘﺪر اﻧﻜﻢ
ﻣﻦ ﻟﻢ ﻳﺼﻠﻲ ﻋﻠﻴﻜﻢ ﻻﺻﻠﻮة ﻟﻪ
‘হে রাসূলুল্লাহর আহলে-বাইত! তোমাদের (প্রতি) মুহাববাত, আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরয করা হয়েছে তার নাযিলকৃত কুরআনে, এটাই যথেষ্ট যে,(তোমাদের মধ্যে) মহান মর্যাদা পুঞ্জীভূত হয়েছে, অতএব,নিঃসন্দেহে তোমরা হচ্ছে সেই ব্যক্তিগণ,যে ব্যক্তি তোমাদের ওপর সালাত (দরুদ) প্রেরণ করেনি তার জন্য কোনো সালাত (নামায ) নেই (অর্থাৎ তার নামাজ বাতিল গণ্য হবে তথা কবুল হবে না)।’
মহানবীর (সা) আহলে বাইতের প্রতি হাম্বালি মাজহাবের প্রখ্যাত মনীষী ইবনে জাওযি'র শোক-প্রকাশ :
খ্রিস্টিয় দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের মনীষী ইবনে জাওযি আতত্বাবসিরাত নামক বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী আশুরার দিন ইমাম হুসাইনের প্রতি শোক প্রকাশ করেছেন এভাবে:
المجلس الاول فی ذکر عاشوراء والمحرم... مجلس اول در ذکر عاشورا و محرم...
اخوانی: بالله علیکم من قبح علی یوسف بای وجه یلقی یعقوب لما اسر العباس یوم بدر سمع رسول الله (صلیاللهعلیهوآلهوسلّم) انینه فما نام، فکیف لو سمع انین الحسین؟
لما اسلم وحشی قال له: غیب وجهک عنی. هذا والله والمسلم لا یؤاخذ بما کان فی الکفر، فکیف یقدر الرسول (صلیاللهعلیهوآلهوسلّم) ان یبصر من قتل الحسین؟... لقد جمعوا فی ظلم الحسین ما لم یجمعه احد، ومنعوه ان یرد الماء فیمن ورد... وسبوا اهله وقتلوا الولد، ... هذا سوء معتقد. نبع الماء من بین اصابع جده فما سقوه منه قطرة کان الرسول (صلیاللهعلیهوآلهوسلّم) یحب الحسین یُقَبّل شفتیه ویحمله کثیرا علی عاتقیه، ولما مشی طفلا بین یدی المنبر نزل الیه، فلو رآه ملقی علی احد جانبیه والسیوف تاخذه والاعداء حوالیه والخیل قد وطئت صدره ومشت علی یدیه ودماؤه تجری بعد دموع عینیه لضج الرسول (صلیاللهعلیهوآلهوسلّم) مستغیثا من ذلک ولعز علیه
অর্থ: হে ভাইয়েরা! তোমাদের আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি: কারা হযরত ইউসুফের দোষ ধরে যে তিনি কিভাবে তার বাবা হযরত ইয়াকুবের সঙ্গে সাক্ষাতে যান? রাসুলের চাচা হযরত আব্বাস বদরের যুদ্ধে বন্দি হলে মহানবী (সা) তাঁর কান্না শুনতে পান! ফলে মহানবীর ঘুম আসেনি! (খুব শক্ত করে রশি দিয়ে আব্বাসের হাত বাঁধা হয়েছিল!) আর রাসুল তাঁর নাতি ইমাম হুসাইনের কান্না শুনলে কি করতেন? (যিনি কখনও কাফির ছিলেন না!)
