বাংলাদেশে আরও ৩৫ জন করোনায় আক্রান্ত, মৃত্যু বেড়ে ১২: আইইডিসিআর
-
মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা (ফাইল ফটো)
বাংলাদেশের করোনাভাইরাসে নতুন করে ৩৫ জন শনাক্ত ও তিনজন মারা যাবার খবর দিয়েছে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। মৃত তিনজনের একজন এক সপ্তাহ আগে শনাক্ত হন। বাকি দুজন নারায়ণগঞ্জ থেকে হাসপাতালে আসার পরপরই মারা গেছেন।
আজ (সোমবার) করোনা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি জানান, বাংলাদেশে এ যাবৎ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১২ জন এবং মোট আক্রান্ত হয়েছেন ১২৩ জন। এক মাস আগে দেশে প্রথমবারের মত কারো দেহে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর এক দিনে মৃত্যু ও আক্রান্তের এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যা। আক্রান্তদের মধ্যে মোট ৩৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
সংবাদ ব্রিফিং-এ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ আজ স্বীকার করেছেন, করোনাভাইরাস আর এক স্থানে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বেড়েই চলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৩৯ জনকে কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৭০৯ জন হোম কোয়ারেন্টিনে এবং ৩০ জন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে আছেন। এর বাইরে ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে ২৩ জনকে।
আবুল কালাম আজাদ জানান করোনায় দুদকের একজন পরিচালক মারা গেছেন, তাঁর বয়স ছিল ৪৮ বছর।
নারায়ণগঞ্জকে ক্লাস্টার হিসেবে চিহ্নিত
এলাকাভিত্তিক বিশ্লেষণে ঢাকা শহরে করোনা রোগী ৬৪ জন জানিয়ে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, ‘ঢাকার পরই রয়েছে নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জকে আমরা ক্লাস্টার হিসেবে চিহ্নিত করেছি। সেখানে বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে যাতে সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে। এখন সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ২৩। গত ২৪ ঘণ্টায় যাদের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে, তার মধ্যে ১২ জনই হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ
যেসব এলাকায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে সেসব ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা পুরোপুরি লকডাউন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজ সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অতি জরুরি কারণ ছাড়া ঢাকার বাইরে কেউ যাবে না, আসবেও না। পিপিই, মাস্ক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রতিটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।’
এছাড়া কারাগারে দীর্ঘদিন জেল খাটছেন ও লঘু অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের মুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশও দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মুসল্লিদের ঘরে নামাজ পড়ার নির্দেশ
করোনাভাইরাস ছড়ানো ঠেকাতে এখন থেকে মুসল্লিদের ঘরে নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও এ সময় কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক আচার–অনুষ্ঠানের জন্য সমবেত হতে পারবেন না।
ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভয়ানক করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে মসজিদের ক্ষেত্রে খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা ছাড়া অন্য সব মুসল্লি নিজ নিজ বাসায় নামাজ আদায় করবেন। জুমার জামাতে অংশগ্রহণের পরিবর্তে ঘরে জোহরের নামাজ আদায় করবেন। এটা সরকারের নির্দেশ।
তাছাড়া, মসজিদে জামাত চালু রাখার প্রয়োজনে খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা মিলে পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ অনধিক পাঁচজন এবং জুমার জামাতে অনধিক ১০ জন শরিক হতে পারবেন। বাইরের মুসল্লি মসজিদে জামাতে অংশ নিতে পারবেন না।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সাখাওয়াৎ হোসেন সই করা এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে, কেউ এই নির্দেশ অমান্য করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিজ্ঞপ্তিতে ব্যাখ্যা করে জানানো হয়েছে, এ সময় সারা দেশে কোথাও ওয়াজ মাহফিল, তাফসির মাহফিল, তাবলিগ তালিম বা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা যাবে না। সবাই ব্যক্তিগতভাবে তিলওয়াত, জিকির, ও দোয়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহর রহমত ও বিপদ মুক্তির প্রার্থনা করবেন।
সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধের নির্দেশ
কাঁচা বাজার ও সুপার শপসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের বাজার ও দোকানপাট যাতে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয় সেই নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ওষুধের দোকান এবং জরুরি সার্ভিসগুলো এই নির্দেশের আওতায় আসবে না।
সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে যাতে সুপার শপ এবং কাঁচা বাজার বন্ধ করার নির্দেশনা বাস্তবায়নে এরই মধ্যে ডিএমপির পক্ষ থেকে মাইকিং করে মার্কেট ও সপিং সেন্টার ও পাড়ার দোকানীদের অবহিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এর আগে পুলিশ সদর দফতরের পক্ষ থেকে গতকাল ঢাকাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়।
তাবলিগের মুসল্লি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইনে
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মানিকগঞ্জে আসা তাবলিগ জামাতের ৫৪ জন মুসল্লিসহ ৫৭ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। রোববার দিবাগত রাতে ৪৯ জন ও আজ সোমবার আটজনকে মানিকগঞ্জ পৌর শহরের কেওয়ারজানী এলাকায় অবস্থিত আঞ্চলিক জনসংখ্যা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে তাঁদের কোয়ারেন্টিন করা হয়।
জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাত ১২টার দিকে দুটি পিকআপ ভ্যানে করে তাবলিগ জামাতের ৪৬ জন মুসল্লি মানিকগঞ্জে আসছিলেন। জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার ধল্লা এলাকায় পুলিশের তল্লাশি চৌকির কাছে আসলে পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। মুসল্লিরা জানান, তাঁরা শেরপুর থেকে তাবলিগ জামাতে মানিকগঞ্জে এসেছেন।
এরপর জেলা প্রশাসক এস ফেরদৌস, পুলিশ সুপার রিফাত রহমান এবং সিভিল সার্জন আনোয়ারুল আমিন আখন্দ মুসল্লিদের বিষয়ে পরামর্শ করে তাঁদের কোয়ারেন্টিনে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। পরে রাত ২টার দিকে তাবলিগের ৪৬ মুসল্লি, পিকআপ ভ্যানের দুজন চালক ও একজন সহকারীসহ মোট ৪৯ জনকে মানিকগঞ্জ পৌর শহরের কেওয়ারজানী এলাকায় আঞ্চলিক জনসংখ্যা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়।
উল্লেখ্য, গত ২৪ মার্চ তাবলিগ জামাতের ১৩ জন মুসল্লি সিঙ্গাইর পৌর এলাকার একটি মাদ্রাসায় আসেন। কয়েক দিন আগে তাঁদের মধ্যে এক ব্যক্তির (৬০) সর্দি, জ্বর ও কাশি শুরু হয়। এরপর গত শুক্রবার রাতে ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) তাঁর শরীরের নমুনা পরীক্ষা করেন। শনিবার রাত ১১টার তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে নিশ্চিত করে আইইডিসিআর। এর পর থেকে তাঁকে আইইডিসিআর-এর তত্ত্বাবধানে আইসোলোশনে রাখা হয়।
এরপরপরই গত শনিবার রাত ১২ টায় সিঙ্গাইর পৌরসভা লকডাউন ঘোষণা করা হয়। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা তাবলিগ জামাতের বাকি ১২ মুসল্লিসহ ১৮ জনকে ওই মাদ্রাসায় কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। এ ছাড়া আক্রান্ত মুসল্লির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পরিবারের ১০ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।