শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরানের মোকাবিলা সম্ভব নয়: মুজতাবা খামেনেয়ী
https://parstoday.ir/bn/news/world-i157928-শুধু_সামরিক_শক্তির_মাধ্যমে_ইরানের_মোকাবিলা_সম্ভব_নয়_মুজতাবা_খামেনেয়ী
ফার্সি ১৪০৫ সালের সূচনা বা নওরোজ উপলক্ষে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা খামেনেয়ী একটি বাণী দিয়েছেন। ওই বাণীতে তিনি পবিত্র ঈদুল ফিতর ও নওরোজের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন।
(last modified 2026-03-20T16:56:03+00:00 )
মার্চ ২০, ২০২৬ ২২:৪৮ Asia/Dhaka
  • আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা খামেনেয়ী
    আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা খামেনেয়ী

ফার্সি ১৪০৫ সালের সূচনা বা নওরোজ উপলক্ষে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা খামেনেয়ী একটি বাণী দিয়েছেন। ওই বাণীতে তিনি পবিত্র ঈদুল ফিতর ও নওরোজের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন।

ইরানের নবনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতার পুরো বক্তব্য পার্সটুডের পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

یا مقلب القلوب والابصار یا مدبّر اللیل و النهار یا محوِّل الحول و الاحوال، حَوِّل حالَنا الی احسن الحال.

“হে অন্তর ও দৃষ্টির পরিবর্তনকারী, হে রাত ও দিনের নিয়ন্ত্রক, হে অবস্থা ও সময়ের পরিবর্তনকারী, আমাদের অবস্থাকে সর্বোত্তম অবস্থায় পরিবর্তন করুন।”

এ বছর আধ্যাত্মিক বসন্ত ও প্রাকৃতিক বসন্ত—অর্থাৎ পবিত্র ঈদুল ফিতর এবং প্রাচীন নওরোজ—একসাথে সমাপতিত হয়েছে। আমি এই দুই ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসব উপলক্ষে দেশের প্রতিটি নাগরিককে অভিনন্দন জানাই এবং বিশেষভাবে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বিশ্বব্যাপী সকল মুসলমানকে শুভেচ্ছা জানাই। এছাড়াও ইসলামের যোদ্ধাদের উল্লেখযোগ্য বিজয়ের জন্য সকলকে অভিনন্দন জানানো প্রয়োজন মনে করি এবং দ্বিতীয় আরোপিত যুদ্ধ, জানুয়ারি মাসের সহিংস দাঙ্গা, তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও সীমান্ত রক্ষাকারী শহীদ এবং অজ্ঞাতনামা সৈনিকদের শহীদ পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

১৪০৫ সালের সূচনা উপলক্ষে আমি কিছু বিষয় উল্লেখ করতে চাই, যা নিম্নে উপস্থাপন করছি।

প্রথমে, গত বছরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করব। গত বছরে আমাদের প্রিয় জনগণ তিনটি সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। প্রথমটি ছিল জুন মাসের যুদ্ধ, যেখানে ইহুদিবাদী শত্রু যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সহায়তায় এবং আলোচনার মধ্যেই একটি অন্যায় আক্রমণের মাধ্যমে আমাদের দেশের সেরা সেনাপতি ও বেশকিছু বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং পরবর্তীতে প্রায় ১০০০ নাগরিককে শহীদ করে। শত্রু একটি মারাত্মক ভুল হিসাবের কারণে ধারণা করেছিল যে, এক বা দুই দিনের মধ্যে জনগণই ইসলামী ব্যবস্থাকে পতন ঘটাবে। কিন্তু জনগণের সচেতনতা, ইসলামের যোদ্ধাদের অতুলনীয় বীরত্ব এবং অসংখ্য আত্মত্যাগের ফলে খুব দ্রুতই তাদের দুরবস্থা প্রকাশ পায় এবং তারা মধ্যস্থতার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি করে নিজেদের পতনের হাত থেকে রক্ষা করে।

দ্বিতীয় সংঘাতটি ছিল জানুয়ারি মাসের দাঙ্গা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরাইল ধারণা করেছিল যে, অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরানের জনগণ তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে। তারা তাদের ভাড়াটে বাহিনী ব্যবহার করে বহু নৃশংসতা চালায়, আরও বেশি মানুষকে শহীদ করে এবং ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।

তৃতীয় সংঘাতটি হচ্ছে বর্তমান চলমান যুদ্ধ। এর প্রথম দিনেই আমরা আমাদের জাতির স্নেহময় পিতা, মহান নেতাকে (আল্লাহ তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করুন) বিদায় জানাই, যিনি শহীদদের কাফেলার অগ্রভাগে আসমানি যাত্রায় রওনা হয়েছিলেন। অশ্রুসজল চোখ ও ভগ্ন হৃদয়ে আমরা তাঁকে বিদায় জানাই। সেই দিন থেকে ধীরে ধীরে আরও শহীদ—মিনাবের “শাজারা তাইয়্যেবা” বিদ্যালয়ের শিশু, দানা’ যুদ্ধজাহাজের সাহসী নাবিক, সেনাবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, অজ্ঞাতনামা সৈনিক, সীমান্তরক্ষী এবং অন্যান্য জনগণ—আমাদের সামনে দিয়ে এক আলোকিত কাফেলায় বিদায় নিয়েছে।

