ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র
-
ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়াতে লকহিড ও এল৩ হ্যারিসের সঙ্গে পেন্টাগনের চুক্তি
পার্সটুডে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর- পেন্টাগন দ্রুতগতিতে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদার লকহিড মার্টিন এবং এল৩ হ্যারিস-এর সঙ্গে সাত বছরের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। এর লক্ষ্য পেট্রিয়ট প্যাক-৩ এমএসই এবং থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য রকেট মোটর ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো।
পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নেওয়া এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার প্রতিফলন। একই সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খলের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যবহৃত উন্নত অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের গড়ে অন্তত তিন বছর সময় লাগবে।
মার্কিন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত এবং ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতেও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত সাত ধরনের প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় লাগবে। বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী সম্ভাব্য সময়সূচি হলো:
- টমাহক (Tomahawk) ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র: ২০৩১ সালের শুরু পর্যন্ত
- থাড (THAAD) প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র: ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত
- প্যাট্রিয়ট (Patriot) প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র: ২০২৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত
- এসএম-৩ (SM-3) প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র: ২০২৯ সালের শুরু পর্যন্ত
- এসএম-৬ (SM-6) প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র: ২০২৯ সালের শুরু পর্যন্ত
- জাসম (JASSM) ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র: ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত
- প্রিযম (PrSM) ক্ষেপণাস্ত্র: ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। ইউক্রেন যুদ্ধ এ সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু নিজেদের মজুতই পূরণ করতে হচ্ছে না, একই সঙ্গে মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর চাহিদাও মেটাতে হচ্ছে।
মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের জরুরি পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে, পেন্টাগন ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর সাথে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে মজুদ দ্রুত পূরণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করছে। এই চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী, এল৩ হ্যারিস কোম্পানি পেট্রিয়ট প্যাক-৩ এমএসই ব্যবস্থার প্রপেলার উৎপাদন প্রায় তিন গুণ এবং থাড ব্যবস্থার মূল উপাদানগুলোর উৎপাদন চার গুণ বৃদ্ধি করবে। প্যাট্রিয়ট প্যাক-৩ চুক্তিতে এই কোম্পানিকে উন্নত ডাবল-পালস সলিড রকেট মোটর, অ্যাটিটিউড কন্ট্রোল মোটর (এসিএম) এবং লিথালিটি এনহ্যান্সারের উৎপাদন বাড়াতে বলা হয়েছে—যা কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং শত্রুর বিমান মোকাবেলায় এই ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রয়োজনীয় গতি, পাল্লা ও চালনা ক্ষমতা প্রদান করে।
থাড চুক্তিতেও সলিড রকেট বুস্টার মোটর এবং লিকুইড ডাইভার্ট অ্যান্ড অ্যাটিটিউড কন্ট্রোল সিস্টেম (এলডিএসিএস)-এর উৎপাদন বাড়ানো হবে, যা শেষ ধাপে ইন্টারসেপ্টরকে দিক নির্দেশনা দেয়।
লকহিড মার্টিন এর আগে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পেট্রিয়ট প্যাক-৩ এমএসই-এর বার্ষিক উৎপাদন ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ২০০০-এ উন্নীত করার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল এবং ২০২৬ সালের জুনে থাড ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন চার গুণ করার জন্য ৩৫ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি লাভ করেছিল।
এই পদক্ষেপের প্রধান চালিকাশক্তি হলো দুটি সমসাময়িক যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া। অনুমান অনুযায়ী, ইরানের সাথে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার থাড ইন্টারসেপ্টর মজুদের অর্ধেক এবং পেট্রিয়ট প্যাক-৩ মজুদের প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করে ফেলেছে। একটি প্যাক-৩ ইন্টারসেপ্টরের মূল্য প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার এবং সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে এই প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ব্যাপক ব্যবহার ইউক্রেন ও ওয়াশিংটনের অন্যান্য মিত্রদের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা বাজিয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধকালীন ব্যবহারের চাপের পাশাপাশি পেন্টাগন সলিড রকেট মোটরের সরবরাহ শৃঙ্খলে কাঠামোগত ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে। সীমিত সংখ্যক সরবরাহকারী থাকার কারণে এই শিল্পটি সর্বদা ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের প্রধান বাঁধা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এল৩ হ্যারিস কোম্পানি ২০২৩ সালে 'অ্যারোজেট রকেটডাইন' অধিগ্রহণের পর তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে এবং বর্তমানে তারা প্রায় ৬০টি নতুন সুবিধা নির্মাণ ও প্রায় ১০ লাখ বর্গফুট উৎপাদন ক্ষেত্র সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
পেন্টাগন তাদের "অস্ত্র অধিগ্রহণ রূপান্তর কৌশল"-এর অংশ হিসেবে এই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিগুলো সম্পাদন করেছে, যেখানে সরবরাহ শৃঙ্খলে টেকসই চাহিদার বার্তা দিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এল৩ হ্যারিস ও লকহিড মার্টিনের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তিগুলো প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সংকটের গভীরতা উপলব্ধি করেছে এবং প্রতিরক্ষা শিল্প পুনর্গঠনের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধের কারণে কমে যাওয়া অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূরণ, ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য হুমকির মোকাবিলা এবং মিত্র দেশগুলোর চাহিদা পূরণে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, উৎপাদন তিনগুণ ও চারগুণ বাড়ানোর মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগ, স্থিতিশীল অর্থায়ন এবং সরকার, প্রধান প্রতিরক্ষা ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অপরিহার্য হবে।#
পার্সটুডে/এমএআর/৩০