ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত ব্যয় পেন্টাগনের হিসাবের চার গুণ: দ্য টেলিগ্রাফ
পার্সটুডে: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় পেন্টাগনের ঘোষিত হিসাবের প্রায় চার গুণ হতে পারে বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি বলেছে, পেন্টাগন যেখানে যুদ্ধের ব্যয় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করেছে, সেখানে প্রকৃত ব্যয় ১৫১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাবের বাইরে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের বড় একটি অংশ বাদ পড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দেওয়া ব্যয়ের হিসাবকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও যুদ্ধ অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ লিন্ডা জে. বিলমেস "হিমশৈলের চূড়া" বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, এই হিসাব কেবল তাৎক্ষণিক সামরিক ব্যয়কে তুলে ধরেছে; মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব এতে প্রতিফলিত হয়নি।
টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান সংঘাত একইভাবে চলতে থাকলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের মোট যুদ্ধ ব্যয় ৩১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করেছে, এই হিসাব কেবল সামরিক ব্যয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৃহত্তর অর্থনৈতিক ক্ষতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যান্য পরোক্ষ ব্যয় এতে ধরা হয়নি। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম ২১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দামও একাধিকবার প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে।
এই পরিস্থিতিতে অধ্যাপক বিলমেস সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত ব্যয় এক ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
একই ধরনের মূল্যায়ন দিয়েছেন জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক স্টিভ হ্যাঙ্কে। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে একটি "পছন্দের যুদ্ধ" শুরু করেছেন, যার আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত মার্কিন করদাতাদেরই বহন করতে হবে।
বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা কমাতে পেন্টাগন যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয়, ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের চিত্র তুলনামূলকভাবে কম করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। যদিও ট্রাম্প "সর্বোচ্চ চাপ" নীতির কথা বলেছিলেন, বাস্তবে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যাপক অর্থনৈতিক ব্যয় ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় এক মাস আগে পেন্টাগন কংগ্রেসের কাছে যুদ্ধ-সংক্রান্ত ব্যয় মেটাতে অতিরিক্ত ৮০ বিলিয়ন ডলার বাজেট চেয়েছে। এই অর্থ মূলত ব্যবহৃত গোলাবারুদ পুনরায় সংগ্রহ, সামরিক সরঞ্জাম মেরামত এবং পরিচালন ব্যয়ের জন্য প্রয়োজন বলে জানানো হয়। তবে এতে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক স্থাপনার পুনর্নির্মাণ ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, পেন্টাগন প্রকৃত ব্যয় প্রকাশে অনাগ্রহী হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সীমিত বাজেটের কারণে অতিরিক্ত অর্থায়নের চাপ এড়ানো, কংগ্রেসে সম্পূরক বাজেট অনুমোদন সহজ করা এবং যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় আড়াল করে জনসমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা।
প্রতিবেদনের দাবি, পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ কিছু মূল্যায়নে যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় ৮০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন তুলনামূলক কম অঙ্ক প্রকাশ করাকেই রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক মনে করছে।
বিশ্লেষণে উপসংহারে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের ঘোষিত ব্যয় এবং স্বাধীন গবেষণার হিসাবের মধ্যে যে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে, তা ইঙ্গিত করে যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রকৃত আর্থিক বোঝা শুধু মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন করদাতাদের ওপরও বর্তাবে।#
পার্সটুডে/এমএআর/৩০