এই যুদ্ধ শুরু হয় যখন শত্রু জনগণের সমর্থন না পেয়ে এই ভ্রান্ত ধারণায় পড়ে যে, নেতৃত্ব এবং সামরিক ব্যক্তিত্বদের হত্যা করলে জনগণের মধ্যে ভয় ও হতাশা সৃষ্টি হবে এবং তারা ময়দান ত্যাগ করবে, ফলে তারা ইরানের উপর আধিপত্য বিস্তার এবং বিভাজনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবে।

কিন্তু আপনারা এই পবিত্র মাসে রোজার সাথে জিহাদকে একত্রিত করেছেন এবং একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা লাইন তৈরি করেছেন, যা পুরো দেশজুড়ে বিস্তৃত এবং অসংখ্য ময়দান, মহল্লা ও মসজিদে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছে। এর ফলে শত্রুদেরকে বিভ্রান্তিকর আঘাত হানা হয়েছে, যার ফলে তারা অসংলগ্ন ও পরস্পরবিরোধী কথা বলতে শুরু করেছে।

আপনারা ১২ জানুয়ারি দেই তারিখে দাঙ্গা দমন করেছেন, ১১ ফেব্রুয়ারি তারিখে আবারও বিশ্ব ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান ও অবিচলতা প্রদর্শন করেছেন এবং ১৩ মার্চ বিশ্ব কুদস দিবসে দিনে এমন আঘাত হেনেছেন যা তাদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, ইরানের মোকাবিলা শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে সম্ভব নয়; ইরানের অগ্রসারি শত্রুর ক্ষুদ্র ধারণার চেয়েও অনেক বড়।

আমি এখানেই জনগণের প্রত্যেককে এই মহান মহাকাব্য সৃষ্টির জন্য ধন্যবাদ জানাই; পাশাপাশি সাহসী, সৎ ও গণমুখী প্রেসিডেন্ট এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদেরও, যারা কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই জনগণের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। এই ধরনের আচরণ জাতি ও শাসকদের মধ্যে ঐক্যকে আরও দৃঢ় করে।

বর্তমানে আপনাদের মধ্যে ধর্মীয়, চিন্তাগত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যে ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে, তা শত্রুকে দুর্বল করে দিয়েছে। এটিকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং এর জন্য অন্তরে ও কাজে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। একটি অব্যর্থ নিয়ম হলো—যখন কোনো অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়, তখন তা আরও সুদৃঢ় হয় এবং আরও অনুগ্রহ লাভ হয়। এই অনুগ্রহের যথাযথ ব্যবহার করা আমাদের কর্তব্য, যাতে এই ঐক্য আরও শক্তিশালী হয় এবং শত্রুরা আরও অপমানিত হয়। এগুলো ছিল ১৪০৪ সালের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

এখন ১৪০৫ সালের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা কয়েকটি বিষয়ের সম্মুখীন হচ্ছি। প্রথমত, আমরা আমাদের প্রিয় অতিথি পবিত্র রমজান মাস ১৪৪৭-কে বিদায় জানাচ্ছি। এই মাসে লাইলাতুল কদরের রাতে আপনারা আল্লাহকে ডেকেছেন এবং তিনি আপনাদের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। আপনারা বিজয়, সফলতা ও কল্যাণ প্রার্থনা করেছেন এবং ইনশাআল্লাহ তা বা তার চেয়েও উত্তম কিছু লাভ করবেন।

একইসাথে আমরা শাওয়ালের পবিত্র চাঁদকে বরণ করছি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কারের অপেক্ষায় রয়েছি। আশা করি আপনারা যে আন্তরিক ইবাদত করেছেন, তার প্রতিদান আল্লাহ তাঁর দয়া, ক্ষমা ও অনুগ্রহ দিয়ে দেবেন এবং শিগগিরই ইমাম মাহদি (আ.)-এর আগমনের সুসংবাদ প্রদান করবেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নওরোজ উৎসব, যা নবায়ন, সতেজতা ও জীবনের প্রতীক।

এ বছর প্রথমবারের মতো আমাদের শহীদ নেতা ও অন্যান্য শহীদ আমাদের মাঝে নেই। তাদের পরিবারগুলো শোকে আচ্ছন্ন। তবুও আমি মনে করি, শোকের মধ্যেও আমরা আনন্দিত হবো যদি নতুন দম্পতিরা তাদের নতুন জীবন শুরু করে। আমি জনগণকে অনুরোধ করি, তারা যেন স্বাভাবিক নওরোজের সাক্ষাৎ-আদানপ্রদান বজায় রাখে, তবে শহীদ পরিবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। এছাড়াও, রাষ্ট্র যে শোকের সময় নির্ধারণ করেছে তা যথাযথভাবে পালন করা উচিত, যা এই ব্যবস্থার মহিমার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

সাইয়্যেদ মুজতাবা হুসাইনি খামেনেয়ী

২০ মার্চ, ২০২৬

 

পার্সটুডে/এমএআর/২০