ইরানি গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ: বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় বিস্ময়
-
ম্যাচসেরা পুরস্কার পান আলিরেজা বেইরানভান্দ
বিশ্বকাপে ইরান বনাম বেলজিয়াম ম্যাচে ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ আবারও প্রমাণ করলেন- কেন তিনি দেশটির রক্ষণভাগের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম, কেন তাকে বলা হয় ‘তেহরানের প্রাচীর’। পুরো ম্যাচজুড়ে রেড ডেভিলসদের বিশ্বমানের আক্রমণভাগের সামনে তিনি একাই হয়ে রইলেন এক দুর্ভেদ্য দুর্গ।
বেলজিয়ামের নেওয়া একাধিক নিশ্চিত গোল তিনি রুখে দেন অবিশ্বাস্য দক্ষতায়। ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে কেভিন ডি ব্রুইনার নিখুঁত কাট-ব্যাক থেকে ডি কুইপারের নেওয়া শক্তিশালী শটটি যেভাবে বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বেইরানভান্দ স্তব্ধ করে দিলেন, তা টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা সেভ হয়ে থাকবে।
এখানেই শেষ নয়, ৮৫তম মিনিটে আবারও একই খেলোয়াড়ের আরেকটি নিশ্চিত গোল ডাইভিং সেভে নসাৎ করে দেন তিনি। ম্যাচ শেষে অবধারিতভাবেই তার হাতে ওঠে ম্যাচসেরার পুরস্কার। তবে বিনয়ী এই তারকা নিজের পারফরম্যান্সের চেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিচ্ছেন দলীয় প্রচেষ্টা, দর্শকদের সমর্থন এবং ইরানের চিরপরিচিত লড়াকু মানসিকতাকে।
আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো বেইরানভান্দের এই অতিমানবীয় উত্থানকে দেখছে এক অনন্য রূপকথা হিসেবে। আসলে বেইরানভান্দের এই গল্প শুধু তার একার নয়; এটি তার সমসাময়িক লাখ লাখ ইরানি তরুণেরই প্রতিচ্ছবি, যারা নিজেদের যাপনে এই সংগ্রামের সাথে একাত্মতা বোধ করেন। যে তরুণরা অনেক সময় নিজেদের চারপাশে সুন্দর ভবিষ্যৎ দেখতে না পেয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আশায় ফুটবল এবং সবুজ মাঠকে নিজের ভাগ্য বদলের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন।
"স্ট্যান্ড থেকে ‘ইরান’ ধ্বনি আমাদের শিরায় রক্ত এনে দিয়েছে”
ম্যাচ শেষে বেইরানভান্দ তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন: এই কঠিন ম্যাচের ফল আমি আমার দেশবাসী, সতীর্থ এবং কোচিং স্টাফদের উৎসর্গ করছি। যারা আজ স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের চিৎকার করে সমর্থন দিয়েছেন, আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। স্ট্যান্ড থেকে যখন ‘ইরান’ নাম উচ্চারিত হচ্ছিল, তখন মাঠের ভেতর আমাদের শিরায় নতুন শক্তির সঞ্চার হচ্ছিল।”
তিনি আরও যোগ করেন, "ম্যাচটি অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক ও কঠিন ছিল। বেলজিয়ামের মতো ফুটবল-পরাশক্তির বিপক্ষে চরম চাপের মধ্যেও দল যেভাবে লড়াই চালিয়ে গেছে, তা প্রশংসনীয়। দল চাইলে ম্যাচটি জিততেও পারত, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াকু মানসিকতা ধরে রাখা।"
নিজের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স নিয়ে এই গোলরক্ষক বলেন, “আমার এই ভালো খেলার পেছনে পুরো দলের অবদান আছে। সামনে থেকে প্রেসিং করা মেহদি তারেমি থেকে শুরু করে বেঞ্চে থাকা শেষ খেলোয়াড়টিও আমাকে সারাক্ষণ সাহস জুগিয়েছে।”
কোচ আমির কালেনোয়ি'র মূল্যায়ন
ম্যাচ শেষে ইরান জাতীয় দলের প্রধান কোচ আমির কালেহনোয়ি গোলরক্ষক বেইরানভান্দের পারফরম্যান্স নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বেইরানভান্দ আজ মাঠের বুকে 'একটি অবিশ্বাস্য দিন কাটিয়েছেন' এবং তার এই অতিমানবীয় প্রাচীর হয়ে ওঠার কারণেই দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে পেরেছে।
