শেরপুরের ঘটনা
অন্যের বিজয় দেখে নিজের সহ্য হয় না: জামায়াতের আমির
-
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান
বাংলাদেশের শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে জামায়াত-বিএনপির সংঘর্ষের ঘটনাটি কিসের ইঙ্গিত দেয়-এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের উত্তরে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘এই ঘটনা ইঙ্গিত করে অসহিষ্ণুতা। এই ঘটনা ইঙ্গিত করে জনগণের ওপর আস্থা নাই। এই ঘটনা ইঙ্গিত করে, অন্যের বিজয় দেখে নিজের সহ্য হয় না।’
এই ঘটনায় নির্বাচনি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের কনসার্ন জানিয়েছি। আমরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। প্রতিবাদ করে যাব। আমাদের অধিকার, আমাদের জনগণের অধিকার, আমরা আর কাউকেই টানাটানি করার সুযোগ দেব না।’
আজ (বৃহস্পতিবার) বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরের পানির ট্যাংকি এলাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেন।
শফিকুর রহমানের নিজ নির্বাচননি আসনের (ঢাকা-১৫) প্রধান নির্বাচনী কার্যালয় ও জামায়াতের ডিজিটাল প্রচারের জন্য ‘মাল্টি মিডিয়া বাস’–এর উদ্বোধনী উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
গতকাল(বুধবার) বিকেলে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী–ঝিনাইগাতী) আসনে বিএনপি–জামায়াতের নেতা–কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে জামায়াতের এক নেতা নিহত হন। ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিহত মাওলানা রেজাউল করিম শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি। তিনি ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক ছিলেন।
অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির বলেন, ‘একটা নতুন বাংলাদেশের অপেক্ষায় আছি। নতুন বাংলাদেশ মানে ভূগোল বদলাবে না। আমাদের চরিত্র বদলাবে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে। ৫৪ বছর যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেশ চালানো হয়েছে, মাঝে মাঝে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ সময় জনগণের ওপর জুলুম করা হয়েছে। ফ্যাসিজম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওটা আমরা চাই না। আমরা চাই পরিবর্তন। ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক সমাজ চাই।’
শফিকুর রহমান বলেন, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও অপরাধমুক্ত শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১১ দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবর্তনের সরকার গঠন করা হবে।
জামায়াতের আমির বলেন, তাঁদের নির্বাচনি এই লড়াই কোনো দল, ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য নয়। ১৮ কোটি মানুষের কল্যাণের জন্য। নির্বাচনে তাঁরা জামায়াতের একক বিজয় চান না। তাঁরা চান, জনগণের সামগ্রিক বিজয়। তাই তাঁরা এ ব্যাপারে দেশবাসীর সমর্থন–সহযোগিতা কামনা করেন।
এর জন্য প্রথম ধাপে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে পুরোনো ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে বলে উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এরপর জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম শক্তির হাতেই দেশের দায়িত্ব তুলে দিতে হবে।
একটি দল কেন সব চেয়ার দখলে রাখল, লাঠিসোঁটা জড়ো করল, তদন্ত দরকার: মাহদী আমিন
এদিকে, শেরপুরে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
মাহদী আমিন বলেন, এই সংঘাত এড়ানো যেত কি না, নির্ধারিত সময়ের আগে একটি দল কেন সব চেয়ার দখল করে রাখল? সেই দলের লোকজন কেন সেখানে লাঠিসোঁটা জড়ো করল? সবার সম্মিলিত অনুরোধ উপেক্ষা করে সেই দলের প্রার্থী কেন সংঘাতের পথ বেছে নিলেন, এসব বিষয় নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।
আজ (বৃহস্পতিবার) দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাহদী আমীন এ কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, ‘শেরপুরে স্থানীয় প্রশাসনের আয়োজনে, সব প্রার্থীর অংশগ্রহণে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার একটি অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে প্রতিটি দলের বসার জন্য আসন নির্ধারিত ছিল। জামায়াতে ইসলামীর নেতারা সব আসন, তথা চেয়ার দখল করে রেখেছিলেন এবং বিএনপির নেতা–কর্মীদের তাঁদের নির্ধারিত আসনে বসতে দিচ্ছিলেন না। প্রশাসন বারবার আহ্বান জানানোর পরেও তাঁরা চেয়ার ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। চেয়ারে বসার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শেরপুরে যে সহিংসতা ও সংঘাত আমরা দেখেছি, সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। গণ–অভ্যুত্থানের পর আমাদের সবার প্রত্যাশা ছিল এমন একটি নির্বাচন, যেখানে পরিবেশ হবে উৎসবমুখর, সংঘাতময় নয়।’
নির্বাচন যেন বিতর্কমুক্ত, শান্তিপূর্ণ থাকে এবং নির্বাচনকে ঘিরে কেউ যেন কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে সেই আহ্বান জানান মাহদী আমিন।
শেরপুরে ঘটনাটি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, কীভাবে সেটি শুরু হলো, কারা সেখানে মদদ দিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন কেন পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পারল না, এসব বিষয় নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনেক প্রশ্ন জাগছে।
মাহদী আমিন বলেন, ‘আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কিছু ভিডিও দেখেছি, যেখানে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতের যিনি প্রার্থী রয়েছেন, তাঁকে বারবার পুলিশ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেনাবাহিনী এমনকি বিএনপির নেতা–কর্মীরাও হাত জোড় করে অনুরোধ করেছিলেন যেন তিনি ওই রাস্তা দিয়ে না যান। তারপরও তিনি কেন সেই দিক দিয়েই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন? তাঁকে বারবার বলতে শোনা যাচ্ছিল, ‘জান যায় যাক।’
বিএনপির ৪০ জনের বেশি নেতা–কর্মী আহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন বলে জানান বিএনপির এই নেতা।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে আহ্বান জানান মাহদী আমিন। কেউ যেন কোনো উসকানি না দেন, কোনো উসকানিতে পা না দেন সেই আহ্বান জানান তিনি। সব রাজনৈতিক দলকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে বলেন তিনি।#
পার্সটুডে/জিএআর/২৯