৯৮ % গরিবদের জীবন-যাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
করোনাকালে বাংলাদেশে গরিবদের ৮৭ শতাংশই খাদ্য-পুষ্টির সঙ্কটে: জরিপ
করোনা মহামারীকালে দেশের গরিব জনগোষ্ঠীর ৮৭ শতাংশই খাদ্য ও পুষ্টির সঙ্কটে পড়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ–এর ‘দরিদ্র মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির উপর কোভিড ১৯-এর প্রভাব’ শীর্ষক এক জরিপে এ তথ্য ফুটে উঠেছে। জরিপে বলা হয়েছে দেশের ৯৮ শতাংশ গরিব মানুষের জীবন-যাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জরিপে বলা হয়েছে, “করোনাভাইরাসের সাথে সম্পর্কিত জীবিকার সাথে জড়িত দরিদ্র মানুষের আয়ের ক্ষতি হয়েছে। বেশিরভাগেরই ন্যূনতম সঞ্চয় না থাকায়, আয়ের এ সংকটকালে তাদের খাদ্য গ্রহণ এবং পুষ্টির অবস্থার উপর বাড়তি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
জরিপে উঠে এসেছে, দরিদ্র পরিবারগুলোর পাঁচ শতাংশই দিনে মাত্র একবেলা খেয়েছেন। অথচ মহামারী শুরুর আগে উত্তরদাতাদের ৯১.৬ শতাংশ দিনে তিন বেলা এবং বাকিরা দু'বেলা খাবার খেতে পারতেন। সব বিভাগেই দরিদ্র লোকেরা পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের তীব্র অভাবে ভুগছিলেন, যা তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য-ঝুঁকির সামনে ফেলে দিয়েছে। যদিও মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ এ সময় সাধারণ অসুস্থতায় ভুগেছেন বলে জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে লক-ডাউনের কারণে বেশ কয়েক মাস গরিব মানুষের আয়-রোজগারের পর বন্ধ ছিল। বিধিনিষেধ শিথিলে সীমিত পরিসরে কাজ চললেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্কট কাটেনি।
এসব দরিদ্র মানুষদের নিয়ে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের জন্য জরিপটি পরিচালনা করেন বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ। বৃহস্পতিবার সকালে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের ভার্চুয়াল এক আলোচনা সভায় তিনি জরিপের গবেষণাপত্রটি উপস্থাপনা করেন।
খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ ও পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)- এর চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে এ আলোচনা সভায় যোগ দেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমানারা খানুম। এতে আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. এস এম জুলফিকার আলী ও আইসিসিও কোঅপারেশন বাংলাদেশের কর্মসূচি প্রধান মোঃ. আবুল কালাম আজাদ।
এ সময় খাদ্য সচিব নাজমানারা বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ জরিপের ফলাফলকে মানতেই হবে যে, সকল মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা করোনাকালে সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় খাদ্য, বিশেষত চাল সরবরাহের দিকটি কঠোরভাবে নজরদারি করছে। যদিও শুধু চাল দিয়েই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।
এ প্রসঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইকোনোমিকস এন্ড পিস- এর সভাপতি ড: আরিফুর রহমান রেডিও তেহরানকে বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশী আর্থিক সংকটে পড়েছে এটাই স্বাভাবিক। আর এ অবস্থা আরো সংকটজনক হবে। তাই এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে জরুরী খাদ্য সহায়তা ও আপদকালীন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতেই হবে। সেই সাথে করোনা পরিস্থিতির মাঝে চলতি বন্যা ও বর্ষাকালীন দূরবস্থার কথাও বিবেচনা করতে হবে।
খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ – এর জরিপে দেখা গেছে, তুলনামূলকভাবে ময়মনসিংহ ও সিলেটে খাবারের ঘাটতি বেশি ছিল বলে জরিপে দেখা গেছে। রংপুর অঞ্চলের দরিদ্ররা খাদ্য সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুষ্টিকর খাদ্য সংকটে বেশি প্রভাব পড়েছে রাজশাহী অঞ্চলে।
এ সময় প্রায় ৭ শতাংশ মানুষ তাদের পেশা পরিবর্তন করেছেন। তুলনামূলকভাবে সহজ বলে এদের বেশিরভাগই দিনমজুর ও কৃষি শ্রমিকে পরিণত হয়েছেন। তবে বোরো ধান কাটার মৌসুম ছিল বলে কৃষি শ্রমিকরা সাধারণ ছুটি চলাকালীন কাজ পেয়েছেন।
সুপারিশ