রাসুলের চাচা হযরত হামজার হত্যাকারী ওয়াহশি যখন মুসলমান হয় তখন রাসুল (সা) তাঁকে বলেন: 'আমার সামনে তুমি তোমার চেহারা ঢেকে রাখ!' মুসলমানরা কাফের অবস্থায় যা যা করেছিল সে জন্য তাদের জবাবদিহি করতে হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাসুল ওই কথা বলেছিলেন! ইমাম হুসাইনের হত্যাকারীকে দেখলে রাসুল কি বলতেন! ইমাম হুসাইনের ওপর এত বেশি অত্যাচার করা হয়েছে যে তেমনটি আর কারো ওপর করা হয়নি! তাঁকে অন্যদের মত পানি পান করতে দেয়া হয়নি!.. তাঁর পরিবার-পরিজনকে বন্দি করা হয়েছিল। তাঁর সন্তানদের হত্যা করা হয়েছিল!... এটা তাদের মন্দ বিশ্বাসের নিদর্শন। (শৈশবে) নানার আঙুলগুলোর মধ্য থেকে (চুষিয়ে) তাঁকে পানি দেয়া হয়েছিল! অথচ সেই হুসাইনকেই এক ফোটা পানি পান করতে দেয়া হয়নি! নবী (সা) তাঁর ঠোঁটগুলোতে চুমো দিতেন! তাঁকে কাঁধের ওপর নিতেন! নবী (সা) যখন মিম্বরে বসতেন তখন শিশু হুসাইন তাঁর কাছে আসতেন! আর রাসুল শিশু হুসাইনকে দেখে মসজিদের মিম্বর থেকে নীচে নেমে আসতেন! আর এখন তিনি যদি দেখতেন ইমাম হুসাইন জমিনে পড়ে আছে আর শত্রুরা তাঁকে টুকরো টুকরো করছে ও শত্রুরা তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে এবং তাঁর বুকের ওপর ঘোড়া দাবড়ানো হয়েছে! এবং তিনি নিজেকে জমিনের ওপর হাত বিছিয়ে দিয়ে কিছুটা এগুলেন এবং তার রক্ত জমিনের ওপর অশ্রুর মত বয়ে যাচ্ছে!-মহানবী (সা) এমনসব দৃশ্য দেখে চিৎকার করে কেঁদে উঠতেন! ও বিচার দিতেন এবং তাঁর জন্য এটা খুবই কঠিন হত!
ইবনে জাওযি কারবালা সম্পর্কে এক কবিতায় লিখেছেন:
کربلاء زلت کرباً وبلا ما لقی عندک اهل المصطفی •••••• کم علی تربک لما صرعوامن دم سال ومن دمع جری
یا رسول الله لو عاینتهموهم ما بین قتل وسبا •••••• من رمیض یمنع الظل ومن عاطش یسقی انابیب القنا
لرات عیناک فیهم منظراللحشا شجوا وللعین قذی •••••• لیس هذا لرسول الله یاامة الطغیان والمین جزا
جزروا جزر الاضاحی نسلهثم ساقوا اهله سوق الاما •••••• هاتقات یا رسول الله فیبهر السعی وعثرات الخطا
قتلوه بعد علم منهم انه خامس اصحاب الکسا
হে কারবালা! তুমি সব সময়ই মুসিবতময় ছিলে! মহানবীর (সা) খান্দান তোমার কাছ থেকে কি কষ্টই না পেয়েছে? তাঁদের কত ব্যক্তি তোমার মাটিতে নিহত হয়েছে? তোমার মাটির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে কত রক্ত ও অশ্রু? হে নবী! আপনি যদি তাঁদের দেখতেন যারা হয় নিহত হয়েছে অথবা বন্দি হয়েছে! গরমে অতিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রোদের মধ্য দিয়ে তাঁদের নেয়া হত! ছায়ার মধ্য দিয়ে তাঁদের হাঁটতে দেয়া হয়নি! বর্শার আঘাত দিয়ে তাঁদের তৃষ্ণা পরিতৃপ্ত করা হয়েছে! এমনসব দৃশ্য দেখতেন যে তাতে আপনার হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে যেত এবং চোখে কাঁটা বিদ্ধ হত! হে অবাধ্য উম্মত! নবীর পুরস্কার তো এটা ছিল না! তাঁর বংশধরকে ভেড়ার মত কুরবানি করে টুকরো টুকরো করেছ! তাঁর খান্দানকে দাসীদের মত বন্দি করা হয়েছে! চিৎকার করে বলত হে নবী ! ভুলের ও জারজ সন্তানরা তাঁকে তথা হুসাইনকে হত্যা করেছে যদিও তারা জানতো যে তিনি হচ্ছেন রাসুলের চাদরের নীচে সমবেত পঞ্চম ব্যক্তি!
আশুরারা দিন ইবনে জাওযি'র পুত্রের গভীর শোক-প্রকাশ বা আযাদারি
এক বর্ণনায় এসেছে কোনো এক আশুরার দিন হালাব বা আলেপ্পোর তৎকালীন শাসক মালিক নাসির ইবনে জাওযি'র পুত্রকে ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের ঘটনা তুলে ধরার অনুরোধ করেন। তখন ইবনে জাওযি'র পুত্র মিম্বরের ওপর গিয়ে বসেন এবং মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে তীব্র ক্রন্দন করতে থাকেন ও বলতে থাকেন:
তাদের প্রতি আক্ষেপ কিয়ামতের দিন যাদের সুপারিশকারীরা হবে তাদের শত্রু ! সেদিন হযরত ফাতিমা আসবেন এমন অবস্থায় যে তাঁর জামা হবে হুসাইনের রক্তে রঞ্জিত!
