ইরান-রাশিয়ার কৌশলগত সহযোগিতা: বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে নতুন অগ্রযাত্রা
-
মাসুদ পেজেশকিয়ান ও ভ্লাদিমির পুতিন
পার্সটুডে: ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক টেলিফোনালাপে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
পার্সটুডে জানিয়েছে, টেলিফোনালাপে উভয় নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে মতবিনিময় করেন। বিশেষ করে পরিবহন, ট্রানজিট, জ্বালানি ও বিদ্যুৎকেন্দ্র খাতে যৌথ সহযোগিতা চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট তুর্কমেনিস্তানের আশখাবাদে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের সাম্প্রতিক বৈঠককে 'অত্যন্ত গঠনমূলক ও ইতিবাচক' হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি যৌথ প্রকল্পগুলোর দ্রুত ও নির্ভুল বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। পাশাপাশি সব ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক চুক্তিগুলো কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দুই দেশের কৌশলগত ও দৃঢ় সম্পর্কের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে ইরান-রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন এবং সব খাতে সহযোগিতা জোরদার ও চুক্তি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
পেজেশকিয়ান ও পুতিন নিয়মিত সংলাপ ও অব্যাহত সহযোগিতা বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনীতি, জ্বালানি, পরিবহন, ট্রানজিট ও বিদ্যুৎ খাতে কার্যকর চুক্তিগুলো এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করেন। যৌথ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে আরও সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও তারা নিশ্চিত করেন।
পেজেশকিয়ান ও পুতিনের এই টেলিফোনালাপ থেকে প্রতিয়মান হয় যে, তেহরান ও মস্কোর শীর্ষ নেতৃত্ব অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইরান ও রাশিয়া ব্রিকস জোট এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
ইরান ও রাশিয়ার কৌশলগত সহযোগিতা সম্প্রসারণ শুধু দুই দেশের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ককে শক্তিশালী করছে না, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পশ্চিমা একচেটিয়াবাদের বিরুদ্ধে ভারসাম্য সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে ট্রানজিট করিডোরের উন্নয়ন এবং ব্রিকস ও সাংহাইয়ের মতো বহুপাক্ষিক সংগঠনে দুই দেশের ভূমিকা আরও জোরদার হচ্ছে।
ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় ইরান ও রাশিয়ার সদস্যপদ তাদের কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই সহযোগিতা বহুমুখী বৈশ্বিক ব্যবস্থা গঠনে সহায়ক হচ্ছে, নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাচ্ছে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে ইরান ও রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভূমিকা বৃদ্ধি করছে।
২০২৫ সালে ইরান-রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ইতিবাচক ধারার স্পষ্ট প্রমাণ। জ্বালানি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পরিবহন খাতে সহযোগিতা ইরানকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করতে পারে। অন্যদিকে উত্তর-দক্ষিণ করিডোরে রাশত-আস্তারা রেলপথের মতো যৌথ প্রকল্প এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে ইরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত করছে।
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইরান ও রাশিয়া তাদের সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পর্যায়ে উন্নীত করেছে। এই সহযোগিতা পশ্চিমা চাপ মোকাবিলায় কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করছে এবং নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন একতরফা নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সুযোগ সৃষ্টি করছে। ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান ও ককেশাসের মতো সংবেদনশীল আঞ্চলিক ইস্যুতে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ ও সমন্বিত অবস্থান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে এটি উল্লেখযোগ্য যে, ইরান ও রাশিয়া ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় সদস্য। এসব কাঠামোর ভেতরে সহযোগিতা বহুমুখী বৈশ্বিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করছে। এই সম্পর্ক পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট গঠনের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
ইরান ও রাশিয়ার সহযোগিতা অব্যাহত থাকা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে ইরানের দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উপকরণ। এই সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক ও জ্বালানি উন্নয়নেই সহায়ক নয়, বরং ইরানকে বহুমুখী বৈশ্বিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথও তৈরি করছে।#
পার্সটুডে/এমএআর/৩১