তার ভাষায়, “বেইরানভান্দ ইরানের ইতিহাসের অন্যতম সফল ও অভিজ্ঞ গোলরক্ষক, যিনি ভালো করেই জানেন কীভাবে চাপের মুখে বুক চিতিয়ে দলকে রক্ষা করতে হয়।”
খোররামাবাদের পাহাড় থেকে বিশ্ব মঞ্চ
আলিরেজা বেইরানভান্দের জীবন কেবল একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার নয়, বরং এটি টিকে থাকার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান—যা বিশ্ব মিডিয়ায় বারবার “দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে বিশ্বমঞ্চের আলো” হিসেবে উপমিত হয়েছে।
বেইরানভান্দ এসেছেন লোরেস্তান প্রদেশের এক যাযাবর পরিবার থেকে। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের এই শুষ্ক ও রুক্ষ পাহাড়ি এলাকায় তাদের গবাদী পশুর দল নিয়ে এক চারণভূমি থেকে অন্য চারণভূমিতে ঘুরে বেড়াত পরিবারটি। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় খুব ছোটবেলা থেকেই আলিরেজাকে মেষপালক হিসেবে কঠোর পরিশ্রম করতে হতো পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে।
আলিরেজার বয়স যখন ১২ বছর, তখন তাদের পরিবার খোররামাবাদের উপকণ্ঠে ‘সারাব-ই ইয়াস’ নামক একটি এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখানে তিনি স্থানীয় একটি ফুটবল দলে যোগ দেন। তবে ভাগ্য তার জন্য অন্য কিছু নির্ধারণ করে রেখেছিল। শুরুতে তিনি খেলতেন ফরোয়ার্ড হিসেবে। কিন্তু একদিন দলের মূল গোলরক্ষক চোট পাওয়ায় বাধ্য হয়ে আলিরেজাকে পোস্টের নিচে দাঁড়াতে হয়। সেই ম্যাচে গোলপোস্টের নিচে তার অতিমানবীয় নৈপুণ্য সবার নজর কাড়ে, আর সেখান থেকেই নির্ধারিত হয়ে যায় তার ক্যারিয়ারের গতিপথ।
তবে ছেলের ফুটবলের প্রতি এই তুমুল আবেগ মেনে নিতে পারেননি তার বাবা। অতিদারিদ্র্যের সংসারে ফুটবলকে বিলাসিতা মনে করা হতো। বেইরানভান্দ পরবর্তীতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমার বাবা চেয়েছিলেন আমি কাজ করে সংসারে টাকা আনি। তিনি ফুটবলের এতটাই বিরোধী ছিলেন যে, একবার রাগ করে আমার গোলকিপিং গ্লাভসগুলো পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। তাই অনেক সময় আমাকে খালি হাতেই গোলপোস্ট রক্ষা করতে হয়েছে।”
আজাদি টাওয়ারের নিচে ফুটপাত ও পিৎজা শপের ‘অগ্নিপরীক্ষা’
কিন্তু একদিন এই লড়াকু তরুণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। আত্মীয়দের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে তেহরানের বাসে চড়ে বসেন। পকেটে কোনো টাকা নেই, মাথায় কোনো ছাদ নেই—এমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে তেহরানের রাস্তায় রাত কাটাতে শুরু করেন ১৫ বছরের এই কিশোর। রাজধানী তেহরানের সবচেয়ে বিখ্যাত স্মারক ‘আজাদি টাওয়ার’-এর ছায়াতলে, খোলা আকাশের নিচে বহু রাত কেটেছে তার।
কিছুদিন পর তিনি তেহরানের একটি ছোট ক্লাব ‘ওয়াহদাত’-এ অনুশীলনের সুযোগ পান। সেখানে এক সহ-খেলোয়াড়ের বাবা তাকে নিজের পোশাক তৈরির কারখানায় কাজ দেন। কাজের পাশাপাশি রাতে সেই কারখানাতেই ঘুমানোর অনুমতি পান আলিরেজা। ফলে তেহরানের তারকাহীন আকাশের নিচে ফুটপাতে ঘুমানোর দিনগুলোর সাময়িক অবসান ঘটে।
এর কিছুদিন পর বেইরানভান্দ একটি গাড়ি ধোয়ার গ্যারেজে কাজ শুরু করেন। ১৯৪ সেন্টিমিটারের দীর্ঘকায় দৈহিক গঠনের কারণে বড় বড় এসইউভি গাড়িগুলো ধোয়ার দায়িত্ব তার ওপর পড়ে। তেহরানে একটি প্রচলিত গল্প আছে যে, ইরানের ফুটবল কিংবদন্তি আলী দাঈ ছিলেন সেই কার ওয়াশের একজন নিয়মিত কাস্টমার। আলিরেজার সহকর্মীরা তাকে উৎসাহিত করতেন আলী দাঈ’র সাথে কথা বলে ফুটবলে একটু সাহায্য চাইতে। কিন্তু এই তরুণ গোলরক্ষক এতটাই লাজুক ছিলেন যে, কিংবদন্তির সামনে গিয়ে কথা বলার সাহস পান।