এরপর তিনি মিম্বর থেকে নেমে আসেন এবং কাঁদতে কাঁদতে সালিহিয়া অঞ্চলের দিকে যান ও সেখানেও কাঁদেন!
কবি ইবনুল হাবারিয়ার মর্সিয়া পাঠ:
ইবনে জাওযি'র পুত্র বর্ণনা করেছেন প্রখ্যাত কবি ইবনে হাবারিয়া কারবালা অঞ্চল দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি সেখানে বসে পড়েন ও ইমাম হুসাইন (আ) এবং তাঁর পরিবারের জন্য কেঁদে কেঁদে বলেন:
হে হুসাইন! আপনার নানা মানুষকে সুপথ দেখানোর বা হেদায়াতের খোদায়ি দায়িত্ব পেয়েছিলেন! খোদার কসম যদি কারবালায় থাকতাম তাহলে আপনার চেহারা থেকে মুসিবতগুলো দূর করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতাম! আমার ক্ষুরধার তরবারিকে আপনার শত্রুদের রক্ত পান করিয়ে পরিতৃপ্ত করতাম! আমার ক্ষুরধার বর্শাকেও একইভাবে পরিতৃপ্ত করতাম! আফসোস! আমি আপনার যুগে আসিনি! আমার গজল-গায়ক বুলবুল আপনার জন্যই নাযাফ ও বাবেলের (কারবালা) মধ্যে আসা-যাওয়া করে! আমাকে ক্ষমা করুন এ জন্য যে আমি শত্রুদের মোকাবেলায় আপনাকে সাহায্য করতে পারিনি ও পারিনি আপনার দুঃখ ও অশ্রুর প্রবাহ কমাতে!
এরপর কবি ইবনে হাবারিয়া সেখানে ঘুমিয়ে পড়েন। স্বপ্নে তিনি মহানবীকে (সা) দেখেন যে তিনি তাঁকে বলছেন: হে অমুক! আল্লাহ তোমাকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কার দিন! তোমার জন্য সুসংবাদ যে তোমার নাম হুসাইনের প্রতিরক্ষায় নিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে!
ইমাম হুসাইনের জন্য নবী-রাসুলদের শোক-প্রকাশ:
হযরত আদম (আ.), ইব্রাহিম (আ.), ইসমাইল (আ.), মুসা (আ), জাকারিয়া (আ.) ও দাউদ (আ.)সহ অতীতের সকল বড় নবী-রাসূলের কাছে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাবলী তুলে ধরা হয়েছিল এবং তাঁরা ভবিষ্যতের ওই ঘটনা শুনে কেঁদেছিলেন বলে ইসলামী বর্ণনা রয়েছে। হযরত জাকারিয়া নবী কারবালার মর্মান্তিক ঘটনায় যা যা ঘটবে তার বিবরণ শুনে এতই শোকাহত হয়েছিলেন যে তিনি তিন দিন ঘর বন্ধ করে রাখেন ও ঘরের বাইরে যাননি ও কারো সঙ্গে কথা বলেননি! জাকারিয়া নবীর ছেলে হযরত ইয়াহিয়াও অত্যাচারী রোমান সম্রাট হেরোডের জুলুমের শিকার হয়ে শহীদ হয়েছিলেন!