গবেষণাপত্রে বেশকিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে দরিদ্র মানুষের জরুরি খাদ্য সহায়তা সহজলভ্য করার জন্য বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ (নগদ সহায়তা বা অন্যান্য) বৃদ্ধি করা; বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা সুবিধাসহ নগদ অর্থ মোবাইল পরিসেবা ব্যবহার করে নিয়মিত সুবিধাভোগীদের কাছে প্রেরণ করা; দরিদ্র শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা; দরিদ্র মানুষের জন্য জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র, মধ্য ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোগের জন্য সরকার কর্তৃক ঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজগুলি অবিলম্বে কার্যকর করা; কৃষির সরবরাহ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা; কোভিড-১৯ সম্পর্কিত স্বাস্থ্য সচেতনতা (মাস্ক ব্যবহার ও হাত ধোয়া) বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়েছে।
খাদ্য ও পুষ্টি সংকটের এ সময়ে সরকারের দরিদ্রদের সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি এক্ষেত্রে বেসরকারি খাত ও এনজিওদেরকেও যুক্ত করার প্রয়োজন বলে মনে করেন কাজী খলীকুজ্জমান। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশ এখন একটি জটিল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এখন অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু হলেও অবস্থার উন্নতি যে খুব হয়েছে তা মনে হয় না।
আগামী দিনে আয়ের সুযোগ না বাড়লে দরিদ্র মানুষ খাদ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রে আরো নেতিবাচক পরিস্থিতিতে পতিত হবেন। টিকে থাকার জন্য মানুষের সুযোগগুলো কমে যাচ্ছে, এখন ধার দেয়ার মানুষও পাওয়া যাচ্ছে না। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম দিয়ে আমরা সকল দরিদ্র মানুষ তথা তাদের চাহিদাকে পূরণ করতে পারছি না। এজন্য দরিদ্র মানুষের একটি চলমান হালনাগাদ ডাটাবেজ থাকা দরকার। তাহলে খুব সহজেই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সহায়তাগুলো পৌঁছানো যাবে।এস এম জুলফিকার আলী বলেন, এ জরিপে যে পাওয়া গেছে, সরকারি সহায়তা পেয়েছে অসহায় ও দরিদ্র শ্রেণির মাত্র অর্ধেক জনগোষ্ঠী, এ বিষয়টি নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে।
সরকারের প্রতিমন্ত্রীরা কী বলেন :
এদিকে, কভিডের কারণে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে- কিছু অর্থনীতিবিদদের এমন বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বাংলাদেশ সরকারের নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী আজ বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয় নাই। ধ্বংস হয়েছে দেশ-বিরোধী চক্র। তারা আস্তে আস্তে নির্মূল হয়ে যাবে। এ অপশক্তি বাংলাদেশে থাকবে না।
আজ শুক্রবার দুপুরে দিনাজপুরে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী দেশের অর্থনীতিবিদদের প্রতি বিষোদ্গার করে বলেছেন, করোনায় দেশের অর্থনীতি নিয়ে কিছু অর্থনীতিবিদ মনগড়া কথা বলছেন । মৌমাছি যেভাবে ভ্যান ভ্যান করে, সেভাবে কিছু অর্থনীতিবিদ অপেক্ষা করে, কখন টেলিভিশনের সামনে যাব। কখন সরকারবিরোধী কথা বলব। এগুলো মনগড়া, কাগজে লিখা থাকে। সারারাত জেগে এসব তৈরি করে তারা সারাদিন বলে বেড়ায়।
তিনি বলেন, অর্থনীতি ভালো বলেই সরকার করোনা সময়ে বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ভূমিহীন কৃষকের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেছে। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে বই বিতরণ করছে। উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। মসজিদ-মন্দিরে উন্নয়ন হচ্ছে। এ উন্নয়ন টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া চলমান আছে।
অপরদিকে, সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, সরকার প্রতিটি দুর্যোগে জনগণের পাশে রয়েছে। এবার এক কোটি পরিবার সরকারের মানবিক সহায়তা পেয়েছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে সকল স্তরের নেতাকর্মী এবং জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে মানবিক সহায়তার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে নাটোরের সিংড়া উপজেলার তাজপুর ইউনিয়নের তেমুখ নওগাঁ বাজারে বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণকালে তিনি এসব কথা বলেন।
জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, সিংড়া উপজেলায় বিগত দিনে ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে হাজার হাজার মানুষের জন্য তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা আমরা করেছিলাম। এবারও আমাদের সে প্রস্তুতি রয়েছে। আমরা জনগণের পাশে রয়েছি। বন্যাদুর্গত এলাকায় নেতাকর্মীরা সার্বক্ষণিক মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছেন।#
পার্সটুডে/এআরকে/এমএএইচ/১৭