সাজা অপ্রতুল, অবশ্যই আপিল করবো: চিফ প্রসিকিউটর
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা: জাসদ সভাপতি ইনুর ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
-
আদালতে হাসানুল হক ইনু
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও ১৪-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক নেতা হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
আজ (মঙ্গলবার) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) এই রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি ষষ্ঠ রায়।
মামলার বিবরণ ও সাজা
আদালত সূত্রে জানা যায়, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ৩টি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং বাকি ৫টি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
দোষী সাব্যস্ত হওয়া তিনটি অভিযোগ হলো:
১. ৩ নম্বর অভিযোগ (নির্যাতন ও রাজনৈতিক নিপীড়ন): ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
২. ৬ নম্বর অভিযোগ (ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও দুষ্কর্মে সংযোগ): ১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণসহ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
৩. ৭ নম্বর অভিযোগ (শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ ও ষড়যন্ত্র): ১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণসহ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, আসামির বিরুদ্ধে পৃথকভাবে মোট ৩০ বছরের সাজা ঘোষণা করা হলেও সবগুলো সাজা একসঙ্গে চলবে। ফলে হাসানুল হক ইনুকে কার্যত ১০ বছর সাজা ভোগ করতে হবে।
সাজা অপ্রতুল, অবশ্যই আপিল করবো: চিফ প্রসিকিউটর
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণার পর এ কথা বলেন তিনি। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সাজা অপ্রতুল। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে অবশ্যই আপিল করা হবে।
খালাস পাওয়া অভিযোগসমূহ:
তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশনের আনা ১, ২, ৪, ৫ এবং ৮ নম্বর অভিযোগ থেকে ইনুকে খালাস দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল কুষ্টিয়ায় ৬ আন্দোলনকারীকে সরাসরি হত্যার নির্দেশনার (৮ নম্বর) অভিযোগটি।
মামলার প্রেক্ষাপট ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া
২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ইনুর বিরুদ্ধে এই মামলার তদন্ত শুরু হয় এবং একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৬৭৯ পৃষ্ঠার নথিপত্র, ৩টি অডিও ও ৬টি ভিডিও ডকুমেন্টসহ ৩৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র (তদন্ত প্রতিবেদন) দাখিল করা হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়। ৩০ নভেম্বর সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়ে ১ ডিসেম্বর প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ১০ জন এবং আসামিপক্ষে ২ জন সাফাই সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। চলতি বছরের ১৩ মে যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আজ এই রায় ঘোষণা করা হলো।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এবং আসামিপক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।
ইনুর বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো যা ছিল:
বিদেশি ও দেশি গণমাধ্যমে উসকানি: ২০২৪ সালের ১৮ ও ২৭ জুলাই দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে বলপ্রয়োগের উসকানি দেওয়ার অভিযোগ।
১৪ দলের সভায় সিদ্ধান্ত: ১৯ ও ২৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলের সভায় উপস্থিত থেকে দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন, কারফিউ জারি এবং 'শুট অ্যাট সাইট' (দেখামাত্র গুলি) ও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচনা ও সহায়তা।
কুষ্টিয়ার এসপিকে নির্দেশনা: ২০ জুলাই কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোন করে আন্দোলনকারীদের তালিকা তৈরি ও দমনের নির্দেশ দেওয়া। যার ফলশ্রুতিতে ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগ-জাসদ ক্যাডার ও পুলিশের গুলিতে আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, বাবলু ফরাজী ও ইউসুফ শেখ নামের ৬ জন নিহত হন।
শেখ হাসিনার সঙ্গে ষড়যন্ত্র: আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে বোমা ও গুলি চালানো এবং কারফিউ বহাল রাখার বিষয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ।#
পার্সটুডে/এমএআর/৩০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।