জিনদের বিলাপ
কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে যে আশুরার দিন অনেক অনুরাগী জিন ইমাম হুসাইনকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে তারা অন্য অনেক জিনকে নিয়ে এসে ইয়াজিদ বাহিনীকে খুব সহজেই নির্মূল করে দিবেন। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ) অপ্রচলিত পন্থায় বিজয়ী হতে চাননি এবং তাদেরকে যুদ্ধে যোগ দিতে নিষেধ করেন।
হেইসামি থেকে বর্ণিত: উম্মে সালমা (মহানবীর স্ত্রী) বলেছেন, শুনেছি জিনেরা ইমাম হুসাইনের জন্য শোকের গান বা কবিতা পড়ে! ত্বাবরানিও তা বর্ণনা করেছেন এবং এর বর্ণনাকারীরা হলেন হাদিস গ্রন্থ বুখারির বর্ণনাকারী। একই কথা বলেছেন মাইমুনা।
আধুনিক যুগেও পাকিস্তানের প্রখ্যাত সুন্নি আলেম ও মুফাসসির মরহুম মুফতি শফি (র) (ইনি বাংলাদেশের সদ্য-মরহুম আল্লামা শফি নন) ইমাম হুসাইনের জন্য শোক প্রকাশ প্রসঙ্গে বলেছেন,
‘পবিত্র আহলে বাইতের মুহাব্বাত ঈমানের অংশবিশেষ। আর তাদের প্রতি কৃত পাশবিক অত্যাচারের কাহিনী ভুলে যাওয়ার মতো নয়। হযরত হুসাইন (রা.) এবং তার সাথীদের ওপর নিপীড়নমূলক ঘটনা এবং হৃদয়বিদারক শাহাদাত যার অন্তরে শোক এবং বেদনা সৃষ্টি করে না,সে মুসলমান তো নয়ই,মানুষ নামেরও অযোগ্য।’
অনেকেই মনে করেন সুন্নি সমাজে ওহাবিবাদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার কারণে মহানবীর আহলে বাইতের প্রতি মুহাব্বাত ও শোক প্রকাশের ধারণা এবং প্রথা স্তিমিত ও ম্লান হয়ে গেছে।
সুন্নি সমাজে অতীতের শোক অনুষ্ঠান:
শোক প্রকাশে আবেগের ব্যাপক উচ্ছ্বাস বা বাড়াবাড়ি ?!!
জাহিরি মাজহাবের বিশিষ্ট ফক্বিহ বা আইনবিদ এবং মুহাম্মাদ বিন দাউদের সুফি তরিকার অনুসারী আবদুল মুমিন বিন খালাফ-এর দাফন অনুষ্ঠানের সময় তবলা বা ঢোল বাজানো হয়েছিল বলে বর্ণনা রয়েছে। বর্ণনাকারী বলেছেন, আমি নামাজের কক্ষে নামাজ পড়ছিলাম ও ঢোল-তবলার আওয়াজ শুনলাম। এমন জোরে ঢোল বা তবলা বাজানো হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল সেনাবাহিনী যুদ্ধের ময়দানে ড্রাম বাজাচ্ছে! আমি ভাবছিলাম কোনো সেনাবাহিনী আসছে নিশ্চয়ই! মনে মনে বলছিলাম সেনাবাহিনী আসার আগেই যদি শাইখ খালাফের জানাযার নামাজ পড়তে পারতাম! কিন্তু এরপর যখন জনতা জড় হল ও নামাজ পড়া হল তখন ঢোল-তবলার শব্দ থেমে যায় এমনভাবে যেন কোনো শব্দই হচ্ছিল না!
প্রখ্যাত সুন্নি মনীষী জুইয়িনির মৃত্যুতে শোক অনুষ্ঠান:
فدفن بجنب والده، وکسروا منبره، وغلقت الاسواق، ورثی بقصائد، وکان له نحو من اربع مائه تلمیذ، کسروا محابرهم واقلامهم، واقاموا حولا، ووضعت المنادیل عن الرؤوس عاما، بحیث ما اجترا احد علی ستر راسه، وکانت الطلبه یطوفون فی البلد نائحین علیه، مبالغین فی الصیاح والجزع.
প্রখ্যাত সুন্নি মনীষী জাহাবি থেকে বর্ণিত: জুইয়িনিকে তার বাবার কবরের পাশে দাফন করা হয়। তার জন্য শোক প্রকাশ করতে গিয়ে তার মিম্বরটি ভেঙ্গে ফেলা হয়, বাজারগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। তাঁর স্মরণে শোকের ক্বাসিদা গাওয়া হয়। তার প্রায় ৪০০ জন ছাত্র ছিলেন। তারা সবাই নিজ নিজ কলম ও দোয়াত ভেঙ্গে ফেলেন! এক বছর ধরে শোক প্রকাশ করা হয়! তারা মাথায় যে বিশেষ ছোট চাদর ব্যবহার করতেন এক বছর ধরে তা ব্যবহার করেননি। এ ব্যাপারে এত কড়াকড়ি করা হত যে কোনো ব্যক্তিও সে রকম কিছু মাথায় ব্যবহারের সাহস পেত না। এই দীর্ঘ এক বছর ধরে জুইয়িনির ছাত্ররা শহরের বাজার ও অলিগলিতে ঘুরতেন ও শোকের গান বা কবিতা পাঠ করতেন! চিৎকার ও চেঁচামেচিতে তারা বেশ বাড়াবাড়ি করতেন!