১৬ বছর বয়সে বেইরানভান্দের সাথে দেখা হয় ইরানের প্রথম বিভাগের ক্লাব 'নাফত তেহরান'-এর এক কোচের। ক্লাবটি এই লড়াকু তরুণকে একটি সুযোগ দেয়। তবে তখনো তার থাকার কোনো স্থায়ী জায়গা ছিল না। ক্লাব কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে তাকে একটি নামাজঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। জীবিকা নির্বাহের জন্য এরপর তিনি একটি পিৎজা দোকানে কাজ শুরু করেন, যেখানে রাতে ঘুমানোর সুযোগও ছিল।
একদিন বেইরানভান্দের ফুটবল কোচ ঘটনাক্রমে সেই পিৎজা দোকানে আসেন। আলিরেজা নিজের এই কাজের কথা কোচের কাছে গোপন রেখেছিলেন বলে ভয়ে লুকিয়ে পড়েন। কিন্তু দোকানের মালিক যখন তাকে বাধ্য করেন কোচের টেবিলেই পিৎজা নিয়ে যেতে, তখন লোকলজ্জার ভয়ে আলিরেজা সেখান থেকে চলে যান এবং আর কখনোই সেই দোকানে ফেরেননি। এরপর তিনি নিজের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে তেহরানের রাস্তায় ঝাড়ুদার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবেও কাজ করেন।
বিশ্বমঞ্চে ‘পারস্যের প্রাচীর’ এবং রোনালদোর পেনাল্টি সেভ
এতসব কঠিন বাধা এবং চরম দারিদ্র্য সত্ত্বেও বেইরানভান্দের ফুটবলের ধার কমেনি, বরং দিন দিন উন্নতি হয়েছে। নাফত তেহরানের অনূর্ধ্ব-২৩ দলে তিনি ১ নম্বর জার্সিটি ছিনিয়ে নেন এবং দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে দ্রুতই মূল পেশাদার দলে ডাক পান।
বেইরানভান্দের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার হাত দিয়ে বল অনেক দূরে ছুঁড়ে মারার (লং-থ্রো) এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। ২০১৪ সালে একটি ম্যাচে তিনি হাত দিয়ে শূন্যে প্রায় ৭০ মিটার দূরত্বে বল ছুঁড়ে সরাসরি প্রতিপক্ষের বক্সে পাঠিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে গিনেস বুকেও স্থান পায়।
২০১৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হয় বেইরানভান্দের। ২০১৮ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বে টানা ১২টি ম্যাচে তিনি নিজের জাল অক্ষত (ক্লিন শিট) রাখেন। আর বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে মরক্কো ও স্পেনের মতো পরাশক্তির সামনে তিনি এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের লাইমলাইটে আসেন।
বিশেষ করে ২০১৮ বিশ্বকাপে পেনাল্টি স্পট থেকে বিশ্বসেরা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শট আটকে দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে নিজের নাম চিরস্থায়ী করে নেন। ফার্সি মিডিয়ায় তাকে আজ শুধু একজন ফুটবলার নয়, বরং—‘লড়াই ও টিকে থাকার জীবন্ত প্রতীক’ বলা হয়।
শেষ কথা
বেলজিয়ামের বিপক্ষে ইরানের গতকালের ড্র-টি কেবল পয়েন্ট টেবিলের একটি সাধারণ গাণিতিক হিসেব ছিল না; এটি ছিল বিশ্বফুটবলের অভিজাত মঞ্চে পারস্যের আত্মমর্যাদা, বীরত্ব আর বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়ার এক নতুন ইশতেহার। আর সেই ইশতেহারের প্রতিটি অক্ষরে যার নাম খোদাই করা ছিল, তিনি আলিরেজা বেইরানভান্দ।
খোররামাবাদের রুক্ষ পাহাড়ে ছেঁড়া গ্লাভস হাতে যে লড়াই শুরু হয়েছিল, আজ তা আজাদি টাওয়ারের ফুটপাত, গাড়ি ধোয়ার গ্যারেজের ধুলোবালি আর পিৎজা শপের ক্লান্তি পেরিয়ে বিশ্বকাপের সবুজ ঘাসে এসে পূর্ণতা পেয়েছে। মাঠের ভেতরের অতিমানবীয় বীরত্ব, গ্যালারির আকাশ কাঁপানো গর্জন আর কোচের অটুট আস্থা—সব মিলিয়ে বেইরানভান্দ যেন এক জীবন্ত রূপকথা; যিনি বারবার মনে করিয়ে দেন যে, যদি ভেতরে জেদ থাকে, তবে শূন্য পকেট আর খোলা আকাশও কখনো স্বপ্নের সীমানা বেঁধে দিতে পারে না।*
পার্সটুডে/এমএআর/২২