দায়েশ বন্দিদের ইরাকে স্থানান্তর: সিরিয়ার নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও বিশ্ব প্রতিক্রিয়া
https://parstoday.ir/bn/news/west_asia-i156428-দায়েশ_বন্দিদের_ইরাকে_স্থানান্তর_সিরিয়ার_নিরাপত্তা_চ্যালেঞ্জ_ও_বিশ্ব_প্রতিক্রিয়া
পার্সটুডে: উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে যাওয়া এবং দায়েশ (আইএস)   সদস্যদের পলায়ন বা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে, যুক্তরাষ্ট্র এই গোষ্ঠীর বন্দিদের ইরাকে স্থানান্তর শুরু করেছে। এই পদক্ষেপ পশ্চিম এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে, এই বন্দিদের বিচার, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব কার—তা নিয়েও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।
(last modified 2026-01-25T12:57:43+00:00 )
জানুয়ারি ২৫, ২০২৬ ১৮:৫৪ Asia/Dhaka
  • আইএস বন্দি স্থানান্তরের পেছনের বাস্তবতা
    আইএস বন্দি স্থানান্তরের পেছনের বাস্তবতা

পার্সটুডে: উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে যাওয়া এবং দায়েশ (আইএস)   সদস্যদের পলায়ন বা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে, যুক্তরাষ্ট্র এই গোষ্ঠীর বন্দিদের ইরাকে স্থানান্তর শুরু করেছে। এই পদক্ষেপ পশ্চিম এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে, এই বন্দিদের বিচার, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব কার—তা নিয়েও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সিরিয়ার উত্তর–পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আটক কেন্দ্রগুলো থেকে দায়েশ–সংশ্লিষ্ট বন্দিদের ইরাকে পাঠানো এখন শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও আইনি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের পালিয়ে যাওয়া ঠেকানোর লক্ষ্যেই এই স্থানান্তর করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা বলছে, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব অনেক গভীর এবং বহুমাত্রিক।

সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার সরকার ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (কিউএসডি)-এর মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। এর পাশাপাশি, কারাগার ও শিবিরগুলোর দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সমাজের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার কারণে আইএস বন্দিদের বিষয়টি এখন একটি সীমান্ত পেরোনো আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।

কেন দায়েশ বন্দিদের ইরাকে নেওয়া হচ্ছে?

মার্কিন সেন্টকম ও ইরাকি কর্মকর্তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ কাজ করছে।

প্রথমত, সিরিয়ার সরকার ও কিউএসডি বাহিনীর মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার ফলে কারাগার ও আটক শিবিরগুলোর নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বন্দিদের বিদ্রোহ, পালিয়ে যাওয়া বা দায়েশ–এর পক্ষ থেকে পরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে বন্দিদের মুক্ত করার আশঙ্কা বেড়েছে।

দ্বিতীয়ত, অনেক বন্দিকে এমন শিবিরে রাখা হয়েছে যেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল ও আন্তর্জাতিক সহায়তা নেই। একক ও নির্ভরযোগ্য সামরিক নিয়ন্ত্রণের অভাব এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ইরাকের তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত কারাগারে বন্দিদের স্থানান্তর করলে দায়েশ সদস্যদের আবার সহিংস কর্মকাণ্ডে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কমানো যেতে পারে।

তৃতীয়ত, ইরাকের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, বন্দিদের একটি বড় অংশ ইরাকি নাগরিক। এছাড়া, তাদের অনেকের অপরাধ ইরাকের ভেতরেই সংঘটিত হয়েছে। এই কারণে বাগদাদ মনে করছে, ইরাকি আইন অনুযায়ী এসব মামলার বিচার নিজ দেশেই হওয়া বেশি যুক্তিসংগত ও কার্যকর।

সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মাঠের জটিলতা

সিরিয়ার উত্তর–পূর্বাঞ্চল সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্রমেই আরও অস্থির হয়ে উঠছে। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের সহায়তায় দায়েশ জঙ্গিদের দমন করা কিউএসডি বাহিনী এখন দামেস্ক সরকারের সঙ্গে গুরুতর রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়েছে।

এই উত্তেজনা শুধু ওই অঞ্চলের শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি করেনি, বরং বন্দিশিবিরগুলোর নিরাপত্তাকেও বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে। কিউএসডি অভিযোগ করেছে, সিরিয়ার সরকার কারাগার ও শিবিরগুলোর আশপাশে সামরিক উপস্থিতি এবং রসদ সরবরাহ বাড়াচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া ঠেকাতে চাপ সৃষ্টি করা হয়।

অন্যদিকে, দামেস্ক সরকার এসব অভিযোগকে 'প্রচার' বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সিরিয়ার কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের সামরিক পদক্ষেপ কিউএসডির তৎপরতার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই নেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তারা বলছে, রক্তপাত এড়াতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের হাতে বিভিন্ন বিকল্প রয়েছে।

বিশ্ব প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক ভূমিকা

দায়েশ বন্দিদের ইরাকে স্থানান্তরের বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মিশ্র। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কয়েকটি পশ্চিমা দেশ ইরাকের ভূমিকার প্রশংসা করেছে এবং বন্দিদের গ্রহণে বাগদাদের সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তারা একই সঙ্গে স্পষ্ট করে বলেছে, এই দায়িত্ব শুধু ইরাকের ওপর চাপানো উচিত নয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাইয়া কালাস ইরাকি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় এই সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার দায়িত্বে অন্য দেশগুলোকেও অংশ নিতে হবে।

অন্যদিকে, কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, শুধু বন্দি স্থানান্তর করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ন্যায়সঙ্গত বিচার নিশ্চিত করা, মানবাধিকার রক্ষা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রমাণ সংগ্রহ এবং স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া না থাকলে এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।

এছাড়া, এখনো বেশ কিছু দেশ তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, যারা দায়েশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর ফলে বিচার, নিরাপত্তা ও কারাগার ব্যবস্থাপনার বড় দায়িত্ব এককভাবে ইরাকের কাঁধেই থেকে যাচ্ছে।

দায়েশ বন্দিদের ইরাকে স্থানান্তর কোনো সাধারণ নিরাপত্তা পদক্ষেপ নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, পশ্চিম এশিয়ায় নিরাপত্তা সংকট, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব কতটা গভীরভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িত। এই সংকট মোকাবিলায় একক কোনো দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বরং কার্যকর সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত, বহুপক্ষীয় এবং দায়িত্বশীল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।#

পার্সটুডে/এমএআর/২৪