প্রখ্যাত সুন্নি মনীষী ইবনে জাওযি'র মৃত্যুতে শোক অনুষ্ঠান:
প্রখ্যাত সুন্নি মনীষী জাহাবি থেকে বর্ণিত:
وحضر غسله شیخنا بن سکینة وقت السحر وغلقت الاسواق وجاء الخلق وصلی علیه ابنه ابو القاسم علی اتفاقا لان الاعیان لم یقدروا من الوصول الیه ثم ذهبوا به الی جامع المنصور فصلوا علیه وضاق بالناس وکان یوما مشهودا...
وباتوا عند قبره طول شهر رمضان یختمون الختمات بالشمع والقنادیل... واصبحنا یوم السبت عملنا العزاء وتکلمت فیه وحضر خلق عظیم وعملت فیه المراثی ومن العجائب انا کنا بعد انقضاء العزاء یوم السبت عند قبره واذا بخالی محیی الدین قد صعد من الشط وخلفه تابوت فقلنا نری من مات واذا بها خاتونام محیی الدین وعهدی بها لیلة وفاة جدی فی عافیة فعد الناس هذا من کرماته لانه کان مغری بها
ভোর রাতে তার লাশের গোসল করানোর আয়োজন করা হয় । এ অনুষ্ঠানের জন্য বাজারগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। বিপুল সংখ্যক মানুষ এ জন্য সমবেত হন। তার পুত্র আবুল কাসেম আলী বাবার জানাযার নামাজ পড়ান। অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি জানাযায় শরিক হতে পারেননি! তাই তার লাশ মসজিদে মানসুরে নেয়া হয়। সেখানে আবারও তার জানাযার নামাজ পড়া হয়। সবাই সমবেত হওয়ায় বিপুল মানুষের ভিড়ে স্থান সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। ...তারা পুরো রমজান মাসে ইবনে জাওযির কবরের পাশে থাকেন ও মোমবাতি জ্বালিয়ে কুরআন পড়তেন! শনিবার তার স্মরণে শোকের মাহফিল হয়। আমি (জাহাবি) তার স্মরণে বক্তৃতা দেই। বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত হয়েছিল। অনেক মর্সিয়া বা শোকের কবিতা বা গান পরিবেশন করা হয়।.. ...
তথ্য সূত্র:
۱. ↑ ابنجوزی، التبصرة، ج۲، ص۵-۱۷، نشر:دار الکتاب المصری، دار الکتاب اللبنانیف مصر، لبنان، ۱۳۹۰ه - ۱۹۷۰م، الطبعة:الاولی، تحقیق:د. مصطفی عبد الواحد.
۲. ↑ اسماعیل بن عمر بن کثیر القرشی ابو الفداء، البدایة والنهایة، ج۱۳، ص۲۲۷.
۳. ↑ الشیخ محمد الزرندی الحنفی، معارج الوصول الی معرفة فضل آل الرسول (علیهالسّلام)، ص۱۰۷.
۴. ↑ الشیخ محمد الزرندی الحنفی، نظم درر السمطین، ص۲۲۵.
۵. ↑ علی بن ابیبکر الهیثمی، مجمع الزوائد، ج۹، ص۱۹۹، دار النشر:دار الریان للتراث/ دار الکتاب العربی، القاهرة، بیروت، ۱۴۰۷.
۶. ↑ محمد بن احمد بن عثمان بن قایماز الذهبی ابو عبدالله، سیر اعلام النبلاء، ج۱۵، ص۴۸۱، دار النشر:مؤسسة الرسالة، بیروت، ۱۴۱۳، الطبعة:التاسعة، تحقیق:شعیب الارناؤوط، محمد نعیم العرقسوسی.
۷. ↑ محمد بن احمد بن عثمان بن قایماز الذهبی ابو عبدالله، سیر اعلام النبلاء، ج۱۸، ص۴۷۶، دار النشر:مؤسسة الرسالة، بیروت، ۱۴۱۳، الطبعة:التاسعة، تحقیق:شعیب الارناؤوط، محمد نعیم العرقسوسی.
۸. ↑ محمد بن احمد بن عثمان بن قایماز الذهبی ابو عبدالله، سیر اعلام النبلاء، ج۲۱، ص۳۷۹-۳۸۰، دار النشر:مؤسسة الرسالة، بیروت، ۱۴۱۳، الطبعة:التاسعة، تحقیق:شعیب الارناؤوط، محمد نعیم العرقسوسی.